প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
একসময় ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ছিল ব্রিটিশ আমলের অস্ত্র, সরঞ্জাম ও প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল। স্বাধীনতার প্রায় আট দশক পর, এখন ব্রিটিশ আমলের অস্ত্রনির্ভরতা কাটিয়ে দেশটি আকাশে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, স্থলসীমান্তে আধুনিক ট্যাংক ও রকেট, সমুদ্রে যুদ্ধজাহাজ ও সুপারসনিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশে যুদ্ধবিমান ও অত্যাধুনিক ড্রোন—সব কিছুতে বহুমাত্রিক সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছে নয়াদিল্লি। এভাবেই বিদেশি অস্ত্রের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশীয় প্রতিরক্ষা প্রযুক্তি বৃদ্ধি করছে ভারত।
স্বাধীনতার পর ভারতের সামরিক শক্তির ভিত্তি ছিল মূলত ব্রিটিশ আমলে পাওয়া অস্ত্র এবং সামরিক সরঞ্জাম। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। ১৯৫৮ সালে ডিফেন্স রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন বা ডিআরডিও প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ভারতের প্রতিরক্ষা গবেষণা বৃদ্ধি পায়। এরপর ধাপে ধাপে ক্ষেপণাস্ত্র, রাডার, যুদ্ধবিমান, যুদ্ধজাহাজ, সাঁজোয়া যান ও ড্রোন প্রযুক্তি উন্নয়নে জোর দেওয়া হয়। বর্তমানে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব প্রদান করা হচ্ছে দেশীয় প্রযুক্তি ও অস্ত্র উৎপাদনে। পাশাপাশি ডিআরডিওর গবেষণার পাশাপাশি প্রতিরক্ষা খাতে সরকারি বিনিয়োগ বর্ধিত করা হয়েছে। এর ফলে ভারতের সামরিক সক্ষমতা স্থল, আকাশ ও সমুদ্র—তিন ক্ষেত্রেই আধুনিক হয়েছে।
ভারত সামরিক শক্তি বাড়ানোর ক্ষেত্রেও আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন এনেছে। দেশটি নিজস্ব প্রযুক্তিতে সমৃদ্ধ আকাশ ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা তৈরি করেছে। ইতোমধ্যে মাঝারি পাল্লার ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এমআরএসএএমও যুক্ত হয়েছে ভারতের প্রতিরক্ষা সক্ষমতায়। এ ছাড়াও, ভারতের আকাশ প্রতিরক্ষায় রয়েছে রাশিয়ার তৈরি এস-৪০০, বারাক-৮, স্পাইডার ও কিউআরএসএএমের মতো বিভিন্ন ধরনের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। বলিষ্ঠ ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ঠেকানোর জন্য দেশীয় প্রযুক্তির উন্নয়নের উদ্যোগ নিচ্ছে ভারত। এর ফলে শত্রুপক্ষের যুদ্ধবিমান, ক্ষেপণাস্ত্র এবং আকাশপথের বিভিন্ন হুমকি মোকাবিলার জন্য একাধিক স্তরের প্রতিরক্ষা বলয় গড়ে তুলেছে ভারত।
ভারতের সামরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির আলোচনায় ব্রহ্মোস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত ও রাশিয়ায় যৌথ উদ্যোগে তৈরি এই সুপারসনিক ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র তিনটি প্ল্যাটফর্ম— স্থল, সমুদ্র ও আকাশ—থেকে ব্যবহারযোগ্য। ভারতের স্থল ও নৌ প্রতিরক্ষায় ব্রহ্মোসকে অপরিহার্য অস্ত্র হিসেবে দেখা হয়। উচ্চ গতির এই ক্ষেপণাস্ত্র যুক্ত হওয়ার ফলে ভারতের দূরপাল্লার নির্ভুল হামলার সক্ষমতা অনেক বেড়েছে। এছাড়াও, পৃথ্বী, অগ্নি ও আকাশের মতো ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির মাধ্যমে ভারত ধাপে ধাপে নিজস্ব ক্ষেপণাস্ত্র প্রযুক্তির ভিত্তি গড়ে তুলেছে।
ভারতের সেনাবাহিনীেও এসেছে ব্যাপক পরিবর্তন। প্রচলিত ট্যাঙ্ক ও কামাননির্ভর শক্তির পাশাপাশি বর্তমানে রকেট সিস্টেম, ক্ষেপণাস্ত্র, আধুনিক রাডার, ড্রোন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং ইলেকট্রনিক যুদ্ধ প্রযুক্তিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পিনাকা রকেট সিস্টেম, আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও ব্রহ্মোসের মতো অস্ত্র স্থলবাহিনীর আক্রমণ ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে। সীমান্ত এলাকায় নজরদারি এবং দ্রুত হামলার সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো হচ্ছে।
ভারতীয় নৌবাহিনীর সক্ষমতা বৃদ্ধিতেও যুদ্ধজাহাজে নতুন প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। যুদ্ধজাহাজগুলোতে বিমান ও জাহাজবিধ্বংসী হুমকি মোকাবিলার জন্য বিভিন্ন ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে। বারাক-৮ বা এলআর-এসএএম এবং ভিএল-এসআরএসএএমের মতো ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা ভারতীয় নৌবাহিনীর প্রতিরক্ষা শক্তি অনেক বাড়িয়েছে। সমুদ্রভিত্তিক নিরাপত্তা ও দূরবর্তী এলাকায় সামরিক উপস্থিতি জোরদার করার লক্ষ্যে ভারত নৌসক্ষমতা বৃদ্ধিতে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে।
আধুনিক যুদ্ধে ড্রোনের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে ভারতও এ খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি করেছে। দেশীয় প্রযুক্তিতে টাপাস, রুস্তম, আর্চার, ঘাতক ও সুইফটের মতো বিভিন্ন ধরনের ড্রোন উন্নয়নের কাজ চলছে। নজরদারি, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং ভবিষ্যতের যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের জন্য ড্রোন প্রযুক্তিকে ভারতের প্রতিরক্ষা পরিকল্পনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
ভারতের সামরিক শক্তি বৃদ্ধির পেছনে বিজ্ঞান ও গবেষণাকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ জায়গা দেওয়া হয়েছে। সাবেক রাষ্ট্রপতি ও বিজ্ঞানী এ পি জে আবদুল কালামের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সমন্বিত ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কর্মসূচি দেশটির প্রতিরক্ষা গবেষণায় নতুন ভিত্তি তৈরি করে। বর্তমানে রাডার, সেন্সর, কমান্ড অ্যান্ড কন্ট্রোল, ইলেকট্রনিক যুদ্ধ, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং হাইপারসনিক প্রযুক্তির মতো আধুনিক ক্ষেত্রে গবেষণার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
সব মিলিয়ে, একসময় বিদেশি ও পুরোনো অস্ত্রের ওপর নির্ভরশীল ভারত এখন ধীরে ধীরে নিজস্ব প্রযুক্তিনির্ভর সামরিক শক্তি গড়ে তুলেছে। আকাশ প্রতিরক্ষা থেকে ব্রহ্মোস ক্ষেপণাস্ত্র, স্থলবাহিনীর আধুনিকীকরণ থেকে নৌসক্ষমতা এবং ড্রোন যুদ্ধ—বহুমুখী এই প্রস্তুতিই ভারতের অবস্থানকে শক্তিশালী করছে।
সূত্র: এই সময়
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন