প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
অনেক ইসরায়েলির মনে হচ্ছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প শিগগিরই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সম্পর্ককে নতুন করে মূল্যায়ন করতে পারেন। ১৯৪৮ সালে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ওয়াশিংটনের এই জোট দেশটির সামরিক শক্তিকে টিকিয়ে রাখতে খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে এসেছে।
এদিকে, বর্তমানে রাজনৈতিকভাবে কঠিন সময় পার করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। দুর্নীতির মামলাগুলোর কারণে তিনি আইনি ঝুঁকির সম্মুখীন রয়েছেন। পাশাপাশি আগামী বছরের শেষে সম্ভাব্য সাধারণ নির্বাচনে ক্ষমতা হারানোর আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, নিজের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ টিকিয়ে রাখতে নেতানিয়াহু এখন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পথ অনুসরণ করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌছানোর চেষ্টা করছে, যেখানে লেবাননের বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হবে। অন্যদিকে, ২০২৩ সাল থেকে লেবাননে সামরিক অভিযান চালিয়ে আসা ইসরায়েলের একটি বড় অংশ সেই সংঘাত অব্যাহত রাখার পক্ষে। এই দুই বাস্তবতার মধ্যে আটকে পড়ে বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তার রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম কঠিন সময়ের মুখোমুখি হয়েছেন।
২০২৫ সালের জুনে ইরানকে ঘিরে সংঘাতের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্যের খবর প্রকাশিত হয়। এক বছর পর তেহরানকে নিয়ে ভবিষ্যৎ কৌশল নির্ধারণে দুই দেশের মধ্যে সেই দূরত্ব আরও বেড়েছে বলেই মনে করা হচ্ছে।
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনায় তেহরান দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযান বন্ধের দাবি তুলেছে। এই ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে বড় ধরনের মতপার্থক্য দেখা দিতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
গত মাসে ফাঁস হওয়া একটি কথিত ফোনালাপ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়, যার সত্যতা হোয়াইট হাউস অস্বীকার করেনি। ওই কথোপকথনে দেখা যায়, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দ্রুত শেষ করতে আগ্রহী ট্রাম্পকে লেবাননে হামলা বন্ধ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় নেতানিয়াহুর ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করতে শোনা যায়।
বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ওই কথিত ফোনালাপে ডোনাল্ড ট্রাম্প বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুকে ‘উন্মাদ’ বলে উল্লেখ করেন এবং অকৃতজ্ঞতার অভিযোগ তোলেন। ট্রাম্প নাকি নেতানিয়াহুকে বলেন, তার হস্তক্ষেপ না থাকলে নেতানিয়াহু ইতোমধ্যে কারাগারে থাকতেন।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্প আরো বলেন, ‘এখন সবাই তোমাকে ঘৃণা করে। এই ঘটনার কারণে সবাই ইসরায়েলকেও ঘৃণা করছে।’
গত সপ্তাহে অ্যাক্সিওসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ‘জানেন, আসল কর্তৃত্ব কার হাতে।’ এই মন্তব্যটি দুই নেতার সম্পর্কের টানাপোড়েনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে। জুন মাসে এক সংবাদ সম্মেলনে মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স বলেন, বর্তমানে ট্রাম্পই বিশ্বের একমাত্র শীর্ষ নেতা, যিনি ইসরায়েলের প্রতি সহানুভূতিশীল অবস্থান বজায় রেখেছেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্ভাব্য চুক্তির সমালোচনা করা ইসরায়েলি মন্ত্রীদেরও সতর্ক করে বলেন, ‘ইসরায়েলকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত প্রতিরক্ষামূলক অস্ত্রের বড় অংশই যুক্তরাষ্ট্র তৈরি করেছে এবং এর ব্যয় বহন করেছেন মার্কিন করদাতারা।’
‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ শিবিরেও বাড়ছে ইসরায়েলবিরোধী মনোভাব। সাম্প্রতিক জনমত জরিপে দেখা গেছে, শুধু সাধারণ মার্কিন জনগণই নয়, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ (এমএজিএ) আন্দোলনের একটি অংশের মধ্যেও ইসরায়েলকে নিয়ে সংশয় ও সমালোচনা বাড়ছে। এমএজিএ শিবিরের কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব, যেমন ট্রাম্পের দীর্ঘদিনের সমর্থক মার্জোরি টেইলর গ্রিন, ইসরায়েলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনের কঠোর সমালোচনা করেছেন।
ডানপন্থী রাজনৈতিক অঙ্গনের অন্যতম সরব সমালোচক সাবেক টেলিভিশন উপস্থাপক টাকার কার্লসন। তিনি জুনের শেষ দিকে মন্তব্য করেন, ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত বুঝতে পেরেছেন যে, ইসরায়েলই তার প্রশাসনের জন্য সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ বা ঝুঁকির উৎস হয়ে উঠতে পারে। নিজের পডকাস্টে টাকার কার্লসন অভিযোগ করেন, ইসরায়েল নানা ধরনের চাপ, প্ররোচনা ও তদবিরের মাধ্যমে ট্রাম্পকে ইরানের বিরুদ্ধে হামলা চালাতে রাজি করিয়েছিল। তার দাবি, এই হামলাকে ব্যবহার করে পরে প্রতিবেশী দেশ লেবাননের বিরুদ্ধে আরেকটি যুদ্ধ শুরু করার পরিকল্পনা ছিল।
কার্লসনের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে নতুন সংঘাতের পেছনে ইসরায়েলের প্রভাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং এ ধরনের পদক্ষেপ যুক্তরাষ্ট্রকে আরো গভীর আঞ্চলিক সংকটে জড়িয়ে ফেলতে পারে। ওয়াশিংটনের সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সাধারণ এবং জর্জটাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ড্যানিয়েল বাইম্যান মনে করেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন একটি অবস্থানে রয়েছেন, যেখানে ইসরায়েল নীতি নিয়ে তার হাতে যথেষ্ট স্বাধীনতা রয়েছে।
আল জাজিরাকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বায়ম্যান বলেন, ‘ট্রাম্পের যথেষ্ট রাজনৈতিক নমনীয়তা রয়েছে। যদিও রিপাবলিকান পার্টির অনেক সদস্য দৃঢ়ভাবে ইসরায়েলপন্থী, তবুও ট্রাম্পের একটি অত্যন্ত অনুগত সমর্থকগোষ্ঠী রয়েছে এবং তিনি বারবার প্রমাণ করেছেন যে দলের অধিকাংশ সদস্যকে নিজের অবস্থানের পক্ষে আনতে পারেন।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ ক্ষেত্রে তিনি অনেক ডেমোক্র্যাটেরও সমর্থন পেতে পারেন, কারণ দলটির মধ্যে ইসরায়েলের সমালোচনা ক্রমেই বাড়ছে।’ ইসরায়েলের ইতিহাসজুড়ে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তার গুরুত্ব দেশটির খুব কম মানুষই অস্বীকার করেন। ২০১৬ সালে দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি সমঝোতা স্মারকের আওতায় ইসরায়েল ১০ বছরে ৩৮ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সহায়তা পাওয়ার সুযোগ পায়, যা যুক্তরাষ্ট্রের অন্য কোনো দেশের সঙ্গে করা সবচেয়ে বড় সামরিক সহায়তা চুক্তিগুলোর একটি।
কূটনৈতিক ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলের প্রধান সমর্থক হিসেবে কাজ করেছে। গাজা যুদ্ধকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরায়েলের ওপর চাপ বাড়লেও ওয়াশিংটন বিভিন্ন সময়ে দেশটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। জাতিসংঘে গাজা ইস্যুতে আনা একাধিক প্রস্তাবের ক্ষেত্রেও যুক্তরাষ্ট্র তার ভেটো ক্ষমতা ব্যবহার করে ইসরায়েলকে সমর্থন দিয়েছে। ইতিমধ্যে, ইসরায়েলের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীরা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দেশটির ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতাকে বড় ইস্যু হিসেবে তুলে ধরছেন। জুনের মাঝামাঝি সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেতা ইয়ার ল্যাপিড নেতানিয়াহুর সমালোচনা করে বলেন, তিনি ইসরায়েলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখতে ব্যর্থ হয়েছেন। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে লাপিদ লিখেছিলেন, ‘আমরা যদি দ্রুত এই সরকারকে পরিবর্তন করতে না পারি, তাহলে ইসরায়েলের বৈদেশিক সম্পর্ক ধ্বংস হয়ে যাবে।’
এদিকে, ইসরায়েলি সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান এবং সম্ভাব্য নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বী গাদি আইজেনকোটও নেতানিয়াহুর পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনার কঠোর সমালোচনা করেছেন। আইজেনকটের অভিযোগ, নেতানিয়াহুর ভুল পদক্ষেপের কারণে ডোনাল্ড ট্রাম্প এককভাবে ইরানের সঙ্গে সমঝোতার পথে এগোতে উৎসাহিত হয়েছেন। এর ফলে ইসরায়েল তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্র যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে আরো দূরে সরে যাচ্ছে।
ইসরায়েলি রাজনৈতিক বিশ্লেষক নিমরোদ ফ্লাশেনবার্গের মতে, বিশ্বে ইসরায়েলের অবস্থান নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি। তিনি বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলের জন্য সবকিছু, নিরাপত্তা, প্রযুক্তি, কূটনৈতিক সমর্থনসহ প্রায় সব ক্ষেত্রেই দেশটি ওয়াশিংটনের ওপর নির্ভরশীল।’
মার্কিন লেখক ও সাবেক কূটনীতিক অ্যারন ডেভিড মিলার বলেন, অতীতেও বিভিন্ন মার্কিন প্রেসিডেন্টের সঙ্গে ইসরায়েলের মতবিরোধ হয়েছে, তবে খুব কম ক্ষেত্রেই তা এত প্রকাশ্যে এসেছে। তার মতে, ‘বর্তমান প্রশাসনের মতো ভাষায় আগে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্ট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট ইসরায়েল সম্পর্কে প্রকাশ্যে মন্তব্য করেননি। এ ছাড়া দুই দেশের নেতাদের ব্যক্তিগত আলোচনার তথ্য ফাঁস হয়ে ইসরায়েলি নেতৃত্বকে বিব্রত করার ঘটনাও বিরল।’
মিলার আরো বলেন, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস এবং সাধারণ জনগণের মধ্যে ইসরায়েলের জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কমেছে এবং সেটা রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট উভয় শিবিরেই। তবে তিনি মনে করেন, ট্রাম্প প্রশাসন ইসরায়েলের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি ছিন্ন করার কথা ভাবছে, এমন কোনো ইঙ্গিত নেই। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ‘ট্রাম্প যদি ইসরায়েলের ওপর বড় ধরনের চাপ প্রয়োগ করেন, তাহলে সেটি এমন কোনো কূটনৈতিক সাফল্য অর্জনের জন্যই হবে, যা তাকে রাজনৈতিকভাবে লাভবান করবে।’
তিনি বলেন, বর্তমানে লেবানন, গাজা বা ইসরায়েল-সৌদি সম্পর্ক স্বাভাবিককরণের মতো কোনো ইস্যুতেই এমন বড় অগ্রগতির সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না, যার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দীর্ঘ সময় ধরে ইসরায়েলের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন