প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতিবিজড়িত মানিকগঞ্জের শিবালয়ের তেওতা জমিদার বাড়িটি হয়ে উঠতে পারে একটি আকর্ষণীয় পর্যটন কেন্দ্র। ঈদুল আজহা উপলক্ষে এ জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে বর্তমানে রয়েছে এক মেলা। ঈদের পরের দিন বিকাল থেকে প্রতিদিন জমিদার বাড়িতে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় দেখা যাচ্ছে।
দর্শনার্থীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে তেওতা জমিদার বাড়ির আঙিনা। এবারের ঈদের ছুটিতে প্রাচীনতম এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন দেখতে জেলার বিভিন্ন এলাকা এবং অন্যান্য জেলা থেকেও নারী, পুরুষ ও শিশুসহ নানা বয়সী মানুষ ঘুরতে আসেন ঐতিহ্যবাহী তেওতা জমিদার বাড়িতে। এখানে বসেছে একটি গ্রামীণ মেলা। এ মেলায় শিশুদের জন্য খেলনা, নাগরদোলা, নৌকাসহ নানা ধরনের খাবার ও প্রসাধনী সামগ্রীর দোকান বসেছে জমিদার বাড়ির প্রাঙ্গণে।
আরিচা ঘাট থেকে মাত্র আড়াই কিলোমিটার উত্তরে যমুনা নদীর তীরে সবুজ-শ্যামল গাছপালায় ঢাকা প্রায় আট একর জায়গা জুড়ে গড়ে ওঠেছিল তেওতার জমিদার বাড়িটি ১৮শতকের শেষের দিকে। তৎকালীন জমিদার পঞ্চানন রায় চৌধুরী এর নির্মাণ করেছিলেন। ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নিয়েছে জমিদার হিমশংকর রায়ের প্রতিষ্ঠিত বাড়িঘেঁষা নবরত্ন মঠটি। বাড়ির ছাদ থেকে পুরো কাঠামো দেখতে খুবই সুন্দর। অসাধারণ কারুকার্যখচিত বাড়িটি চোখের সামনে এক অপরূপ দৃশ্য তুলে ধরে। যমুনা নদীর কলকল ধ্বনি এবং চারদিকের মায়াময় পরিবেশ পর্যটকদের আকর্ষণের অন্যতম কারণ। যেকোনো জেলা থেকে সহজ যাতায়াত ব্যবস্থা এবং কম খরচের কারণে বিশেষ দিনে এখানে দর্শনার্থীদের উপচে পড়া ভিড় লক্ষ করা যায়।
তেওতা জমিদার বাড়িতে মোট ৫৫টি কক্ষ আছে। বাড়ির সামনে শান বাঁধানো ঘাটলাসহ বিশাল লাল শাপলা পুকুর রয়েছে। পুকুরের জলতরঙ্গে পুরো রাজবাড়ির অবয়ব দেখা যায়। মনে হয় পানির নিচে যেন আরেকটি জমিদার বাড়ি। আরেকটি পুকুরও আছে ভেতরে। রাজপ্রাসাদের সামনে একটি বড় মাঠ রয়েছে সবুজ ঘাসে ঢাকা। পুকুরের চারপাশে অনেক তাল গাছ রয়েছে। পুরো বাড়িটি পোড়া মাটির ইট ও চুনামাটি দিয়ে তৈরি তিনতলা বিশিষ্ট অট্টালিকা। প্রতিটি ভবন কাঠ, লোহা ও চিনা মাটি দিয়ে তৈরি। বিভিন্ন কারুকার্য খচিত নকশা দিয়ে তৈরি বাড়িটি মুগ্ধকর। দরজা-জানালাসহ আসবাবপত্রগুলো শাল কাঠের তৈরি। প্রাসাদের উত্তর পাশে একটি নাটমন্দির ছিল।
মন্দিরের মধ্যে দেবদেবীর পিতল নির্মিত বিভিন্ন মূর্তি ছিল। এখানে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজন পূজা-অর্চনা করতেন বলে জানালেন এলাকাবাসী। রাজাদের শাসন ব্যবস্থার ঘর ও কয়েদিদের বন্দি রাখার ঘরগুলোও কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মাঝখানে ছিল অন্দরমহল। কোনো প্রজা খাজনা বা কর দিতে অস্বীকার করলে পূর্বপাশে বিশাল অন্ধকূপে এনে তাদের বন্দি করে রাখা হতো। বাড়ির দক্ষিণ পাশে দুই অট্টালিকার মাঝে ওপরে টিনের চালার মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছিল নাটক করার বিশাল ঘর। জমিদার বাড়ির সামনে টালির একটি বিশাল ঘর রয়েছে। নবরত্ন ও দোলন মঞ্চ সবচেয়ে আকর্ষণীয়। নবরত্নটির চারপাশে নয়টি মঠ দিয়ে প্রায় চারতলা বিশিষ্ট ৭৫ থেকে ৮০ ফুট উচ্চতার নবরত্ন মঠটি তৈরি হয়। ১৮৫৮ সালে নির্মিত হয় নবরত্ন মঠ। ১৮৯৭ সালে মঠটি ভূমিকম্পে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ১৯০৬ সালে পুনরায় মেরামত করা হয়।
প্রায় তিন শ বছরের পুরোনো এই জমিদার বাড়িটি এখন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে পুরোনো ঐতিহ্যবাহী সৌন্দর্যের কিছুটা এখনও রয়ে গেছে। তৎকালীন জমিদাররা মাসব্যাপী দোলনযাত্রার আয়োজন করতেন এ বাড়িতে। কালের পরিক্রমায় রাজা রাজার রাজ্য নেই, নিয়মিত পূজা-অর্চনা নেই। দেবালয়ে দেবতাদের সন্তুষ্টিতে দেবদাসীদের নৃত্যাঞ্জলি, শঙ্খধ্বনি, পুরোহিতের মন্ত্রপাঠ, ধূপের ধোঁয়া এখন থেমে গেছে বহু আগে। দেবালয়ের দুর্ভেদ্য প্রকোষ্ঠ আর দেয়াল পেরিয়ে দেবদাসীদের হাসি-কান্নার শব্দ হয়তো এখনো ভগ্ন রাজপ্রাসাদের বাতাসে ভেসে বেড়ায়।
তবে তেওতা গ্রামটি আরও প্রসিদ্ধ হয়ে উঠেছিল জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ও তার স্ত্রী প্রমীলার স্মৃতি জড়িয়ে থাকার কারণে। তেওতা গ্রামের মেয়ে প্রমীলা, জমিদার বাড়ির পূর্বপাশে বসন্ত কুমার সেন এবং গিরিবালা সেন দম্পতির মেয়ে। তার ডাকনাম ছিল দুলি। জমিদার হিমশংকর রায় চৌধুরী প্রমীলাকে খুব আদর করতেন। জমিদার বাড়ি বেড়াতে এসে নজরুল ইসলাম মাঝে মাঝে রাতে গান-বাজনার আসর জমাতেন। প্রথমে প্রমীলা দেবীকে দেখে কবি নজরুল ইসলাম মুগ্ধ হয়ে ”তুমি সুন্দর তাই চেয়ে থাকি প্রিয়, সে কি মোর অপরাধ” এই গানটি রচনা করেছিলেন। সেখানে একমাত্র গায়ক ছিলেন কাজী নজরুল ইসলামের। দুলি তখন ছিলেন ছোট একটি মেয়ে। মাঝেমধ্যে পান বানিয়ে নজরুলের হাতে তুলে দিতেন। দুজনের পরিচয় এবং ঘনিষ্ঠতা সেখান থেকেই শুরু হয়। প্রমীলা দেবী নজরুলকে কবি বলে ডাকতেন। ঘনিষ্ঠতার এক পর্যায়ে দুলি ওরফে প্রমীলাকে কবি নজরুল কলকাতায় গিয়ে পারিবারিকভাবেই বিয়ে করেন। পরে জমিদার হিমশংকর রায়ের আমন্ত্রণে নজরুল নববধুকে নিয়ে আবার তেওতায় আসেন। প্রায় দুই সপ্তাহ থাকার সময় প্রতি রাতে জমিদার বাড়িতে গানের ও কবিতার আসর বসাতেন। এখানে বসে নজরুল বহু গান ও কবিতা রচনা করেছেন বলে জানা গেছে। দর্শকের আসনে জমিদার বাড়ির লোকজনের সাথে প্রমীলাও থাকতেন। কাজী নজরুলের স্মৃতিধন্য তেওতায় প্রমীলা দেবীর জন্মভিটা এখনো রয়ে গেছে। নজরুল-প্রমীলার স্মৃতি ধরে রাখতে এখানে নির্মাণ করা হয়েছে নজরুল-প্রমীলা স্মৃতি মঞ্চ। পাশেই রয়েছে টালিতে নির্মিত একটি চকিদার শেড। বিশেষ বিশেষ দিনে এখানে পর্যটকদের ভিড় লক্ষ করা যায়। তাছাড়া নজরুলের জন্ম ও মৃত্যু দিবস পালন করা হয় সরকারিভাবেই। এ সময় পর্যটকদের সমাগম হয়। এখানে গড়ে উঠেছে নজরুল কেন্দ্রিক বিভিন্ন সংগঠন। জাতীয়ভাবেও কমিটি রয়েছে। তবে বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। স্থানীয়রা মনে করছেন জমিদার বাড়িটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য আরও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
শিবালয় উপজেলা নির্বাহী অফিসার মনিষা রাণী কর্মকার বলেন, আমি শিবালয় উপজেলায় যোগদান করার পরপরই তেওতা জমিদার বাড়িটি পরিদর্শন করেছি। এ বাড়িটির দেয়ালে যে কারুকার্য রয়েছে তা ঐতিহাসিক নিদর্শন। ২০১৫ সালে প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের নজরে আসলে এ বাড়ির কিছু অংশ তাদের তত্ত্বাবধানে নিয়ে নেয়। প্রায় দশ বছর অতিবাহিত হয়েছে। এ বাড়ির সামান্যটুকু অংশ সংরক্ষণ করেছে, যেটুকু বাকি আছে তা অনেক হুমকির মুখে। এছাড়া জমিদার বাড়িটি খোলামেলা থাকায় এখানে মাদকের আড্ডা বসে, কোনো নিরাপত্তার ব্যবস্থা এখানে নেই। বর্তমানে সংরক্ষণের অভাবে এ বাড়িটি এখন একেবারেই অরক্ষিত অবস্থায় পড়ে আছে। এ বিষয়ে আমি প্রত্নতত্ত্ব বিভাগকে চিঠি দিয়েছি। এরপর প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ১২০০ মিটার সীমানা প্রাচীরের নির্মাণকাজ শুরু করেছে।
মানিকগঞ্জ জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, নজরুল-প্রমীলার বহু স্মৃতিবিজড়িত তেওতা জমিদার বাড়িটি বর্তমানে সংস্কার করা প্রয়োজন। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বনভোজনের জন্য এখানে আসেন। এছাড়া দেশের বিভিন্ন এলাকার পর্যটকরা এখানে ঘুরতে আসেন। তবে তাদের থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় তারা দিনে এসে দিনেই চলে যান। জমিদার বাড়িটি সংস্কার না করায় তার নিজস্ব সৌন্দর্য হারাতে বসেছে। বাংলাদেশ প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ সম্প্রতি বাড়িটি অধিগ্রহণ করলেও বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে তেমন কোনো অগ্রগতি নেই বললেই চলে। এ বাড়ির পশ্চিম পাশে পাকা ঘাটলা বাঁধা একটি দীঘি আছে, এই দীঘিটিও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে যতটুকু সম্ভব সংরক্ষণ করে দৃষ্টিনন্দন এবং সৌন্দর্যবর্ধন করার পরিকল্পনা রয়েছে। তাছাড়া তেওতা জমিদার বাড়ির আঙিনায় যে খালি জায়গা পড়ে আছে সেখানে বৃক্ষরোপণ করা হবে। পুরো তেওতা জমিদার বাড়িটি হোক অপার সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। যদি তেওতা জমিদার বাড়ি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়, তবে এটি একদিকে সরকারের রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করবে এবং অপরদিকে এ এলাকার মানুষের কর্মসংস্থানের সৃষ্টি করবে। অতিদ্রুত তেওতা জমিদার বাড়িটিকে পর্যটন কেন্দ্র করার জন্য মাননীয় পর্যটন মন্ত্রীর নিকট আবেদন করা হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন