প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সম্প্রতি বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) কার্যালয়ে গিয়ে ড্রাইভিং টেস্ট দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কন্যা ব্যারিস্টার জাইমা রহমান।
এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তিনি দেশের সড়ক ব্যবস্থা ও ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের ভাবনা প্রকাশ করেছেন।
দেশের সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থায় আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সমস্যার কথা উল্লেখ করে 'ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া চালনা আর নানা লঙ্ঘন দিব্যি চলছে কেন'- এই প্রসঙ্গে প্রশ্ন তুলেন জাইমা রহমান।
বুধবার তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড পেজে একটি পোস্টে এসব ভাবনা তুলে ধরেন। পোস্টের সঙ্গে শৈশবে খেলনা গাড়ির স্টিয়ারিংয়ে ধরা একটি সুন্দর মুহূর্তের ছবি যুক্ত করেন তিনি।
এসময়ে জাইমা জানান, দশ বছরেরও বেশি সময় আগে লন্ডনে প্রথম ড্রাইভিং পরীক্ষা দিয়েছিলেন। গত সপ্তাহে বাংলাদেশে গাড়ি চালানোর অনুমতির জন্য এটি তার জীবনের দ্বিতীয় ড্রাইভিং টেস্ট। দুই পরীক্ষাতেই তিনি প্রথমবারেই উত্তীর্ণ হয়েছেন।
তবে তিনি উল্লেখ করেন, গাড়ি চালানোর বাস্তবতার জন্য একটি পরীক্ষায় তিনি যতটা প্রস্তুত হয়েছেন, অন্যটি ততটা করেনি। পোস্টে লেখেন, 'এখানকার পুরো প্রক্রিয়াটির ভেতর দিয়ে যেতে গিয়ে আমি কেবল ড্রাইভিং টেস্ট বা লাইসেন্স নিয়ে ভাবিনি। ভেবেছি আমাদের সড়ক ব্যবহারের সামগ্রিক অভিজ্ঞতা নিয়ে এবং সেই সড়ক নিয়ন্ত্রণের জন্য তৈরি ব্যবস্থাগুলোর সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক নিয়ে।'
জাইমা রহমানের মতে, 'অনেক তরুণ বাংলাদেশির, বিশেষ করে ঢাকার তরুণদের, একটি মৌলিক হতাশা আছে: আমাদের কাছ থেকে নিয়ম মেনে চলার প্রত্যাশা করা হয় এমন একটি ব্যবস্থার ভেতরে, যেটি সব সময় নিরাপদ বা অনুমানযোগ্য মনে হয় না।'
তিনি দেশের পথচারীদের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে বলেন, 'আপনাকে হয়তো পর্যাপ্ত ক্রসিং ছাড়াই দ্রুতগতির সড়ক পার হতে হয়, এমন ফুটপাত ধরে হাঁটতে হয় যেটি হঠাৎ শেষ হয়ে যায় কিংবা দখল হয়ে থাকে, আর পথ করতে হয় বাস, মোটরসাইকেল, রিকশা ও প্রাইভেটকারের ভিড়ের মধ্য দিয়ে, যেগুলোর প্রতিটি চলছে আলাদা আলাদা অলিখিত নিয়মে।'
যাত্রী হিসেবেও নাগরিকদের হাতে কার্যত কিছুই নেই বলে মনে করেন জাইমা। এ প্রসঙ্গে বলেন, 'আপনার বাসটি যাত্রী তোলার জন্য অন্য বাসের সঙ্গে পাল্লা দেবে কি না, হঠাৎ ব্রেক কষবে কি না, গাড়িটির যান্ত্রিক ফিটনেস আছে কি না, কিংবা চালক ঠিকমতো প্রশিক্ষণ ও বিশ্রাম পেয়েছেন কি না, এর কোনও কিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই।'
নতুন চালক হিসেবে সবকিছু নিয়ম মেনে করতে গেলে আরও নানা প্রশ্ন সামনে আসে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। জাইমা প্রশ্ন তুলে বলেন, 'নিয়মগুলো আসলে কী? কেন সেগুলো একেকজনের জন্য একেক রকম মনে হয়? সঠিক পদ্ধতিটা কী? অনলাইন প্রক্রিয়া কেন সব সময় যথেষ্ট নয়? দালাল ধরলে কেন কাজটা দ্রুত হয়ে যায়? পরীক্ষায় পাস করার পরও কেন মাসের পর মাস অপেক্ষা করতে হয় সেই কাগজটির জন্য, যা প্রমাণ করে আমি পাস করেছি?'
বিআরটিএর অনেক সেবা ডিজিটাল করার উদ্যোগকে উল্লেখ করে তিনি বলেন, 'কিন্তু ডিজিটাল করা তখনই কাজে আসে, যখন তা সত্যি সত্যি মানুষের জীবন সহজ করে। অনলাইনে শুরু হওয়া কোনো সমস্যার সমাধান যদি শেষ পর্যন্ত গিয়ে দাঁড়ায় 'অফিসে এসে কথা বলুন'-এ, তাহলে সমস্যাটির সমাধান আসলে হয়নি।'
প্রতিটি অপ্রয়োজনীয় সশরীর যোগাযোগ দেরি, পক্ষপাত কিংবা 'লেনদেনের নতুন সুযোগ' তৈরি করে বলেও মনে করেন প্রধানমন্ত্রীর কন্যা। ব্রোকারেরা এই প্রক্রিয়ার ফাটলটির সুযোগ নেয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রসঙ্গে জাইমা রহমান আরও বলেন, 'মানুষ আইন ভাঙতে চায় বলে নয়; বরং সরকারি প্রক্রিয়াটি এতটাই কঠিন হয়ে ওঠে যে একজন মধ্যস্থতাকারীই সবচেয়ে সহজ পথ হয়ে দাঁড়ায়। এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর, কারণ এতে দুর্নীতি ব্যতিক্রম না হয়ে কাজ আদায়ের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়।'
আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রেও একই সমস্যা রয়েছে বলে মনে করেন জাইমা রহমান। তার মতে, 'লাইসেন্স, ফিটনেস, প্রশিক্ষণ ও সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশ চমৎকার সব নিয়ম তৈরি করতে পারে। কিন্তু যদি নিয়ম বেছে বেছে প্রয়োগ হতে দেখা যায়, মানুষ দ্রুতই সেসব নিয়মের প্রতি শ্রদ্ধা হারিয়ে ফেলে। একজন নতুন চালক তখন ভাবেন: আমাকে বলা হচ্ছে নিয়ম মানা অপরিহার্য, অথচ চোখের সামনেই ফিটনেসবিহীন গাড়ি, বেপরোয়া চালনা আর নানা লঙ্ঘন দিব্যি চলছে। কেন?'
দুর্নীতির সবচেয়ে বড় সমস্যা শুধু অন্যায় সংঘটিত হওয়া নয়, বরং সেই অন্যায়ের প্রতিকার কীভাবে হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ বলে উল্লেখ করেন জাইমা। তিনি মনে করেন, 'অভিযোগ করে কিছু হবে না, বরং নিজেরই বাড়তি ভোগান্তি হবে, মানুষ যদি এমনটা বিশ্বাস করে, তাহলে স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া দাঁড়ায়: 'কী দরকার? চেনাজানা কাউকে বলি।' আর এইভাবে ব্যাপারটি চলতেই থাকে।'
তিনি সড়ক নিরাপত্তাকে শুধু গাড়ি, লাইসেন্স ও শাস্তির বিষয় হিসেবে না দেখার আহ্বান জানিয়েছেন। জাইমার মতে, 'এটি হতে হবে সেই মানুষগুলোকে ঘিরে, যারা প্রতিদিন পথ চলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে হেঁটে যাওয়া একজন শিক্ষার্থী। সন্ধ্যার পর বাড়ি ফেরা একজন নারী। পরের অর্ডারটি ধরার তাড়ায় থাকা একজন ফুড ডেলিভারি রাইডার। অতিরিক্ত সময় ধরে গাড়ি চালানো একজন বাসচালক। ব্যস্ত সড়ক পার হওয়ার চেষ্টা করা একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি। একজন রিকশাচালক, যার বাহনটিই তার জীবিকা। একই সড়ক তাদের প্রত্যেকের কাছে সম্পূর্ণ আলাদা অভিজ্ঞতা।'
ভালো নীতিমালাকে এই বাস্তবতাগুলো বুঝতে হবে উল্লেখ করে জাইমা বলেন, 'নইলে নিয়ম উল্টো দরিদ্র বা বেশি ঝুঁকিতে থাকা সড়ক ব্যবহারকারীদের আরও গভীরভাবে অনানুষ্ঠানিক ব্যবস্থার দিকে ঠেলে দেবে, আর তাতে শোষণ ও ঘুষের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।'
নিরাপদ সড়কের দাবিতে তরুণদের দীর্ঘদিনের আন্দোলনের কথাও তুলে ধরেন জাইমা রহমান। তিনি বলেন, '২০১৮ সালে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা রাস্তায় নেমেছিল, লাইসেন্স পরীক্ষা করেছিল, যানবাহন চলাচল সামলানোর চেষ্টা করেছিল এবং ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও লাইসেন্সহীন চালকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছিল। আট বছর পরও সেই উদ্বেগগুলোর অনেকটাই রয়ে গেছে।'
এ অবস্থায় সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্নের ধরন বদলানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন জাইমা। তার মতে, 'তাই প্রশ্নটি এখন সম্ভবত আর এই নয় যে 'সড়ক নিরাপদ নয়'। প্রশ্নটি বরং এই: 'সমস্যাগুলো তো আমরা আগেই চিহ্নিত করে দিয়েছি। ব্যবস্থাটি এখনো সেগুলো ঠিক করল না কেন?' আমার মনে হয়, এখানেই আমাদের প্রশ্নটা বদলে যায়। প্রশ্ন কেবল এটি হতে পারে না যে 'নাগরিকদের দিয়ে কীভাবে নিয়ম মানানো যাবে?'
আইন প্রয়োগকে কীভাবে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করা যায় এবং অভিযোগ ও অন্যায়ের বিষয়ে জানানোকে কীভাবে নিরাপদ ও কার্যকর করা যায়- এসব বিষয় নিয়েও ভাবার আহ্বান জানান তিনি।
পোস্টের শেষে জাইমা রহমান লেখেন, 'আমাদের এটিও জিজ্ঞাসা করা উচিত: সংযোগ থাকুক বা না থাকুক, আমরা কীভাবে নিশ্চিত করব যে সবাই একই পরিষেবা পাবে?, আমরা কীভাবে আইন প্রয়োগকে ন্যায্য ও সামঞ্জস্যপূর্ণ করতে পারি?, কীভাবে আমরা অভিযোগ ও অন্যায়ের বিষয়ে জানানোকে নিরাপদ ও সার্থক করে তুলতে পারি? এবং আমরা কীভাবে রাস্তা ডিজাইন করব যাতে একটি সাধারণ ভুলের কারণে কারও জীবনহানি না ঘটে?'
সবশেষে তিনি বলেন, 'পরিবর্তন যদি আমরা সত্যিই চাই, তাহলে আমাদের ভাবনার কাঠামোটাই নতুন করে সাজাতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন