প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
লাখো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরবিদায় নিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠনকারী ও প্রবীণ রাজনীতিবিদ তোফায়েল আহমেদ। তিনি শায়িত হলেন তার জন্মস্থান কোড়ালিয়ার পারিবারিক কবরস্থানে মা-বাবার পাশে। সেই কোড়ালিয়ার কাদামাটিতে, যেখানে মুখে গায়ে জাতীয় নেতা হয়ে উঠেছিলেন, সেখানেই হলো বর্ষিয়ান এই রাজনীতিকের শেষ ঠিকানা।
মঙ্গলবার দুপুর দেড়টায় তোফায়েল আহমেদের মরদেহ নিয়ে হেলিকপ্টার ভোলা হেলিপ্যাডে আসে ঢাকা থেকে। সেখানে আগে থেকেই তার অনুসারী ও আওয়ামী লীগের কয়েকশ নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।
লাশবাহী হেলিকপ্টার থেকে নেমেই উপস্থিত স্বজনদের দেখা পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তোফায়েল কন্যা ডা. তাসলিমা জামান মুন্নি। এই পরিস্থিতিতে সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশ।
রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পালনের সময় নিজ জন্মভূমিতে এভাবে অনেকবার হেলিকপ্টারে ভোলায় এসেছেন তোফায়েল আহমেদ। তবে এবারের আসা একেবারে ভিন্ন। বাংলার রাজপুত্র তোফায়েলের এই শেষ আসার সাথে জড়িত। হেলিকপ্টার থেকে কফিন নামিয়ে তোলা হয় শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাম্বুলেন্সে। এরপর সামনে পুলিশের গাড়ির সঙ্গে কর্মীদের মোটরবহর নিয়ে যাওয়া হয় ভোলা সরকারি স্কুল মাঠে।
ভোলা সরকারি স্কুলের এক সময়ের তুখোড় ছাত্র ছিলেন তোফায়েল আহমেদ। তিনি এখান থেকেই রাজনীতি শুরু করেছিলেন। আজ সেই স্কুলের মাঠেই শেষ বিদায়ের জানাজা সম্পন্ন হয়েছে। মাঠজুড়ে হাজারো মানুষ শোকে স্তব্ধ হয়ে যায়। দুপুরের কাঠফাটা রোদে হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে সেখানে দ্বিতীয়া জানাজা (ভোলায় প্রথম) অনুষ্ঠিত হয়। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা দেওয়া হয়।
সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো. আরিফুজ্জামানের নেতৃত্বে পুলিশের চৌকস দল গার্ড অব অর্নার প্রদান করে। এসময় পুনরায় সৃষ্টি হয় আবেগঘন পরিবেশের। জানাজার আগে বক্তব্য রাখেন জেলা বিএনপির আহ্বায়ক ও জেলা পরিষদ প্রশাসক গোলাম নবী আলমগীর এবং মরহুমের মেয়ের জামাই ডা. তোহিদুজ্জামান তুহিন। গোলাম নবী আলমগীর গভীর শোক প্রকাশ করে পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান এবং রুহের শান্তি কামনা করেন। নিহতের পরিবারের পক্ষে সবার দোয়া চেয়েছেন জামাতা ডা. তুহিন। জানাজায় অংশগ্রহণকারী তোফায়েল আহমেদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী, স্বজন-শুভানুধ্যায়ী অনেক স্মৃতি তুলে ধরেন।
তোফায়েল আহমেদের ভাগনে আশরাফুজ্জামান রাজিব বলেন, তাদের পরিবারের মাথার ওপর থাকা বটবৃক্ষটি চলে গেছেন। তিনি বলেন, যা অপূরণীয় হয়ে গেছে। শুধু আমি-আমরা এতিম হইনি, অভিভাবক হারা হয়েছেন আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরাও।
ভোলা পৌরসভার সাবেক প্যানেল মেয়র ছালাউদ্দিন লিংকন মন্তব্য করেন, ‘জাতীয় নেতার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তিনি বড় দুর্দিনে চলে গেছেন।’
তোফায়েল আহমেদের প্রতিবেশী ও বাল্যবন্ধু সৈয়দ আহম্মদ বলেন, ‘কোড়ালিয়ার সূর্য পুত্র ছিলেন তোফায়েল। যিনি বাংলাদেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক দুনিয়া ভোলাকে পরিচিত করেছেন। তার চলে যাওয়ার মাধ্যমে অনেক ইতিহাসের সমাপ্তি ঘটেছে।’
সংস্কৃতিকর্মী মনির উদ্দিন জানান, তোফায়েল আহমেদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে নিজে ইতিহাস তৈরি করেছেন। ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, স্বাধীনতা যুদ্ধসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলনে তার ভূমিকা ছিল জনগণের পক্ষে। তিনি অনেক ইতিহাস সৃষ্টি করে নিজেই আজ ইতিহাস হয়ে গেছেন।
জানাজা শেষে প্রবীণ এই রাজনীতিকের মরদেহ নিয়ে যাবার জন্য সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদীর কোড়ালিয়া গ্রামের বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তৃতীয় জানাজায় অংশ নেন বিপুল সংখ্যক মানুষ। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকেও আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা জানাজায় অংশ নেন। সেখানে তৃতীয় জানাজা শেষে মা-বাবার কবরের পাশে চিরনিদ্রায় শায়িত হন রাজনীতির আকাশের উজ্জ্বল নক্ষত্র তোফায়েল আহমেদ।
কমিউনিষ্ট পার্টির ভোলা জেলা সভাপতি মোবাশ্বির উল্যাহ বলেন, তোফায়েল আহমেদ ছিলেন জাতীয় নেতা। তার মৃত্যুতে আওয়ামী লীগের অনেক ক্ষতি হয়েছে। তিনি ভোলায় বহু কাজ করলেও অনেকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেননি।
এদিকে, তোফায়েল আহমেদের মরদেহ ভোলায় আসার খবরে মঙ্গলবার সকাল থেকেই নানা গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়ে। দুপুরে যুবদল, শ্রমিকদল ও ছাত্রদলের ব্যানারে ভোলা সরকারি স্কুল মাঠ এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল করে। মিছিলকারীরা আওয়ামী লীগ বিরোধী স্লোগান দেয়।
তোফায়েল আহমেদ ১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোর ভোলায় জন্মগ্রহণ করেন। তিনি দীর্ঘ ৬ দশকে রাজনীতি ও রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন শেষে গত ১ জুন বিকেলে অনন্তকালের যাত্রী হন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন