সৌজন্যে কালের কণ্ঠ
প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজধানীর কারওয়ান বাজারের লেভেলক্রসিং মোড়। হাতিরঝিল, তেজগাঁও এবং তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার মিলনস্থল মোড়টি। রাত ১১টার দিকে রেললাইন ধরে পার হচ্ছিলেন কামরুল ইসলাম। সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা একজন যুবক কামরুলের উদ্দেশে জিজ্ঞেস করলেন, ‘কডা?’ কামরুল দেখলেন, ওই যুবকের হাতে ইয়াবা। কামরুল কিছু বললেন না। যুবক আবার জানতে চাইলেন, ‘কডা লাগবে?’ এবার কামরুল দাম জানতে চাইলেন।
জানালেন, প্রতি পিস ৩০০ টাকা। কামরুল বললেন, তিনি কখনো সেবন করেননি, এমনকি কিনতে আগ্রহীও হলেন না। কিন্তু ওই যুবক বলতে থাকলেন, ‘নিয়ে যান। ভালো মাল। খাইলে কাল আবার আসবেন। গাঁজাও আছে।’ এভাবে সেখান থেকে কামরুল এগোতে থাকলেন তেজগাঁও লেভেলক্রসিংয়ের দিকে। দৃশ্যটি গত মঙ্গলবারের।
হেঁটে ৩০ কদম এগোতেই আবার একই ডাক, ‘কডা লাগবে?’ হাতে ইয়াবা এবং গাঁজাসহ তিন যুবক দাঁড়িয়ে ছিলেন। কামরুল তাদের সামনে দিয়ে নির্বিকারভাবে এগোচ্ছিলেন। একজন যুবক তাঁর পিছু নেন এবং কামরুলের পাশে গিয়ে বলেন, ‘লয়ে যান। ঠকবেন না। দুই পিস ৫৫০ টাকা দিয়েন।’ সেই যুবকের হাতে একটি ধারালো ছুরিও ছিল। আরেকটু সামনে গেলে দেখা যায়, কয়েকজন নারী ও পুরুষ বসে আছেন। তাঁরা গাঁজা সেবন করছিলেন। কামরুলকে দেখে এক নারী বলে ওঠেন, ‘কয় পোঁটলা লাগবে?’ ওই নারী গাঁজা বিক্রি করছিলেন।
কারওয়ান বাজারের শুঁটকি ও চাল পট্টির পাশ দিয়ে রেললাইনে ওঠার সরু পথ চলছে। লাইনে বয়স্ক একজন ব্যক্তি গাঁজা বিক্রি করছিলেন। তাঁর কাছ থেকে একজন ক্রেতা গাঁজা কেনেন। কেনার সময় তিনি গাঁজার পুঁটলি খুলে দেখে নেন। বয়স্ক ব্যক্তিটি জানালেন, তিনি ইয়াবাও বিক্রি করছিলেন। মাদক সেবকের ছদ্মবেশে এই প্রতিবেদক তাঁোর পক্ষে জানতে চাইলেন, এখানে ইয়াবা সেবনের ব্যবস্থা করা যাবে কি না। তিনি হাত দিয়ে দেখিয়ে বলেন, ‘রেললাইনের ওই ঘরে গেলে খাওয়া যাবে। আমাকে চা খাওয়াও। ফুয়েল আমি দিমুনে।’ নাম জানতে চাইলে তিনি নিজেকে মামুন বলে পরিচয় দেন।
মঙ্গলবার রাতের পর বুধ ও বৃহস্পতিবার সকালে আবারও কারওয়ান বাজারের রেললাইনে সরেজমিনে যাওয়া হয়। বুধবার দুপুর ২টার দিকে তেজগাঁও লেভেল ক্রসিং থেকে কারওয়ান বাজার লেভেল ক্রসিং পর্যন্ত হেঁটে দেখা যায়, রেলের দুই ধারে অন্তত ৩০ জন নারী-পুরুষ গাঁজার পুঁটলি বিক্রি করছিলেন। তাঁদের সবার হাতে কালো প্যাকেট। তাতে মাদকদ্রব্য ছিল। গত বৃহস্পতিবার সকালে গিয়েও একই দৃশ্য দেখা গেছে। এই তিন দিনে একবারের জন্যও সেখানে পুলিশের অবস্থান দেখা যায়নি। রেললাইন দিয়ে কেউ হেঁটে গেলে বিক্রেতারা প্রথমে আস্তে আস্তে ‘কডা’ শব্দটি উচ্চারণ করেন। প্রয়োজন পড়লে আরও একটু জোরে ‘কডা লাগবে’ বলে ডাক দেন। হেঁটে যাওয়া ব্যক্তি যদি মাদকসেবী হন কিংবা কিনতে যান, তখন তিনি বোঝেন। তখন লেনদেন সম্পন্ন করেন তাঁরা। এই দৃশ্য কেবল ওই তিন দিনের নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে ২৪ ঘণ্টা সেখানে মাদক বিক্রি হয়। এ ছাড়া কারওয়ান বাজারের বিভিন্ন স্পটে সব সময় মাদকের বিকিকিনি চলছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কারওয়ান বাজার এলাকায় অনেক মাদক কারবারি রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে টঙ্গীর রতন, উত্তরার ইকবাল, নাখালপাড়ার প্রান্তি, মালিবাগের জাহাঙ্গীর ও মন্টু মিয়া বড় মাদক ব্যবসায়ী। পুলিশও তাঁদের সম্পর্কে অবগত। তাঁরা মাদক বিক্রির জন্য অনেক লোক রাখেন। একজনকে আটক করা হলে সঙ্গে সঙ্গে একই জায়গায় তাঁদের অন্য লোকজন হাজির হয়ে যায়। এক পিস ইয়াবা বিক্রি করে দিলে ১০ টাকা কমিশন পায় বিক্রেতা। ক্ষেত্রবিশেষে আরেকটু বেশিও পাওয়া যায়। গাঁজা বিক্রি করে দিলেও কমিশন রয়েছে। মোল্লাবাড়ি বস্তির সেলিনা আক্তারসহ তাঁর বোনরাও মাদক বিক্রি করেন। এর বাইরেও ছোট-বড় আরো অসংখ্য ব্যক্তি পুলিশের নাকের ডগায় প্রকাশ্যে মাদক বাণিজ্য করছে। পুলিশ-প্রশাসন ও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের ম্যানেজ করে কারওয়ান বাজারে মাদক বিক্রি হচ্ছে বলে অনেকের অভিযোগ রয়েছে।
রেললাইনের কাঁচাবাজারের পাশের পশ্চিম অংশ তেজগাঁও থানা ও পূর্ব পাশের এলাকা তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার আওতাধীন। তেজগাঁও থানার আওতাধীন ঘরগুলো ভেঙে ফেলা হয়েছে। যদিও রেললাইনের ধারের শিল্পাঞ্চল থানা এলাকায় অনেক ছোট ছোট ঘর রয়েছে। স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে নিশ্চিত হওয়া গেছে, ওই সব ঘর মাদক কারবারি ও তাঁদের সহযোগীদের। কিন্তু কারবারিরা সেখানে থাকেন না। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে তাঁদের আলাদা বাড়ি রয়েছে। মাদক বিক্রির জন্যই ঘরগুলো তৈরি হয়েছে।
রেললাইনের পাশে রয়েছে মোল্লাবাড়ি বস্তি। মোল্লাবাড়ি বস্তির এক বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করে দাবি করেন, ‘বস্তির অনেক লোক মাদকের সঙ্গে জড়িত। রেললাইনে যাঁরা বিক্রি করেন, তাঁদের প্রায় সবাই বস্তিতে থাকেন। বস্তি আর রেলের পাশের ঘরগুলোতে মাদক রাখেন। কেউ কিছু বললে তাকে বস্তিতে থাকতে দেন না। পুলিশ টাকা খায়। চাপে পড়ে বস্তিতে আসামি ধরতে গেল মারও খায়।’
কারওয়ান বাজারের কয়েকজন ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বললে তাঁরা জানান, রেললাইন থেকে মাদক কারবারিদের না ধরলেও ধরা হয় ক্রেতাদের। কারণ, বিক্রেতারা টাকা দেন। এক চাল ব্যবসায়ী বলেন, ‘কারওয়ান বাজারে অনেক মিডিয়া, তেজগাঁওয়ের দুই থানা, এই এলাকায় মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। এরা সবাই জানে। কিন্তু কেন চুপ বুঝে নেন।’
মাদক কারবারিদের কাছ থেকে পুলিশ টাকা নেয়, এই অভিযোগ অস্বীকার করেন তেজগাঁও থানার পরিদর্শক (অপারেশনস) আব্দুল হান্নান বলেন, ‘ঢাকাসহ সারা দেশের রেললাইনেই মাদক বাণিজ্য হচ্ছে। আমরা প্রতিদিন মাদক কারবারিদের ধরি। একজনকে যে জায়গা থেকে ধরব, ১৫ মিনিট পরই ওই জায়গায় নতুন কারবারি চলে আসে। আর যদি রেললাইনে বা বস্তিতে অভিযানে যাই, তখন ১০ জনের কম নিয়ে অভিযানে যাই না। কারণ, ওরা সংঘবদ্ধভাবে আক্রমণ করে।’
তেজগাঁও থানার উপপরিদর্শক (এসআই) জয়দেব বলেন, ‘এক দিন ইয়াবাসহ রেললাইনে একজনকে ধরেছি। সে সময় আশপাশে থাকা করবারিরা চলে যায়। কিন্তু দুজন ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আমাদের দিকে এগিয়ে আসে। আমরা দুজন পুলিশ ছিলাম। এ দৃশ্য দেখে আমরা আলতোভাবে সরে যাই। নতুবা ওরা অস্ত্র চালাবে। ওই সুযোগে কারবারিরা চলে যায়, ওরাও চলে যায়। কারওয়ান বাজার ভয়ংকর জায়গা। এক নারী কারবারিকে ধরলাম। তিনি জানালেন, প্রতি মাসে গাঁজা আর ইয়াবা বিক্রি করে তিনি ৮০ হাজার থেকে এক লাখ টাকা লাভ করছেন। জামিনের টাকা তুলতে সময় লাগে না। সে জন্য, বছরের পর বছর একই কাজ করছেন।’
তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ওসি মুহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানান, ‘এখানে মাদক কারবার আগে ছিল, এখনো চলছে। রেললাইনের পাশে যে বস্তি রয়েছে, ওখানে পরিবারসহ বসবাস করছে বেশ কিছু লোক। ওরাই মাদক বিক্রি করে। সিটি করপোরেশন যতদিন বস্তি তুলে না দেবে, ততদিন মাদক বন্ধ হবে না। আজ ধরি, দুই দিন পর আবার জামিনে চলে আসে। আসামি ধরতে গেলেও তারা আক্রমণ করে।’
সৌজন্যে কালের কণ্ঠ
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন