প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশে প্রচলিত ওজন পরিমাপের নিয়ম অনুযায়ী, ৪০ কেজিতে এক মণ ধান হওয়ার কথা। কিন্তু নওগাঁর মান্দা উপজেলার বিভিন্ন ধানের হাটে এই নিয়ম যেন শুধুমাত্র কাগজের মধ্যে সীমাবদ্ধ। ঐতিহাসিক পাঁজরভাঙ্গা হাটসহ বাকী বাজারগুলোতেও কৃষকদের প্রতি মণে ৪১ কেজি ধান দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। এর ফলে বছরজুড়ে ওজনে অতিরিক্ত ধান দিয়ে লোকসানের মুখে পড়ছেন হাজার হাজার কৃষক।
সরেজমিনে শুক্রবার (১৯ জুন) উপজেলার ঐতিহাসিক পাঁজরভাঙ্গা হাট ঘুরে দেখা যায়, সকালে দূর-দূরান্ত থেকে ভ্যান, ভটভটি ও সাইকেলে করে ধান নিয়ে আসছেন কৃষকেরা। হাটে ধানের ব্যাপক জোগান থাকলেও বিক্রির সময় কৃষকদের এক অঘোষিত নিয়মের সম্মুখীন হতে হচ্ছে। ব্যবসায়ীরা ৪০ কেজির পরিবর্তে ৪১ কেজি মণ হিসেবে ধান কিনছেন। শুধু পাঁজরভাঙ্গা নয়, উপজেলার জোতবাজার ও জোকাহাটে একই ছবি দেখা যাচ্ছে।
বর্তমানে হাটে বিভিন্ন ধরনের ধান বিক্রি হচ্ছে। জিরা ধানের প্রতি মণ ১ হাজার ৪০০ টাকা, সুবলতা ১ হাজার ৩৪০ টাকা, কাটারি ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং স্বর্ণা-৫ জাতের ধান ১ হাজার ১৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কিন্তু বাজারে ধানের মূল্য কম হওয়ার পাশাপাশি অতিরিক্ত ওজন দেওয়ার কারণে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ ক্রমবর্ধমান।
স্থানীয় কৃষকরা অভিযোগ করছেন যে, একটি অসাধু ব্যবসায়ী চক্র দীর্ঘদিন ধরে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই অনিয়ম চালিয়ে আসছে। এ বিষয়ে সবাই খোঁজখবর জানলেও কার্যকর নজরদারি না থাকায় কৃষকদের বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ধান দিতে হচ্ছে। ফলে কৃষকরা প্রতি মণে ১ কেজি করে বেশি ধান দিয়ে বড় অর্থনৈতিক ক্ষতির শিকার হচ্ছেন। এই প্রকাশ্য ওজন জালিয়াতি বন্ধ করতে এবং কৃষকদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করতে, ভুক্তভোগী কৃষকরা স্থানীয় প্রশাসন, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করছেন।
হাটে ধান বিক্রি করতে আসা কৃষক মো. জহুরুল বলেন, "আমি ১২ মণ ধান নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু ৪১ কেজিতে মণ ধরায় ১২ কেজি ধান বেশি চলে গেছে। আমরা অনেক কষ্ট করে ধান উৎপাদন করি। হাটে আনলে ব্যবসায়ীরা বলে ৪০ কেজিতে ধান নেবে না, ৪১ কেজি দিতে হবে। বাধ্য হয়ে আমরা ধান বিক্রি করি।" অন্যদিকে, আরেক কৃষক মো. আজিজার জানান, "৫ মণ ধান নিয়ে এসেছিলাম। ধানের দামও কম, আবার প্রতি মণে ১ কেজি বেশি দিতে হয়েছে। প্রশাসনের এ বিষয়ে কোনো নজরদারি নেই। আমরা সব দিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছি।"
ওজনে অতিরিক্ত ধান নেওয়ার এই প্রকাশ্য অনিয়মের বিষয়ে কিছু ধান ব্যবসায়ী বলছেন যে, এটি অনিয়ম, তবে তারা দায় চাপাচ্ছেন দীর্ঘদিনের অভ্যাসের ওপর। ধান ব্যবসায়ী মো. দেলোয়ার হোসেন ও মো. মেস্তাক জানাচ্ছেন, "এই হাটে অনেক আগে থেকেই ৪১ কেজিতে মণ নেওয়া হয়। সবাই এভাবেই নিচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী ৪০ কেজি হলেও, বাজারে দীর্ঘদিন ধরে এই পদ্ধতি চলে আসছে।"
এ বিষয়ে মান্দা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আখতার জাহান সাথী বলেন, "হাট-বাজারে ওজন সংক্রান্ত অনিয়ম এবং কৃষক ও ভোক্তাদের প্রতারিত হওয়ার বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পাশাপাশি মোবাইল কোর্ট পরিচালনাসহ নিয়মিত তদারকির উদ্যোগ নেওয়া হবে।"
নওগাঁ-৪ (মান্দা) আসনের সংসদ সদস্য ডা. ইকরামুল বারী টিপু বলেন, "সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী, যে কোনো কৃষিপণ্য বা ফলের ক্ষেত্রে ৪০ কেজি মানে ৪০ কেজি। আইনত বাড়তি বা ‘ঢলন’ নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। কৃষকেরা সচেতন হলে এবং প্রশাসন নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করলে এ ধরনের অনিয়ম দ্রুত বন্ধ করা সম্ভব। বাজারমূল্য ওঠানামা করলেও পণ্যের ওজন অবশ্যই সঠিক থাকতে হবে।"
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন