প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ইউক্রেন যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইউরোপ নিজেদের সামরিক ও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ঢেলে সাজাচ্ছে। মহাদেশটির নিরাপত্তার মূল কেন্দ্রবিন্দুতে এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার যুক্ত হয়েছে।
প্রতিরক্ষা খাতে ইউরোপীয় দেশগুলোর বিপুল বিনিয়োগ বর্তমানে এ প্রযুক্তিতে মিশছে বলে সিএনবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সামরিক কৌশলের দ্রুত পরিবর্তনের গতিকে আরও স্পষ্ট করেছে গত দুই সপ্তাহের কিছু বড় ঘোষণা। উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট ন্যাটো ড্রোনের সুরক্ষায় নতুন উদ্যোগের ঘোষণা দিয়েছে, যেখানে যুক্তরাজ্য ড্রোন ও ড্রোন-বিধ্বংসী ব্যবস্থার জন্য শত কোটি পাউন্ড বরাদ্দ করে।
জার্মানি ইউক্রেনের জন্য ৫০ হাজার ড্রোন সংগ্রহের পদক্ষেপ নিয়েছে এবং প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি খাতের স্টার্টআপ ‘হেলসিং’ এক হাজার ৮০০ কোটি ডলার পেয়েছে। এসব ঘটনা সামরিক পরিকল্পনার বড় ধরনের পরিবর্তনের চিত্র তুলে ধরে। যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় বিভিন্ন ব্যবস্থা একসময় শুধু বিশেষ কিছু প্রয়োজনে ব্যবহৃত হত, কিন্তু এখন তা আধুনিক যুদ্ধকৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। নতুন এই ধারা কেবল ড্রোন নির্মাতাদের জন্যই নয়, বরং এআই, সফটওয়্যার, ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার ও সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা তৈরি করে এমন কোম্পানি গুলোর জন্যও নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন করছে।
‘মর্নিংস্টার’-এর বিশ্লেষক লোরেদানা মুহাররেমি বলেছেন, ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা বহুমাত্রিক যুদ্ধক্ষেত্রের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, একটি ট্যাংক বর্তমানে কেবল গোলাবারুদ ছুড়বে না, বরং ড্রোন উৎক্ষেপণ করবে এবং স্যাটেলাইট ও চালকহীন আকাশযান থেকে সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর লাইভ ডেটা সংগ্রহ করবে, যুদ্ধক্ষেত্রে তথ্য আদান-প্রদান করবে এবং সমন্বিত নেটওয়ার্ক ফোর্সের অংশ হিসেবে কার্যকর হবে।
ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের তৈরি কম খরচের ‘শাহেদ’ ড্রোনের ব্যবহার প্রতিফলিত করেছে, যে এআই ড্রোন তুলনামূলকভাবে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। এগুলো নিখুঁতভাবে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ করতে, প্রচলিত অস্ত্রের আক্রমণ সক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দিতে এবং দিন দিন মানুষের নিয়ন্ত্রণ ছাড়াই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করতে সক্ষম।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের ব্যবহার কেমন রূপ নিচ্ছে? ইউক্রেন ও রাশিয়ার যুদ্ধের বাস্তব অভিজ্ঞতা পুরো ইউরোপের সামরিক কেনাকাটা ও প্রতিরক্ষা কৌশল আমূল বদলে দিচ্ছে। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোনের যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণের বিষয়টি মাথায় নিয়ে সামরিক সক্ষমতা বাড়াতে পশ্চিমা দেশগুলি শত কোটি ডলারের নতুন পরিকল্পনা গ্রহণ করছে।
ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে ঘোষণা করেছেন, জোটের সামরিক বাহিনী ‘ড্রোন-রেডি’ বা ড্রোনের জন্য প্রস্তুত। তিনি জানিয়েছেন, ন্যাটোর সদস্য দেশগুলি আগামী পাঁচ বছরে ড্রোন-বিধ্বংসী সক্ষমতা বাড়াতে ৪ হাজার কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের উদাহরণ দেখিয়ে মার্ক রুত্ত বলেন, আধুনিক সমর কৌশলের চরিত্র মৌলিকভাবে বদলে যাচ্ছে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন প্রধান উপাদান হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
যুক্তরাজ্যও একই পথে এগোচ্ছে। জুনের শেষে প্রকাশিত প্রতিরক্ষা বিনিয়োগ পরিকল্পনার আওতায় সশস্ত্র বাহিনীকে শক্তিশালী করতে ও ড্রোনের রূপান্তরের লক্ষ্যে প্রায় ৬৭০ কোটি ডলার বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ব্রিটিশ সরকার।
এদিকে, জার্মানি ইউক্রেনের জন্য সহায়তা বাড়িয়েছে। প্রতিরক্ষা সফটওয়্যার নির্মাতার কোম্পানি ‘অটেরিয়ন’ ও ইউক্রেনীয় ড্রোন নির্মাতা ‘স্কাইফল’ ৫০ হাজার ড্রোনের বড় একটি ক্রয়াদেশ পেয়েছে, যার মূল্য প্রায় ৯ কোটি ইউরো। ইউরোপীয় ন্যাটো সদস্য দেশ হিসেবে জার্মানি এ বিপুল পরিমাণ ড্রোনের অর্ডার দিয়েছে বলে একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে। এই ড্রোনগুলোতে অটেরিয়নের বিশেষ স্বয়ংক্রিয় অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহৃত হবে।
অটেরিয়নের প্রধান নির্বাহী লরেঞ্জ মেয়ার বলেছেন, মানব ইতিহাসে ড্রোন প্রযুক্তি সহজলভ্য হওয়ার পর এটাই প্রথম যুদ্ধ, যেখানে সামরিক ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির প্রভাব এত বড়। মেয়ার বলেন, বর্তমান যুদ্ধক্ষেত্রের সমীকরণ সফটওয়্যারের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। অটেরিয়নের অপারেটিং সিস্টেমের কারণে শত্রুপক্ষের ‘ইলেকট্রনিক জ্যামিং’ বা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার মুখেও এই ড্রোনগুলি নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম হবে।
তিনি আরও বলেন, ‘শত্রুপক্ষের জ্যামার সক্রিয় থাকলেও, যেখানে ভিডিও সিগনাল হারিয়ে যেত এবং ড্রোনের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার আশঙ্কা থাকত, আমাদের প্রযুক্তির কারণে এখন জ্যামার থাকার পরেও ড্রোন সরাসরি লক্ষ্যবস্তুর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে।’ পাহাড় বা উপত্যকায় যেখানে রেডিও তরঙ্গ পৌঁছায় না, সেখানে এই সফটওয়্যারের মাধ্যমে ড্রোন নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। কোম্পানিটি এমন আধুনিক সফটওয়্যার তৈরি করছে, যা দিয়ে একজন অপারেটর আলাদা আলাদা ড্রোন নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে পুরো এক ঝাঁক ড্রোনের সমন্বিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবেন।
জার্মানির দেওয়া বড় অর্ডারটি ইউক্রেনীয় বাহিনীর জন্য হলেও, মেয়ার বলেছেন, এ অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রতি জার্মানি, নরওয়ে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের নিজস্ব সশস্ত্র বাহিনীও আগ্রহ দেখাচ্ছে। বর্তমানে যুদ্ধক্ষেত্রে শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে বিভ্রান্ত ও ধ্বংস করতে কম খরচের সাধারণ ড্রোনগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে উচ্চ প্রযুক্তির দামি অস্ত্রের সঙ্গে মিলিয়ে, যা আধুনিক যুদ্ধের ময়দানে ড্রোনকে আরও মারাত্মক এবং কার্যকর করে তুলছে।
ড্রোন মুক্ত যুদ্ধের কৌশলে প্রযুক্তির রাজত্ব। আধুনিক যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার ক্রমাগত ব্যবহার কেবল ড্রোন নির্মাতাদের ভাগ্য বদলাচ্ছে না, বরং এর পেছনে মূল প্রযুক্তির চাহিদা বহুগুণ বাড়িয়েছে। ‘মর্নিংস্টার’-এর বিশ্লেষক লোরেদানা মুহাররেমি বলেছেন, যুদ্ধক্ষেত্রে রিয়াল-টাইমে শত শত ড্রোনের মধ্যে সমন্বয় ঘটানোর জন্য এখন অত্যাধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা, ব্যাটল ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার, এআই, স্যাটেলাইটভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য, সেন্সর ও ইলেকট্রনিক ওয়ারফেয়ার সিস্টেম।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানকে সংলাপে ফেরার আহ্বান পাকিস্তানের
ফলস্বরূপ, স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তি, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, সেন্সর, ইলেকট্রনিক যুদ্ধকৌশল, সফটওয়্যার ও মহাকাশ প্রযুক্তির কাজে যুক্ত কোম্পানিগুলির জন্য ভবিষ্যতের প্রতিরক্ষা বাজেটের সিংহভাগ আসবে। ‘ম্যাককিনসে’র প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালের পর থেকে ইউরোপের মূল প্রতিরক্ষা ব্যয় দ্বিগুণ হয়েছে। ন্যাটো ২০৩৫ সালের মধ্যে প্রতিরক্ষা খাতে জিডিপির ৩ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে এবং ২০৩০ সালের মধ্যে ইউরোপের সামরিক বাজেট প্রায় ৮০ হাজার কোটি ইউরোতে পৌঁছাতে পারে, যা মহাদেশটির মোট জিডিপির প্রায় ২ দশমিক ৯ শতাংশ।
ইউরোপ ও আমেরিকার দু'প্রান্তে ২০২৫ সালে প্রতিরক্ষা প্রযুক্তিতে ভেঞ্চার ক্যাপিটাল বিনিয়োগ উল্কার গতিতে বেড়েছে। ম্যাককিনসে বলেছে, আগের বছরের তুলনায় এই খাতে বিনিয়োগের চুক্তির পরিমাণ দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে, বিশেষ করে ইউরোপে যেখানে ২০২১ সালের ২০ কোটি ইউরো থেকে ২০২৫ সালে ২৬০ কোটি ইউরোতে গিয়ে ঠেকেছে।
এ প্রসঙ্গে, জার্মানির মিউনিখভিত্তিক ‘হেলসিং’ উল্লেখযোগ্য সুবিধাভোগী। সম্প্রতি কোম্পানিটি নতুন তহবিল সংগ্রহের ঘোষণা দিয়েছে, যার মাধ্যমে তাদের বাজার মূল্য এক হাজার ৮০০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। ইউরোপের সবচেয়ে ধনী প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি স্টার্টআপগুলোর মধ্যে নিজেদের অবস্থান আরও শক্ত করল হেলসিং। ড্রোন ও পানির নিচের নজরদারি যুদ্ধাস্ত্র তৈরি করে কোম্পানিটি। একইসঙ্গে সামরিক খাতে পরিচালনার জন্য এআই ও স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার তৈরি করে।
এই অভাবনীয় উত্থান নির্দেশ করে যে, ইউরোপের প্রতিরক্ষা শিল্প এখন প্রচলিত ভারী সামরিক সরঞ্জাম বা হার্ডওয়্যারের তুলনায় সফটওয়্যার ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ওপরই তাদের কৌশল নির্ভর করছে।
সূত্র: সিএনবিসি, ডয়চে ভেলে
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন