প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দক্ষিণ এশিয়ার ভূ-রাজনীতি এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণ অতিক্রম করছে। একসময়ের একমেরুকেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থা দ্রুত বহুমেরুকেন্দ্রিক বাস্তবতার দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এই পরিবর্তনের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর, আর সেই কারণেই বাংলাদেশ আজ আর কেবল একটি ভৌগোলিক রাষ্ট্র নয়; বরং বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রবিন্দু।
দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে এমন একটি ধারণা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা হয়েছে যে, বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্ত প্রতিবেশী একটি বৃহৎ শক্তির নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সীমারেখার মধ্যেই আবদ্ধ থাকবে। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা সেই ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে। একটি স্বাধীন রাষ্ট্র তার নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেবে—এটাই আন্তর্জাতিক সম্পর্কের স্বীকৃত নীতি।
বাংলাদেশের বর্তমান পররাষ্ট্রনীতি সেই বাস্তবতাকেই নতুনভাবে তুলে ধরছে। চীনের সঙ্গে অর্থনৈতিক, অবকাঠামোগত, প্রযুক্তিগত ও কৌশলগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের উদ্যোগ হোক কিংবা অন্যান্য বৈশ্বিক শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে তোলার প্রচেষ্টা—এসবই বাংলাদেশের স্বাধীন কূটনৈতিক পরিসরকে আরও বিস্তৃত করার ইঙ্গিত বহন করে। এ ধরনের উদ্যোগকে কোনো একটি দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান হিসেবে নয়, বরং জাতীয় স্বার্থকেন্দ্রিক কৌশলগত বৈচিত্র্য হিসেবে দেখা অধিকতর বাস্তবসম্মত।
বাংলাদেশের এই পরিবর্তিত অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার প্রচলিত ক্ষমতার সমীকরণে নতুন প্রশ্ন তুলেছে। ভারতের নীতিনির্ধারণী মহল ও দেশটির গণমাধ্যমের একটি অংশে বাংলাদেশকে ঘিরে যে উদ্বেগ, সংশয়, গাত্রদাহ শুরু হয়েছে এবং ধারাবাহিক আলোচনা ও সমালোচনা ঝড় দেখা যাচ্ছে, তা এই পরিবর্তিত ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতারই প্রতিফলন- কারণ তারা দীর্ঘদিনের জমিদার কর্তৃক প্রজা শাসনের মত অধিকার হারিয়ে ফেলছে। কারণ, যে বাংলাদেশকে তারা দীর্ঘদিন অনেকেই নিজেদের প্রভাব বলয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে কল্পনা করত, সেই বাংলাদেশ এখন নিজের জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বহুমাত্রিক কূটনৈতিক পথ অনুসরণ করছে।
এখানেই নতুন বাস্তবতার সবচেয়ে বড় বার্তা নিহিত রয়েছে। সার্বভৌম রাষ্ট্রের সিদ্ধান্ত আর কারও অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকবে না। বাংলাদেশের উন্নয়ন, অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক সম্পদ, বিনিয়োগ, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা কিংবা বৈদেশিক সম্পর্ক—সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু হবে বাংলাদেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ।
বঙ্গোপসাগর আজ শুধু একটি সমুদ্র নয়; এটি আগামী কয়েক দশকের বৈশ্বিক অর্থনীতি, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যের অন্যতম কৌশলগত কেন্দ্র। ফলে এই অঞ্চলকে ঘিরে প্রতিযোগিতা আরও তীব্র হবে। কিন্তু সেই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ যদি বিচক্ষণ কূটনীতি, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি বজায় রাখতে পারে, তবে অন্যের কৌশলগত দাবার গুটিতে পরিণত না হয়ে নিজেই হবে একটি গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড়।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে একটি বিষয় এখন ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে—বাংলাদেশকে আগের ছকে ফেলে বিচার করার সময় শেষ। আধিপত্যের মানসিকতা দিয়ে প্রতিবেশীকে পরিচালনার যুগও দ্রুত ফুরিয়ে আসছে। সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা এবং সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ভিত্তিতেই ভবিষ্যতের সম্পর্ক গড়ে উঠবে। যে রাষ্ট্র এই বাস্তবতা যত দ্রুত উপলব্ধি করবে, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও সহযোগিতার জন্য তার অবস্থান ততই শক্তিশালী হবে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতির নির্মম সত্য হলো—স্থায়ী বন্ধু বা স্থায়ী প্রতিপক্ষ নয়, স্থায়ী হয় কেবল জাতীয় স্বার্থ। বাংলাদেশ যদি সেই নীতিতে অবিচল থাকে, তবে পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় শুধু দক্ষিণ এশিয়ার নয়, সমগ্র ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলের অন্যতম কৌশলগত শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করার সুযোগ তার সামনে উন্মুক্ত থাকবে। এরূপ বিচক্ষণ কূটনৈতিক ধারা অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ায ভূ রাজনৈতিকভাবে দ্রুতই কৌশলগত আঞ্চলিক শক্তিতে পরিণত হবে এমন কথা বলা মনে হয় অমূলক হবে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন