প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ার ঐতিহ্যবাহী ও একমাত্র নারী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নাছরীন নবী পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়-এর প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বণিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, যেগুলোর মধ্যে রয়েছে নিয়োগ বাণিজ্য, আর্থিক অনিয়ম, সরকারি সম্পদ আত্মসাৎ, কোচিং ও গাইড বই সিন্ডিকেট, প্রাইভেট বাণিজ্য এবং অ্যাকাডেমিক দুর্নীতি। দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চলায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম অসন্তোষ ও ক্ষোভ বিদ্যমান রয়েছে।
বিদ্যালয়টি ১৯৬৪ সালে প্রতিষ্ঠিত এবং বর্তমানে এখানে প্রায় দুই হাজার শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছে। শিক্ষক সংকটে থাকা এই প্রতিষ্ঠানে রয়েছে ১৯ জন এমপিওভুক্ত শিক্ষক ও ৮ জন অতিথি শিক্ষক। ২০১১ সালের জানুয়ারিতে প্রধান শিক্ষক হিসেবে দেবব্রত বণিক যোগদানের পর অভিযোগ আসে যে, তিনি প্রধান শিক্ষকের পদ লাভ করতে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতিকে ১৩ লাখ টাকা ঘুষ দেন।
জানা গেছে, ২০১৫ সালে স্কুল ও কলেজ শাখায় শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগে প্রায় ৩১ লাখ টাকা ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। আরও অভিযোগ আছে, বিদ্যালয়ের পুরোনো তিনতলা ভবন নির্মাণের জন্য এক দাতা সদস্যের দেওয়া প্রায় ১৭ লাখ টাকা বিদ্যালয়ের ব্যাংক হিসাবে জমা না করে আত্মসাৎ করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অডিট প্রতিবেদনে ২০১২ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়ের মধ্যে লক্ষাধিক টাকা আত্মসাৎ ও ২৪টি অনিয়মের তথ্য প্রকাশ ঘটে। এসব অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালের এপ্রিলে তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটি তাকে দুই বছরের জন্য সাময়িক বরখাস্ত করে এবং পরে বিশেষ শর্তে পুনর্বহাল করা হয়। অভিযোগ রয়েছে যে, সাবেক পৌর মেয়র ও তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি তাকজিল খলিফা কাজলকে ৮ লাখ টাকা দিয়ে তিনি পুনর্বহাল হন।
অভিযোগ অনুযায়ী, বিদ্যালয়ের সরকারি সিআরসি প্রকল্পের আওতায় দেওয়া ১৭টি ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ কম্পিউটারের কোনো হদিশ নেই। বর্তমানে শেখ রাসেল ডিজিটাল ল্যাবের কম্পিউটারের মাধ্যমে সীমিত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এছাড়া এ বছর এসএসসি ও দাখিল পরীক্ষাকেন্দ্রে দায়িত্ব পালনকারী চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের জন্য বরাদ্দ সরকারি সম্মানীর অর্থও পরিশোধ না করে আত্মসাৎ করার অভিযোগ ছাত্র-ছাত্রী এবং অভিভাবকদের মধ্যে উঠেছে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থীদের জন্য বাধ্যতামূলক তিন মাসের কোচিংয়ের নামে প্রায় ৩ লাখ ১৫ হাজার টাকা আদায় করা হচ্ছে; যদিও তেমন কার্যক্রম মাত্র এক মাসের জন্য পরিচালিত হয়। জানাগেছে, বাকি অর্থ বিদ্যালয়ের মূল হিসাবের বাইরে রেখে প্রধান শিক্ষক ও কিছু শিক্ষক ভাগাভাগি করে নিয়েছেন।
শিক্ষার্থীদের পরিচয়পত্র দেওয়ার জন্য জনপ্রতি ২৫০ টাকা করে আদায় করা হলেও অনেক শিক্ষার্থী পরিচয়পত্র পাচ্ছে না, এমন অভিযোগও রয়েছে। পৌর শহরের একটি লাইব্রেরির মাধ্যমে নির্দিষ্ট প্রকাশনীর বই কিনতে বাধ্য করার অভিযোগও আছে, যার বিনিময়ে সংশ্লিষ্ট প্রকাশনীর থেকে প্রাইভেট বইয়ের কমিশন হিসেবে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।
বিদ্যালয়ের সহকারী বাংলা শিক্ষিকা শিখা বণিক, যিনি প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বণিকের স্ত্রী, অভিযোগ রয়েছে যে তিনি নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত না থেকেও তার ক্লাস অন্য শিক্ষকের মাধ্যমে পরিচালনা করান। প্রধান শিক্ষক তার ঘনিষ্ঠ শিক্ষকদের নিয়ে শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবছর টেস্ট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস করা, নির্দিষ্ট শিক্ষকদের কাছে প্রাইভেট না পড়লে পরীক্ষায় ফেল করানোর ভয় দেখানো এবং শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ তৈরির অভিযোগও রয়েছে। ইংরেজি শিক্ষক মোখলেছুর রহমানের বিরুদ্ধে নিয়মিত ক্লাসে অনুপস্থিত থাকা এবং নিজের কোচিংয়ের শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরীক্ষার খাতা মূল্যায়ন ও ফলাফল তৈরির অভিযোগ উঠেছে।
অন্যদিকে গণিত শিক্ষক খোরশেদ আলমের বিরুদ্ধে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে প্রাইভেট বাণিজ্য পরিচালনা এবং প্রধান শিক্ষকের পক্ষে সিন্ডিকেটকে সক্রিয় রাখতে অন্য শিক্ষকদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক মো. মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, বিদ্যালয়ে শিক্ষকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্বের কারণে পাঠদান সঠিকভাবে হচ্ছে না। তার মেয়েসহ সকল শিক্ষার্থীর কাছ থেকে পরিচয়পত্রের জন্য টাকা আদায় করা হয়েছে, তবে ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও এ বিষয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
প্রধান শিক্ষক দেবব্রত বণিক জানিয়েছেন, "আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। বিদ্যালয়ের সব নিয়মনীতি অনুসরণ করেই কাজ করেছি।" সাবেক অভিভাবক সদস্য শামীম একবাল বলেছেন, "শিক্ষা বোর্ড, জেলা শিক্ষা অফিস ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে অভ্যন্তরীণ অভিযোগ দেওয়ার পরও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।" সাবেক গভর্নিং বডির সদস্য আশিকুর রহমান রানা বলেন, "এত অভিযোগ ও অনিয়মের পরও একজন প্রধান শিক্ষক কীভাবে বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করছেন, সেটি বিস্ময়কর।" উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. আবু তৌহিদ জানিয়েছেন, অভিযোগগুলো তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বর্তমান অ্যাডহক কমিটির সভাপতি শাহাদাত হোসেন লিটন বলেছেন, "আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি এবং বিদ্যালয়ের অনিয়মের বিষয় আমার নজরে এসেছে।" আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপসী রাবেয়া জানিয়েছেন, প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ পাওয়া গেছে এবং তাকে বিভিন্ন সময়ে সতর্কও করা হয়েছে। অভিযোগগুলো গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন