প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের সম্ভাব্য শান্তিচুক্তির আওতায় হরমুজ প্রণালি ফের সচল হওয়ার পথে রয়েছে। এই ঘটনা এশিয়ার জন্য তাৎক্ষণিকভাবে স্বস্তির ব্যাপার।
কারণ মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে এই অঞ্চলটিই গত কয়েক মাসের যুদ্ধের সবচেয়ে বেশি অর্থনৈতিক অভিঘাত বহন করে চলেছে। তবে সংকটের ধাক্কা খুব দ্রুত সামলে ওঠা সম্ভব নয়। বিপর্যয়ের ধারাবাহিকতা বছরের শেষ পর্যন্ত, এমনকি তার পরেও বজায় থাকতে পারে।
এশিয়ার বিভিন্ন দেশে গত সাড়ে তিন মাসে মুদ্রার মানে ব্যাপক পতন ঘটেছে। মূল্যস্ফীতি বেড়েছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের জট শিল্প উৎপাদনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
হরমুজ প্রণালি দিয়ে সরবরাহ করা জ্বালানি ও বিভিন্ন পণ্যের ওপর এশিয়ার ব্যাপক নির্ভরতাই এই বিপর্যয়ের মূল কারণ। জলপথটি দিয়ে যাওয়া পেট্রলিয়াম ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের পাঁচ ভাগের চার ভাগেরও বেশি ভোক্তা হলো এশিয়ার বাজার।
আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রবিবার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি পোস্টে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় প্রণালিটি আবার খুলে দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি ইরানের বন্দরগুলোর ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ ‘তাৎক্ষণিকভাবে প্রত্যাহারের’ অনুমোদন দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করেছেন। সব ঠিক থাকলে শুক্রবার এই চুক্তি সই হওয়ার কথা।
পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘বিশ্বের জাহাজগুলো, তোমাদের ইঞ্জিন চালু করো।’ ‘তেল প্রবাহিত হতে দাও!’
প্রণালিটি ফের খুলে দেওয়ার চুক্তি কার্যকর হলে তাৎক্ষণিক কিছু স্বস্তি মিলবে। তেল, গ্যাস ও অন্যান্য জ্বালানিবোঝাই শত শত ট্যাঙ্কার আবারও এশিয়ার বন্দর অভিমুখে মাসব্যাপী যাত্রা শুরু করতে সক্ষম হবে। তবে শিল্প বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদেরা সতর্ক করে বলছেন, দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্য প্রবাহ ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক বাজার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে উল্লেখযোগ্য সময় লাগবে। ফলে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খলের চাপ বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী মনে হচ্ছে।
জ্বালানি পরামর্শক প্রতিষ্ঠান উড ম্যাকেঞ্জির এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ভাইস চেয়ারম্যান জশুয়া এনগু বলেন, এশিয়ার জন্য ‘সুখবর হলো, প্রণালি খুলে গেলে তেল এবং কিছু গ্যাসের সরবরাহ আবার নিশ্চিত হবে।’ তবে খারাপ খবর হলো, গত তিন মাসেরও বেশি সময় ধরে ‘প্রতিদিন প্রণালিটি বন্ধ থাকায় অর্থনৈতিক বিপর্যয় অনেক বেড়ে গেছে এবং সরবরাহ শৃঙ্খলের অস্থিরতা আরো গভীরে ছড়িয়ে পড়েছে।’ এনগুর আশঙ্কা যে এই বিপর্যয়ের সমাধান ‘স্বল্প মেয়াদে সম্ভব নয়।’
এশিয়াজুড়ে বিভিন্ন দেশের নেতারা যুদ্ধবিরতির চুক্তিকে স্বাগত জানিয়েছেন। অঞ্চল জুড়ে শেয়ারবাজারে উত্থান দেখা যাচ্ছে। জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার প্রধান শেয়ার সূচক সোমবার প্রায় ৫ শতাংশ বেড়েছে। জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এক্সে লেখেন, এই চুক্তি ‘সংকট সমাধানের পথে একটি বড় পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে অবাধ ও নিরাপদ নৌ চলাচল বাস্তব অর্থেই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।’
এক যৌথ বিবৃতিতে অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং জানান, সম্ভাব্য চুক্তিতে হরমুজ প্রণালি ফের চালু করা এবং অবাধ নৌ চলাচলের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করায় তারা সন্তুষ্ট। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘ক্ষতির মাত্রা পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে সময় লাগবে, তবে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যপথ পুনরুদ্ধার করার বিষয়টি জ্বালানির দাম ও অর্থনীতির ওপর চাপ কমানোর জন্য অপরিহার্য। অন্যান্য বহু দেশের মতো আমাদের দেশও হরমুজ বন্ধের অভিঘাতের শিকার হয়েছে।’
পশ্চিমা দেশগুলো মূলত জ্বালানি পাম্পে সংকট এবং উড়োজাহাজের জ্বালানির বাড়তি দামের মাধ্যমে সংকটের প্রভাব অনুভব করেছে। তবে এশিয়া অঞ্চল মাসের পর মাস ধরে প্রচণ্ড জ্বালানি সংকটের বাস্তব সমস্যার মুখে রয়েছে। এশিয়া অঞ্চলের বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশে অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ঘাটতি দেখা দিয়েছে। এ কারণে বিদ্যুৎ রেশনিংয়ে বাধ্য হওয়ায় অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দেওয়া হয়েছে।
নিরাপদ নৌ চলাচল পুনঃপ্রতিষ্ঠা হলে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল দেশগুলোর জন্য পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি হবে। এর মধ্যে রয়েছে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইন। ফিলিপাইন ইতিমধ্যে জাতীয় জ্বালানি জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছে এবং তারা জ্বালানি ব্যবহার কমানোর বাধ্যতামূলক নির্দেশনাও দিয়েছে।
জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো ধনী অর্থনীতিগুলোও সংকটে রয়েছে। দেশ দুটি নিজেদের আর্থিক সক্ষমতা ও কৌশলগত মজুদ ব্যবহার করে প্রাথমিক ধাক্কা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে। তবে এই শিল্পশক্তিগুলোকে আকাশছোঁয়া তেলের দামের সঙ্গে লড়াই করতে হচ্ছে। এটি তাদের মুদ্রার ওপর চাপ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে পণ্য সরবরাহে বিঘ্ন ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছেছে। বাণিজ্য প্রবাহ আবার শুরু হলে এই অবস্থান থেকে কিছুটা উত্তরণ ঘটতে পারে।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, বর্তমান চাপ তাৎক্ষণিক ভূরাজনৈতিক সংকটের চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। জাহাজগুলোর প্রণালি অতিক্রম করে গন্তব্যে পৌঁছানো এবং আবার ফিরে আসতে কয়েক মাস সময় লাগতে পারে। আবার ইরানে নতুন আগ্রাসনের আশঙ্কা অথবা বীমা সুরক্ষার অভাব জাহাজগুলোকে নিরাপদ দূরের দূরত্ব বজায় রাখতে অনুপ্রাণিত করতে পারে, যার ফলে সময়সীমা আরও দীর্ঘ হতে পারে।
তেল, গ্যাস ও সেগুলোর উপজাত পণ্য সরবরাহে বিঘ্নের কারণে মূল্যস্ফীতির চাপও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, এশিয়ায় তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম সাধারণত তেলের দামের সাথে সম্পর্কিত এবং তিন থেকে ছয় মাস দেরিতে কার্যকর হয়। অর্থাৎ জুনে তেলের দাম কমে গেলেও প্রাকৃতিক গ্যাসের উচ্চ মূল্য বছরের শেষ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
উড ম্যাকেঞ্জির এনগু বলেন, ‘দামের বৃদ্ধির দিক থেকে আমরা এখনো সামগ্রিক প্রভাবের মুখোমুখি হইনি। মার্চে যে তেলের দাম আমরা ১০০ ডলার দেখেছি, তার পূর্ণাঙ্গ প্রভাব তিন থেকে ছয় মাস পরে পুরোপুরি দেখা যাবে। ফলে আমরা এখনো অত্যন্ত অনিশ্চিত সময়ের মধ্যেই আছি।’
জ্বালানি বাজারের পাশাপাশি সরবরাহ শৃঙ্খলের জটও দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতিগুলোর একটি হলো বৈশ্বিক সার সরবরাহ ব্যবস্থা। ইরান, সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইন—এই পাঁচটি প্রধান রপ্তানিকারক দেশ যৌথভাবে বিশ্বের ইউরিয়া মজুদের এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরবরাহ করে। ইউরিয়া নাইট্রোজেনভিত্তিক সারের প্রধান একটি ধরন। সার সরবরাহের বিঘ্ন ইতিমধ্যে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের মে থেকে জুলাই পর্যন্ত চলা প্রধান রোপণ মৌসুমে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।
নিউইয়র্ক টাইমস থেকে অনূদিত
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন