প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
"ভারী বৃষ্টি হচ্ছে, তোরা কেউ আজ বাইরে বেরোস না"— সন্তাদের এই কথাটুকু বলে মাত্র ১০ মিনিটের জন্য বাজারের উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়েছিলেন ৩৯ বছর বয়সী মঈনুদ্দিন ওয়াজিদ আলী শাহ। তিনি জানতেন, পাশের চার তলা অবৈধ ভবনটি বিপজ্জনকভাবে হেলে পড়েছে। তাই স্ত্রীকে বলেছিলেন, "আজকের রাতটা কোনোমতে কেটে যাক, কাল সকালে আমরা এই ঘর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যাব।"
কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস, মঈনুদ্দিনের পরিবার আর সেই আগামীকালের সকালটি দেখার সুযোগ পায়নি। তিনি ঘর থেকে বের হওয়ার ঠিক ১০ মিনিটের মাথায় হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে পাশের বহুতল ভবনটি। মুহূর্তের মধ্যে মঈনুদ্দিনের টিনের চালের ঘরটি পিষে দিয়ে কেড়ে নেয় তাঁর স্ত্রী, চার সন্তান এবং খেলতে আসা প্রতিবেশীর এক নিষ্পাপ শিশুর প্রাণ।
মুম্বাইয়ের মানখুর্দের জনতা নগর এলাকায় গত দু-বছর ধরে সপরিবারে ভাড়ায় থাকতেন উত্তরপ্রদেশের বস্তি জেলার বাসিন্দা মঈনুদ্দিন। পেশায় দিনমজুর মঈনুদ্দিনই ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। মুম্বাইয়ের সাম্প্রতিক প্রবল বর্ষণে যখন চারপাশের পরিস্থিতি বিপর্যস্ত, তখন সন্তানের সুরক্ষার কথা ভেবেই তিনি ঘর ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে যখন একে একে লাশগুলো বের করা হচ্ছিল, তখন নির্বাক দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া মঈনুদ্দিনের আর কিছু করার ছিল না। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় তিনি হারিয়েছেন স্ত্রী আখতার জাহান (৩৮), বড় মেয়ে কায়সার জাহা (১৪), বড় ছেলে জালালুদ্দিন (৯), মেজো ছেলে সিরাজুদ্দিন (৬) এবং মেজো মেয়ে ও পরিবারের সবচেয়ে ছোট সদস্য আনাবিয়া (৩)। বড় মেয়ে শিবাজি নগর মিউনিসিপ্যাল স্কুলের মেধাবী ছাত্রী ছিল।
‘‘আমি বাচ্চাদের ঘরে থাকতে বলেছিলাম। স্ত্রীকে বললাম ওদের জন্য কিছু রান্না করতে, আর আমি ঘরের কিছু জিনিসপত্র কিনতে বাইরে গেলাম। ১০ মিনিটও হয়নি আমি গিয়েছি, তার মধ্যেই সব শেষ হয়ে গেল।’’ হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে এইটুকুই বলতে পারলেন শোকে পাথর হয়ে যাওয়া এই বাবা।
এই দুর্ঘটনায় কেবল মঈনুদ্দিনের পরিবারই ধ্বংস হয়নি, পার্শ্ববর্তী আরেক পরিবারের স্বপ্নও ভাঙচুর হয়ে গেছে। মঈনুদ্দিনের সন্তানদের সাথে খেলতে এসেছিল প্রতিবেশীর ৬ বছর বয়সী কন্যাসন্তান আলিয়া আল্লাউদ্দিন শেখ।
মাত্র এক মাস আগে ভালো ভবিষ্যৎ এবং সন্তানদের পড়াশোনার আশায় উত্তরপ্রদেশের জৌনপুর থেকে মুম্বাইয়ে দাদুর বাড়িতে এসেছিল আলিয়ার পরিবার। আলিয়ার দাদু আফতার শেখ কান্নায় ভেঙে পড়ে বলেন, "আমার জামাই গ্রামে চাষবাস করত। এখানে এসে একটা ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে সুপারভাইজারের কাজ পায়। আলিয়াকে মাত্র কয়েকদিন আগেই স্কুলে ভরতি করেছিলাম। একই সময়ে আলিয়ার দেড় বছরের ছোট ভাই ইনফেকশনের কারণে ওয়াডিয়া হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আমার মেয়ে সেখানে একা ছেলেকে সামলাচ্ছে, আর এখানে তার কোল খালি হয়ে গেল। আমি নিজেকে কীভাবে সামলাব, ওদের কী সান্ত্বনা দেব বুঝতে পারছি না।"
মুম্বাইয়ের মেয়র ঋতু তাওড়ে এই ভবনটিকে "সম্পূর্ণ অবৈধ" বলে ঘোষণা করেছেন। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, রবিবার সকাল থেকেই ভবনটি একদিকে হেলে পড়ছিল এবং এর দেয়ালের টাইলস খসে পড়ছিল। ভবনের বাসিন্দারা বিপদ টের পেয়ে আগেই সেটি খালি করে দিলেও, পাশের নিচু টিনের ঘরে থাকা মঈনুদ্দিনের পরিবারকে সতর্ক করার বা নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কোনো সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়নি।
মুম্বাইয়ে গত দুই সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে যে ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে, তার মধ্যে এই একটি ঘটনাতেই প্রাণ হারিয়েছেন ৬ জন।
সোমবার বিকেলে রাজাওয়াড়ি হাসপাতালের মর্গের সামনে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। মঈনুদ্দিনের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা এসে পৌঁছালেও মঈনুদ্দিন তখন সোজা হয়ে দাঁড়ানোর ক্ষমতাও হারিয়ে ফেলেছেন। দুই পাশ থেকে স্বজনরা তাঁকে ধরে রেখেছিলেন।
স্ত্রীর কাফনে মোড়ানো লাশ আর চার সন্তানের নিথর দেহ যখন একটি অ্যাম্বুলেন্সে তুলে উত্তরপ্রদেশের পৈতৃক ভিটের উদ্দেশ্যে রওনা করা হচ্ছিল, তখন মঈনুদ্দিনের শূন্য দৃষ্টি যেন এক নির্মম সত্যকে বারবার চিৎকার করে বলছিল— একটি অবৈধ দেয়াল আর মাত্র ১০ মিনিটের ব্যবধান কীভাবে একটি মানুষের গোটা পৃথিবীটাকেই চিরতরে স্তব্ধ করে দিতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন