প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বকাপে স্পেনের কোনো ম্যাচ দেখলে মাঠের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে বেড়ানো কোঁকড়ানো চুলের একজন ফুটবলারের দিকে চোখ না গিয়ে উপায় নেই।
তিনি হচ্ছেন স্পেনের ডিফেন্ডার মার্ক কুকুরেয়া। সম্প্রতি, ইংলিশ ক্লাব চেলসি ছেড়ে তিনি রিয়াল মাদ্রিদে যোগ দিয়েছেন। আগামী মৌসুম থেকে স্প্যানিশ ক্লাবটির হয়ে খেলার অপেক্ষায় রয়েছেন তিনি।
গোল করার পর পেঙ্গুইনের মতো লাফিয়ে উদযাপন করা কুকুরেয়ার স্বতন্ত্র পরিচয়ে পরিণত হয়েছে। এ নিয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, "ইন্টারনেটে দেখেছিলাম, পেঙ্গুইন একবার সঙ্গী বেছে নিলে সারাজীবন তার সঙ্গেই থাকে। পরিবারের সঙ্গে তাদের বন্ধন অটুট থাকে। তাই আমার এই উদযাপন পরিবারের জন্য। ভালো-খারাপ সব সময় তারা আমার পাশে থেকেছে।"
২৮ বছর বয়সী কুকুরেয়া বর্তমানে তার সঙ্গী ক্লডিয়া রদ্রিগেজের সাথে মিলিত রয়েছেন। তাদের তিন সন্তান রয়েছে – মাতেও, রিও ও বেলা। কুকুরেয়া বরাবরই বলেন, ফুটবলের চেয়ে তার কাছে পরিবার অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এবারের আসরে আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে স্পেনের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন কুকুরেয়া।
কিন্তু ফুটবলারদের জীবন বাইরে থেকে যতোই নিখুঁত মনে হোক না কেন, মার্ক কুকুরেয়া জানাচ্ছেন, তাদেরও "ব্যক্তিগত সমস্যা" থাকে। গ্যালারি থেকে যেসব দৈনন্দিন লড়াইয়ের কোনো আভাস পাওয়া যায় না, তার মধ্যে একটি হলো তার ছেলে মাতেওকে নিয়ে কুকুরেয়ার জীবনযাত্রা। মাত্র তিন বছর বয়সে মাতেওর অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার (এএসডি) ধরা পড়ে। এটিকে তখন লেভেল-১ বা অটিজমের তুলনামূলকভাবে মৃদু পর্যায় হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
বোস্টন চিলড্রেনস হাসপাতালের তথ্যমতে, এএসডি একটি স্নায়ুবিক বিকাশজনিত অবস্থা, যা শিশুর চিন্তাভাবনা, কথা বলা, চলাফেরা ও আচরণের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত অনেকের সামাজিকভাবে যোগাযোগে সমস্যা হতে পারে এবং কিছু ক্ষেত্রে শেখা বা চিন্তাভাবনার বিভিন্ন দক্ষতার বিকাশেও ভিন্নতা লক্ষ্য করা যায়।
কুকুরেয়া বলেছেন, "আমার বড় ছেলে আমাদের সবার জীবনই কিছুটা বদলে দিয়েছে। ও যখন নার্সারিতে যাওয়া শুরু করলো, তখনই আমরা ওর মাঝে কিছু ভিন্ন বিষয় লক্ষ্য করতে শুরু করি। অন্য বাচ্চাদের সঙ্গে খেলাধুলার যে ছবিগুলো আসতো, সেখানে প্রায় সবসময়ই দেখা যেত যে ও একা থাকে।"
"ও একটু বড় হওয়ার পর দেখলাম, ও কথা বলছে না, আধো আধো শব্দও করছে না। ওই সময়টাই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন ছিল। নিজের সন্তানকে কষ্ট পেতে দেখা ছাড়া কঠিন আর কিছু নেই।" কুকুরেয়া জানান, ছেলের অটিজম নিয়ে কথা বলা এখনো তার জন্য সহজ নয়। অনেক সময় তিনি বুঝতে পারেন না, তিনি কীভাবে তার ছেলেকে সাহায্য করবেন।
তবে ছেলের অটিজম শনাক্ত হওয়ার পর মার্ক কুকুরেয়া জীবনকে আরও ধৈর্য, সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতার সঙ্গে দেখতে শিখেছেন। তিনি মনে করেন, একজন শীর্ষ পর্যায়ের ফুটবলার হওয়ার পরিচিতিটি তাকে অটিজম সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর সুযোগ দেয়। সেইসাথে, একই অভিজ্ঞতা নিয়ে থাকা অন্য পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে পারছেন তিনি।
"আমাদের যে পরিচিতি আছে, তা যদি এই বিষয়টিকে আরও মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারে এবং আরও পরিবারকে সাহায্য করতে পারে, তাহলে আমি খুবই খুশি হবো। এর ফলে যদি আরও স্কুল, সহায়তা ও সাপোর্ট সেন্টার গড়ে ওঠে, সেটাই হবে সবচেয়ে বড় পাওয়া।"
কুকুরেয়া যোগ করেছেন, "এই অভিজ্ঞতা আমাকে জীবনে কোন বিষয়গুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ আর কোনগুলো নয়, তা মূল্য ও অগ্রাধিকার দেওয়ার শিক্ষা দিয়েছে।" তিনি জানান, শুরুতে ছেলে যে স্কুলে পড়ত, সেখান থেকে খুব একটা সহযোগিতা পাননি তারা। অভিভাবক হিসেবে তখন নিজেদেরকে অসহায় কিংবা দিশেহারা মনে হতো।
কুকুরেয়ার স্ত্রী ক্লডিয়া রদ্রিগেজ বলেন, "স্কুল থেকে আমরা খুব একটা সহায়তা পাইনি। জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম মাসের মধ্য দিয়ে গেছি আমরা সেই সময়ে। প্রতিদিন আমরা দু'জন একসঙ্গে মাতেওকে স্কুলে পৌঁছে দিতাম, আর বাড়ি ফিরতাম কাঁদতে। প্রতিটি দিন।"
কুকুরেয়া বলছেন, "মাতেওকে মাথায় রেখেই আমাদের সবসময় পরিকল্পনা করতে হয়।" "অনেক সময় আমরা কিছু করতে চাই, কিন্তু ওর জন্য ভালো হবে না বলে তা করা যায় না। ছুটিতে যাওয়া সবসময়ই কঠিন, কারণ তখন ওর জন্য অনেক কিছু বদলে যায়।"
তিনি বলেছেন, "চিকিৎসকেরা জানিয়ে দিয়েছেন যে আপনার সন্তানের অটিজম আছে, ঠিক আছে। কিন্তু অভিভাবক হিসেবে আমরা তো এর জন্য প্রস্তুত থাকার পরিস্থিতিতে নই। তাই আমাদের অনেক কিছু শিখতে হয়েছে। সম্ভবত মাতেওও আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে।" কুকুরেয়া এক সাক্ষাৎকারে বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, মাতেওকে কষ্ট পেতে দেখলে তারও কষ্ট হয়। এতদিন পর্যন্ত বড় ছেলে মাতেওকে তার ভাইদের সঙ্গে গ্যালারিতে বসিয়ে খেলা দেখানো হয়নি, যাতে সে অস্বস্তিতে না পড়ে।
তবে স্প্যানিশ একটি রেডিও স্টেশনকে তিনি জানান, ২০২৪ সালের ইউরো চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালের মতো এইবারও বিশ্বকাপের ফাইনালে মাতেও উপস্থিত থাকতে পারে। কুকুরেয়ার ভাষামতে, "যুক্তরাষ্ট্রে খুব গরম। এতে ওর অস্বস্তি হয়। ও ঠান্ডা পরিবেশ পছন্দ করে; যেখানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা অথবা সুইমিং পুল রয়েছে।" সূত্র: বিবিসি
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন