প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের পরিস্থিতি ক্রমাগত জটিল হয়ে উঠছে।
জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনায় ইরানের ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা এবং একই দিনে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ বিমান হামলার ফলে সংঘাতটি নতুন মাত্রা পেল। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আঞ্চলিক যুদ্ধের মাত্রা আরও বিস্তৃত করবে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, জর্ডানে অবস্থানরত তাদের বাহিনীর ওপর একটি ‘আকস্মিক’ ক্ষেপণাস্ত্র হামলা প্রতিহত করা হয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে, তারা ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে সমন্বিত সামরিক অভিযান চালিয়েছে।
তবে রিপোর্ট লেখার সময় পর্যন্ত, হামলার সময়ে কোনটি আগে ঘটেছে—ইরানের হামলা বা যুক্তরাষ্ট্র-সৌদির পাল্টা অভিযান, সে সম্পর্কে স্পষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি।
বুধবার ভোরে ইরানের আইআরজিসি এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, তারা জর্ডানে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলো লক্ষ্য করে একাধিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। সেন্টকম হামলার বিষয়টি নিশ্চিত করলেও কোন ঘাঁটি বা সামরিক স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানায়নি। এছাড়া জর্ডান সরকারও এ সম্পর্কে কোনও আনুষ্ঠানিক তথ্য প্রকাশ করেনি।
আইআরজিসির মতে, যুক্তরাষ্ট্রের ‘আগ্রাসী কর্মকাণ্ডের’ জবাব হিসেবে এই হামলা করা হয়েছে। অন্যদিকে সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল স্থাপনায় ড্রোন হামলার জবাবে তারা যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সমন্বয় করে ইরাকে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে।
সেন্টকমের দাবি, ইরানের নির্দেশে পরিচালিত এসব গোষ্ঠী গত ৭২ ঘণ্টায় অন্তত ৩০টি ড্রোন হামলা চালিয়েছে, যার লক্ষ্য ছিল মার্কিন সেনা ও সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামো। ইরাকের জনপ্রিয় মোবিলাইজেশন ফোর্সেস (পিএমএফ) দাবি করেছে, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের হামলায় তাদের অন্তত ২০ জন যোদ্ধা নিহত এবং ৩২ জন আহত হয়েছে। তারা জানিয়েছে, বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনেভেহ, বসরা, কিরকুক, কারবালা এবং দিয়ালা—এই সাতটি প্রদেশে তাদের অবস্থান লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়েছে। তবে তারা আহতদের সংখ্যা প্রাথমিকটাই বলেছে এবং মাঠপর্যায়ের পুরো মূল্যায়ন শেষে তা আরও বাড়তে পারে।
ঘটনার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলি আল-জাইদি জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদের জরুরি বৈঠক আহ্বান করেন।
ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি আরবের তেল স্থপনায় যা ড্রোন হামলা হয়েছে, সেটি ইরাকের ভূখণ্ড থেকে পরিচালিত হয়েছে এবং এর পিছনে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে ইসলামিক রেজিস্ট্যান্স ইন ইরাক নামের ইরান-সমর্থিত একটি গোষ্ঠী। তারা সৌদি আরবের অভিযোগকে 'সম্পূর্ণ মনগড়া' বলে উল্লেখ করে সতর্ক করে দিয়েছে যে, সৌদি আরব যদি কোনও ‘বোকামিপূর্ণ পদক্ষেপ’ নেয়, তবে তার কঠোর জবাব দেওয়া হবে।
এদিকে, ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবির মাধ্যমে এক প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেছেন, এসব হামলার জন্য ইরানকে দায়ী করা ‘মারাত্মক ভুল হিসাব’।
যুক্তরাজ্যভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক নিরাপত্তা গবেষক বুরজু ওজচেলিক বলেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র এবং উপসাগরীয় দেশগুলো একদিকে সামরিক চাপ বজায় রাখছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক উদ্যোগও অব্যাহত রেখেছে। তাঁর ভাষায়, ওমান সম্প্রতি হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে একটি প্রস্তাব ইরানের কাছে দিয়েছে, যা তেহরানের প্রতি একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক ছাড় হিসেবে দেখা যেতে পারে। একই সময়ে ওয়াশিংটনে সফর করেছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু। তিনি বলেন, “কূটনৈতিক আলোচনা চলছে, তবে সামরিক চাপও সমানভাবে বজায় রয়েছে।”
বিশ্লেষকদের মতে, ২৮ ফেব্রুয়ারি শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের যুদ্ধের পর থেকেই ইরান উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্য করে হামলার কৌশল অনুসরণ করছে। ২০২৬ সালের মার্কিন কংগ্রেশনাল রিসার্চ সার্ভিসের তথ্যানুযায়ী, জর্ডানে বর্তমানে প্রায় ৪ হাজার মার্কিন সেনা মোতায়েন রয়েছে। তাদের কিছু অংশ মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি, কিং ফয়সাল বিমানঘাঁটি এবং সিরিয়া-ইরাক সীমান্তসংলগ্ন টাওয়ার-২২ সামরিক লজিস্টিক ঘাঁটিতে অবস্থান করছে।
ওজচেলিকের মতে, জর্ডানে সর্বশেষ হামলা দেখাচ্ছে যে, ইরান এখনও প্রতিরোধ গড়ে তোলার প্রধান উপায় হিসেবে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগকে গুরুত্ব দিচ্ছে।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত ইতোমধ্যেই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ছে। ইয়েমেনে ইরান-সমর্থিত হুথিরা লোহিত সাগরে অবরোধ ঘোষণা করেছে এবং সৌদি পতাকাবাহী জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। একই সময়ে কাস্পিয়ান সাগরে ইরান-সংশ্লিষ্ট সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজে হামলার দাবি করেছে ইউক্রেন। এর ফলে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের মধ্যে নতুন সংযোগ তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও দেখা দিয়েছে।
জাতিসংঘে পাকিস্তানের স্থায়ী প্রতিনিধি আসিম ইফতিখার আহমেদ নিরাপত্তা পরিষদে দেওয়া বক্তব্যে মধ্যপ্রাচ্যের উত্তেজনা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তিনি ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে গত মাসে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রতিশ্রুতি রক্ষার আহ্বান জানিয়েছেন এবং সৌদি আরবকে বৃহত্তর যুদ্ধে জড়িয়ে ফেলার যেকোনও প্রচেষ্টার বিরোধিতা করেছেন। একই সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা, সার্বভৌমত্ব এবং ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রতি পাকিস্তানের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী প্রিন্স ফয়সাল বিন ফারহান কাতার, কুয়েত ও বাহরাইনের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে টেলিফোনে আলোচনা করে উত্তেজনা কমানোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার ওপর জোর দিয়েছেন। তারা হরমুজ প্রণালী ও বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে নিরাপদ নৌ চলাচল নিশ্চিত করার গুরুত্বও তুলে ধরেন।
এদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কায়া কালাস জানিয়েছেন, তিনি ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচির সাথে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেছেন। তার মতে, বর্তমান যুদ্ধবিরতির বিরতি কূটনৈতিক মধ্যস্থতাকারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ তৈরি করেছে, যা কাজে লাগাতে না পারলে পরিস্থিতি আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধে রূপ নিতে পারে।
বিশ্লেষক বুরজু ওজচেলিক মনে করেন, আপাতত সবচেয়ে সম্ভাব্য চিত্র হলো—ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে পাল্টাপাল্টি সামরিক হামলা চলতে থাকবে, পাশাপাশি উপসাগরীয় দেশগুলোর মধ্যস্থতায় কূটনৈতিক আলোচনা অব্যাহত থাকবে। তবে তিনি সতর্ক করে বলেন, সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো এই সংঘাত যদি দীর্ঘ সময় ধরে নিয়মিত সামরিক পাল্টাপাল্টি হামলার রূপ নেয়। বিশেষ করে ইরানের বিরুদ্ধে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরাসরি যৌথ সামরিক অভিযান শুরু হলে বা হুথিরা বাব আল-মান্দেব প্রণালীতে হামলা আরও বাড়ালে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ নতুন ও আরও ভয়াবহ পর্যায়ে পৌঁছে যেতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন