প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের কাছে আর মাত্র ১৪ দিনের তেল গচ্ছিত রয়েছে। এই দাবির ফলে বিশ্বজুড়ে একটি বিতর্ক শুরু হয়েছে।
দাবির সমর্থনে একটি সরল গাণিতিক হিসাব উপস্থাপন করা হচ্ছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে, দেশটির স্ট্র্যাটেজিক পেট্রোলিয়াম রিজার্ভে (এসপিআর) ২৮৬.৬ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল রয়েছে এবং তারা দৈনিক প্রায় ২০.৭ মিলিয়ন ব্যারেল ব্যবহার করে। এই দুই সংখ্যাকে ভাগ করলে ফলাফল আসে ‘১৪ দিন’!
যদিও এই দাবিটি সোজাসাপ্টা মনে হচ্ছে, প্রকৃতপক্ষে এই গাণিতিক হিসাব মারাত্মক ভুল এবং বিভ্রান্তিকর। তবে এই ভাইরাল দাবির আড়ালে যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি খাতের একটি সত্যিকার উদ্বেগের চিত্র চাপা পড়ে গেছে।
এই ভুল হিসাবটি মূলত দুটি ভিন্ন বিষয়কে গুলিয়ে ফেলেছে।
প্রথমত, এসপিআর কেবল সরকারের আপৎকালীন জরুরি মজুদ। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র প্রতিদিন যে ২০.৭ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ব্যবহার করে, তা পরিশোধিত জ্বালানি, যার মধ্যে পেট্রল, ডিজেল এবং জেট ফুয়েল অন্তর্ভুক্ত।
দ্বিতীয়ত, এই দাবির বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের নিয়মিত উৎপাদনকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করা হয়েছে। বিষয়টি এমনভাবে দাঁড়ায়, যেন একটি পরিবার প্রতিদিন বাজারে কতটুকু কেনাকাটা করছে বা রান্না করছে তা না গুনে, কেবল ঘরে মজুদ থাকা খাবার দেখে বলে দেওয়া হলো—‘তাদের খাবার শেষ হতে আর ১৪ দিন বাকি!’
বাস্তবতা হলো, যুক্তরাষ্ট্র কেবল জরুরি মজুদের ওপর নির্ভর করে চলে না।
মার্কিন এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের (ইআইএ) তথ্য অনুযায়ী, দেশটি দৈনিক গড়ে ১৩.৯ মিলিয়ন ব্যারেল অপরিশোধিত তেল নিজেই উৎপাদন করে। এছাড়া বাণিজ্যিক মজুদে প্রায় ৪২৪.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল গচ্ছিত রয়েছে। প্রতিদিন তাদের রিফাইনারিগুলোতে প্রায় ১৭.৫ মিলিয়ন ব্যারেল তেল শোধন করা হয় এবং এর বাইরে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ তেল আমদানি ও রপ্তানি অব্যাহত রয়েছে। অর্থাৎ আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র কোনোভাবেই তেলশূন্য হয়ে পড়ছে না।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের তেল হঠাৎ ফুরিয়ে না গেলেও আসল উদ্বেগ হলো, মার্কিন আপৎকালীন জ্বালানি সুরক্ষার ‘বীমা’ এখন স্মরণকালের সবচেয়ে কম।
১৯৭৩-৭৪ সালের আরব তেল অবরোধের ধাক্কা পর ১৯৭৫ সালে মার্কিন কংগ্রেস এসপিআর গঠন করে। মেক্সিকো উপসাগরের বিশাল ভূগর্ভস্থ টানেলে রাখা এই রিজার্ভের ধারণক্ষমতা প্রায় ৭১৪ মিলিয়ন ব্যারেল। ২০২০ সালে যেখানে দেশটির জরুরি মজুদ ছিল ৬৩৮ মিলিয়ন ব্যারেল, ২০২৬ সালের আগস্ট শেষে তা ১৯৮২ সালের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে এসে মাত্র ২৮৬.৬ মিলিয়ন ব্যারেলে ঠেকেছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনৈতিক সংকটের কারণে মূলত এই জরুরি তহবিল খালি হয়েছে। ২০২২ সালে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বাইডেন প্রশাসন এসপিআর থেকে রেকর্ড ১৮০ মিলিয়ন ব্যারেল তেল বাজারে ছাড়ে। এতে জ্বালানির দাম কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও জরুরি মজুদ বড় ধাক্কা খায়।
পরবর্তীতে ২০২৬ সালে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রধান রুট ‘হরমুজ প্রণালী’ অবরুদ্ধ হওয়ার পর আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ট্রাম্প প্রশাসন এসপিআর থেকে আরও ১৭২ মিলিয়ন ব্যারেল তেল ছাড়ার ঘোষণা দেয়। ফলে গত এপ্রিলে ৪১৩.৩ মিলিয়ন ব্যারেলে থাকা মজুদ মাত্র চার মাসের ব্যবধানে ১২৭ মিলিয়ন ব্যারেল কমে ২৮৬.৬ মিলিয়নে নেমে আসে।
আজ যদি নতুন কোনো আন্তর্জাতিক যুদ্ধ, সমুদ্র অবরোধ বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়, তবে ওয়াশিংটনের হাতে বাজার নিয়ন্ত্রণ করার মতো পর্যাপ্ত ‘রসদ’ বা ‘অস্ত্র’ অবশিষ্ট নেই।
জরুরি রিজার্ভ থেকে প্রতিদিন এভাবে তেল ছাড়া দীর্ঘ মেয়াদে সম্ভব নয়। আবার সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেলে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম হু-হু করে লাফিয়ে বাড়তে পারে। এ ছাড়া বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী গৃহীত এই তেল ভবিষ্যতে চড়া দামে কিনে আবার সরকারি গুদামে ভরতে হবে, যা মার্কিন অর্থনীতির জন্য নতুন চাপ তৈরি করবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন