প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আইনশৃঙ্খলা ও মানবাধিকার পরিস্থিতির এক উদ্বেগজনক চিত্র সামনে এসেছে। সদ্যসমাপ্ত মে মাসে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা কিছুটা কমলেও মব জাস্টিস বা গণপিটুনি ভয়ংকর রূপ নিয়েছে। গত ৩১ দিনে ৬৬টি মব সহিংসতার ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩১ জন। একই সময়ে সীমান্ত হত্যা, শ্রমিক মৃত্যু, সাংবাদিক নির্যাতন এবং নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে রেকর্ড সংখ্যক।
শুক্রবার (৫ জুন) মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস) প্রকাশিত ‘মে-২০২৬’-এর মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এই শিউরে ওঠার মতো তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে দেশের ১৬টি জাতীয় গণমাধ্যমের সংবাদ, নিজস্ব সংগৃহীত তথ্য ও ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে এটি তৈরি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনের সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো মব সহিংসতা। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই, ধর্মীয় অবমাননা ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারের মতো ঠুনকো অভিযোগে মে মাসে ৬৬টি গণপিটুনির ঘটনা ঘটে। এতে ৩১ জন নির্মমভাবে নিহত এবং ৬৮ জন গুরুতর আহত হয়েছেন।
এদিকে, মে মাসে এপ্রিলের তুলনায় রাজনৈতিক সহিংসতা ও হতাহতের সংখ্যা কিছুটা কমেছে। এপ্রিলে যেখানে ৯৮টি ঘটনায় ৬ জন নিহত ও ৫৩৩ জন আহত হয়েছিলেন, সেখানে মে মাসে ৬৪টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় ৫ জন নিহত ও ২৮৯ জন আহত হয়েছেন। তবে সহিংসতার ধরন ছিল বেশ উগ্র। আধিপত্য বিস্তার, দলীয় কোন্দল ও চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে ঘটা এসব সংঘর্ষের অন্তত ৮টি ঘটনায় ১৩৪টি বাড়িঘর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও দলীয় কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট এবং অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।
দেশের সীমান্তগুলোতেও উদ্বেগজনক পরিস্থিতি বিরাজ করছে। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে মে মাসে ৬টি আলাদা ঘটনায় ৬ জন বাংলাদেশি নিহত ও ২০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর (বিএসএফ) হাতে আটক হয়েছেন ১৪ জন। অন্যদিকে, বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে প্রাণ হারিয়েছেন ৩ জন এবং আহত হয়েছেন ১ জন।
মে মাসে শ্রমিক অধিকার পরিস্থিতি ছিল বেশ নাজুক। ৫৭টি শ্রমিক নির্যাতনের ঘটনায় ২০ জন নিহত ও ১৩০ জন আহত হয়েছেন। এর বাইরে কর্মক্ষেত্রে ন্যূনতম নিরাপত্তা ও সুরক্ষা সরঞ্জামের অভাবে দুর্ঘটনায় আরও ৪১ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটেছে। এ ছাড়া এই এক মাসে দেশের কারাগারগুলোতে অন্তত ৭ জন বন্দির মৃত্যু ঘটেছে।
মে মাসে দেশে ৩০৫ জন নারী ও কন্যাশিশু ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৮৩ জন ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, যার মধ্যে ৫৭ জনই অবুঝ শিশু ও কিশোরী। গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ১৭ জন এবং যৌন নিপীড়নের শিকার হয়েছেন ৭৬ জন। পারিবারিক সহিংসতার কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ৬৩ জন নারী, আহত ৩১ জন এবং আত্মহত্যা করতে বাধ্য হয়েছেন ৪৫ জন। অন্যদিকে, আলাদাভাবে অন্তত ২১৫টি শিশু বিভিন্ন নির্যাতনের শিকার হয়েছে, যার মধ্যে ৫৬টি শিশুর অকাল মৃত্যু ঘটেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মে মাসে ৩৯টি ঘটনায় ৭৮ জন সাংবাদিক নির্যাতন, হয়রানি ও লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪২ জন আহত, ১৮ জন লাঞ্ছিত ও ৯ জন সরাসরি হুমকির মুখে পড়েছেন। একজন সাংবাদিককে আটক এবং দুটি মামলায় আট সাংবাদিককে আসামী করা হয়েছে। এ ছাড়া আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সরাসরি বা পরোক্ষ বাধায় ১০টি সভা-সমাবেশ পণ্ড হয়েছে, যেখানে ৪১ জন আহত হন। মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের অভিযোগে ১১টি ঘটনায় ৬ জনকে আটক ও ৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।
সার্বিক মূল্যায়নে এইচআরএসএসের নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম বলেন, ‘রাজনৈতিক সহিংসতা, গণপিটুনি, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, সাংবাদিক নির্যাতন, নারী ও শিশু নির্যাতন, সীমান্ত সহিংসতা এবং শ্রমিক নির্যাতনের এই ধারাবাহিকতা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতামত প্রকাশকে কেন্দ্র করে গ্রেফতার ও হয়রানি নতুন সংকট তৈরি করেছে।’ মানবাধিকার সুরক্ষায় তিনি সরকারকে আরও জবাবদিহিমূলক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখার এবং নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যমকে আরও সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানান।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন