প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহীতে পেঁয়াজের বাজারে নজিরবিহীন দরপতনে কৃষকরা চরম সংকটে পড়েছেন। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ার ফলে হাজার হাজার চাষিকে লোকসানের বোঝা বইতে হচ্ছে। সংরক্ষণে পচন, ওজন কমে যাওয়া এবং বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহ—সব মিলিয়ে পেঁয়াজচাষিদের মধ্যে হতাশার ছায়া নেমে এসেছে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে রেকর্ড পরিমাণ পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে, তবে কৃষকের মুখে হাসি নেই। দামে ধস নামায় বড় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ২১ হাজার ৩০০ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে মুড়িকাটা বা আগামজাতের পেঁয়াজের আবাদ হয়েছে ৮ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে। চলতি মৌসুমে রাজশাহীতে পেঁয়াজ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪ লাখ ৩২ হাজার ৩০০ টন। অন্যদিকে মুড়িকাটা পেঁয়াজের ফলনের লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ৩৬ হাজার ৮০০ টন। আবহাওয়া অনুকূল থাকায় চলতি মৌসুমে রাজশাহীর সর্বত্রেই তাহেরপুরী ও নাসিক এন-৫৩ জাতের পেঁয়াজের ভালো ফলন হয়েছে। এর আগে রাজশাহীতে এত পরিমাণ পেঁয়াজ চাষ হয়নি। স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, যেখানে অন্যান্য বছর এই সময়ে প্রতি মণ পেঁয়াজ ২ হাজার ৫০০ থেকে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হয়েছে, সেখানে বর্তমানে জাতভেদে দাম নেমে এসেছে মাত্র ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়। ফলে গত বছরের তুলনায় প্রতি মণে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার টাকা পর্যন্ত কম দাম পাচ্ছেন তারা। দীর্ঘদিন ঘরে সংরক্ষণ করে রাখার কারণে অনেক পেঁয়াজ শুকিয়ে ওজন কমে যাচ্ছে এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পেঁয়াজ পচেও নষ্ট হচ্ছে। বাজারে ওজন নিয়ে অনিয়মের অভিযোগও রয়েছে। উৎপাদন ব্যয় তোলাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুঠিয়ার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে পেঁয়াজ বিক্রি করতে আসা কৃষক আব্দুল মমিন ভীষণ হতাশা ও ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করে এখন মাত্র এক কেজি গরুর মাংস কেনা যায়। সংসারের সবজি কিনতেও তাকে আরো এক মণ পেঁয়াজ বিক্রি করতে হয়। তিনি জানালেন, গত ২০ বছরে এমন দাম তিনি আর কখনও দেখেননি। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই বাজারে অতিরিক্ত সরবরাহই দরপতনের প্রধান কারণ। পেঁয়াজ ব্যবসায়ী খায়রুল ইসলাম জানান, এবার উৎপাদন অনেক বেশি হয়েছে। তবে সংরক্ষণ সমস্যার কারণে কৃষকরা ঘরে রাখতে পারছেন না। ফলে একসঙ্গে বেশি পরিমাণ পেঁয়াজ বাজারে আসছে। মোকামে যদি বেশি দামে বিক্রি করতে না পারি, তবে বেশি দামে কিনব কীভাবে? পবার কৃষক শুকুর মোহম্মদ বলেছেন, এবারের পেঁয়াজে বড় লোকসান খাবো। আগেরবার চাষ করে কিছু লাভ হয়েছিলো, তবে এবার ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা লোকসান হবে। বাজারে দামের এমন পরিস্থিতি কিভাবে সামলাবেন, তা বুঝতে পারছি না। চাষিরা জানিয়েছেন, নিজস্ব জমিতে প্রতি বিঘায় পেঁয়াজ চাষে খরচ হয় ৫০ থেকে ৭০ হাজার টাকা। লিজ নেওয়া জমিতে এ খরচ বেড়ে দাঁড়ায় ৭০ থেকে ৯০ হাজার টাকা, যেখানে জমির ভাড়াই বিঘাপ্রতি ৩৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। চাষিরা বাজারদর পতনের জন্য আগের পেঁয়াজ আমদানিকে দায়ী করছেন। তাদের অভিযোগ, মৌসুমের শুরুতে যখন দেশীয় ‘মুড়িকাটা’ পেঁয়াজ বাজারে উঠছিল, তখন আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে এসে স্থানীয় উৎপাদন ন্যায্যমূল্য পাচ্ছে না। পুঠিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা স্মৃতি রানী সরকার জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে পেঁয়াজের জোগান বেশি হওয়ায় দাম কমে গেছে। অনেক কৃষক পচনের আশঙ্কায় দ্রুত বিক্রি করছেন। অতিরিক্ত সরবরাহের কারণে দরপতন হয়েছে। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন, কিছুদিন পর দাম বাড়তে পারে। আর কৃষকদের দাবি, বাজার নিয়ন্ত্রণ, সংরক্ষণসুবিধা বাড়ানো এবং ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে সরকারের জরুরি উদ্যোগ প্রয়োজন। তা ব্যতিত আগামী মৌসুমে পেঁয়াজ চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারেন অনেক কৃষক। ফলে ভবিষ্যতে উৎপাদন ও বাজার উভয় ক্ষেত্রেই নতুন সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মাঠ পরিচর্যা শাখার পরিচালক ওবায়দুর রহমান মণ্ডল জানিয়েছেন, পেঁয়াজ সারা বছর খাওয়া হলেও যদি সবাই একসঙ্গে বিক্রি করতে যায়, তবে বাজারদর কমে যায়। তাই ফসল কাটার পরপরই উৎপাদন খরচ উঠে আসার আশা করা উচিত নয়।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন