প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
উনিশ ও বিশ শতকের সময়, পাশ্চাত্যের উপনিবেশবাদী আগ্রাসনের পাশাপাশি প্রাচ্যের ইতিহাস, ধর্ম ও সংস্কৃতিকে নতুনভাবে ব্যাখ্যা করার জন্য একটি বুদ্ধিবৃত্তিক ধারা গড়ে ওঠে, যা ওরিয়েন্টালিজম বা প্রাচ্যবাদ নামে পরিচিত। এই ধারার অনেক গবেষক মহানবী (সা.)-এর জীবন, রিসালাত, পবিত্র কোরআনের ঐশী উৎস এবং ইসলামের ইতিহাস নিয়ে নানা সংশয় ও বিতর্ক সৃষ্টি করেন। উল্লেখযোগ্য গবেষকদের মধ্যে উইলিয়াম মূর, ডি. এস. মারগোলিউথ ও মন্টগোমারি ওয়াট রয়েছেন। পরে এডওয়ার্ড সাঈদ তাঁর বিখ্যাত ‘ওরিয়েন্টালিজম’ গ্রন্থে প্রাচ্যবাদী চিন্তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি বিশ্লেষণ করেন। তবে ইসলামের মূল উৎস, ঐতিহাসিক দলিল ও আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির আলোকে এসব আপত্তির প্রামাণ্য জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রে যাঁরা অসামান্য অবদান রেখেছেন, তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বাংলাদেশের কৃতী ইতিহাসবিদ ড. মুহাম্মদ মোহর আলী (১৯২৯–২০০৭)।
১৯২৯ সালে অবিভক্ত বাংলার খুলনায় জন্মগ্রহণ করেন ড. মুহাম্মদ মোহর আলী। শৈশবে পিতৃবিয়োগের পর হুগলী মাদরাসায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক দ্বীনি শিক্ষার সূচনা হয়। পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। এরপর যশোর, ঢাকা, চট্টগ্রাম ও রাজশাহীর বিভিন্ন সরকারি কলেজে ইতিহাসের অধ্যাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় শুরু হয় লন্ডনের স্কুল অব ওরিয়েন্টাল অ্যান্ড আফ্রিকান স্টাডিজ (SOAS)-এ পিএইচডি গবেষণার মাধ্যমে। পাশাপাশি তিনি লিংকনস ইন থেকে ব্যারিস্টারি সম্পন্ন করেন। ফলে ইসলামী জ্ঞানের পাশাপাশি পাশ্চাত্যের আধুনিক ইতিহাসচর্চা, গবেষণাপদ্ধতি, সূত্র-সমালোচনা ও যুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণে অসাধারণ দক্ষতা অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে প্রাচ্যবাদীদের গবেষণার জবাব দিতে এই জ্ঞান ও দক্ষতাই তাঁর প্রধান হাতিয়ার হয়ে ওঠে।
পরবর্তীকালে তিনি সৌদি আরবে পাড়ি জমান এবং রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ ইবনে সাউদ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় ও মদিনা ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়ে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন। পাশাপাশি পবিত্র কোরআন মুদ্রণের বাদশাহ ফাহাদ কমপ্লেক্সে গবেষণার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর গবেষণা ও জ্ঞানসাধনার স্বীকৃতিস্বরূপ ২০০০ সালে তিনি ইসলামি অধ্যয়নে মর্যাদাপূর্ণ কিং ফয়সাল আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভ করেন।
প্রাচ্যবাদের বিরুদ্ধে কালজয়ী গবেষণা
ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর সবচেয়ে আলোচিত গবেষণাগ্রন্থ ‘সীরাতুন নাবী অ্যান্ড দি ওরিয়েন্টালিস্টস’। এই গ্রন্থে তিনি উইলিয়াম মূর, ডি. এস. মারগোলিউথ ও মন্টগোমারি ওয়াটের মতো প্রাচ্যবাদী গবেষকদের বক্তব্য গভীরভাবে পর্যালোচনা করেছেন। মহানবী (সা.)-এর পারিবারিক জীবন, শৈশব, যৌবন, নবুয়তপ্রাপ্তি ও রিসালাত নিয়ে তাঁদের উত্থাপিত বিভিন্ন আপত্তি ও তত্ত্বের জবাবে তিনি প্রাচীন ঐতিহাসিক সূত্র, নির্ভরযোগ্য দলিল এবং যুক্তিনিষ্ঠ বিশ্লেষণ উপস্থাপন করেছেন। তাঁর গবেষণার বিশেষত্ব হলো, আবেগনির্ভর প্রতিবাদের পরিবর্তে প্রাচ্যবাদীদের নিজস্ব গবেষণাপদ্ধতি ও একাডেমিক মানদণ্ড ব্যবহার করে তাঁদের বক্তব্যের অসংগতি তুলে ধরা।
তাঁর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘দ্য কোরআন অ্যান্ড দি ওরিয়েন্টালিস্টস: অ্যান এগজামিনেশন অব দেয়ার মেইন থিওরিজ অ্যান্ড অ্যাসাম্পশনস’। এতে পবিত্র কোরআনের উৎস, সংকলন, ভাষাগত বৈশিষ্ট্য ও ঐশী পরিচয় নিয়ে প্রাচ্যবাদীদের উত্থাপিত বিভিন্ন তত্ত্ব ও আপত্তির বিস্তারিত পর্যালোচনা করা হয়েছে। কোরআনবিষয়ক গবেষণায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন।
দ্বীনি জ্ঞান ও আধুনিক গবেষণার সমন্বয়
ড. মোহর আলীর গবেষণার সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো, তিনি ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও আধুনিক একাডেমিক গবেষণার মধ্যে সফল সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। হুগলী মাদরাসার দ্বীনি পরিবেশ তাঁকে ইসলামী ঐতিহ্য ও উম্মাহর প্রতি দায়বদ্ধতার চেতনা দিয়েছিল। অন্যদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও লন্ডনের সোয়াস তাঁকে আধুনিক ইতিহাসচর্চা, তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ এবং গবেষণার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে দক্ষ করে তোলে। এই দুই ধারার সমন্বয়ে তিনি এমন একটি গবেষণাপদ্ধতি গড়ে তোলেন, যেখানে প্রতিটি বক্তব্যের ভিত্তি ছিল তথ্য, সূত্র ও প্রমাণ। তাঁর কাজ আমাদের শেখায়, ইসলামের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক আপত্তির জবাব শুধু আবেগ কিংবা বক্তব্য দিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন গভীর অধ্যয়ন, নির্ভরযোগ্য তথ্য, গবেষণার দক্ষতা এবং প্রতিপক্ষের চিন্তাপদ্ধতি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা।
একবিংশ শতাব্দীতে প্রাচ্যবাদী চিন্তার প্রকাশ ও প্রচারমাধ্যম বদলেছে। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণাপত্র, ইন্টারনেট ও গণমাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস, কোরআন ও নবীজির জীবন নিয়ে নানা প্রশ্ন ও বিতর্ক সামনে আসছে। এমন বাস্তবতায় মুসলিম আলেম ও গবেষকদের জন্য দ্বীনি জ্ঞানের পাশাপাশি আধুনিক গবেষণাপদ্ধতি এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক ভাষায় দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে মাদরাসা ও ইসলামি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে গবেষণাভিত্তিক অধ্যয়নকে উৎসাহিত করা, আরবি-উর্দু-ফারসির পাশাপাশি ইংরেজি ভাষা ও আধুনিক গবেষণাপদ্ধতির চর্চা বাড়ানো সময়ের দাবি। ড. মুহাম্মদ মোহর আলীর জীবন ও কর্ম এ ক্ষেত্রে আমাদের সামনে এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছে।
ড. মুহাম্মদ মোহর আলী ছিলেন এমন এক জ্ঞানসাধক, যিনি নীরবে নিজের গবেষণা ও লেখনীর মাধ্যমে ইসলামের ইতিহাস, সিরাত ও কোরআনবিষয়ক গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। বাংলাদেশের মাটিতে জন্ম নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে স্বীকৃতি অর্জন করা এই মনীষীর রচনাবলি আজও গবেষক ও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের জন্য মূল্যবান সম্পদ।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন