প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
আসন্ন সফরে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে 'সম্মানজনক অভ্যর্থনা' দেওয়ার প্রতিশ্রুতি ভারত দিয়েছে। এতে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভারতের অবস্থানের একটি স্পষ্ট বার্তা পাওয়া যাচ্ছে।
ভারত বাংলাদেশ সম্পর্ক নতুনভাবে তৈরি করতে চায়, এটি স্পষ্ট। একই সময়ে, বাংলাদেশের বর্তমান নেতৃত্বের সঙ্গে গঠনমূলকভাবে কাজ করার জন্য ভারত আগ্রহী। তারেক রহমানের সম্ভাব্য এই সফরের মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে। সফরটি হলে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমানো, বাণিজ্য ও জ্বালানি সহযোগিতা বাড়ানো এবং গঙ্গার পানি বণ্টনসহ অমীমাংসিত বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।
ভারতের পক্ষ থেকে সফরটির জন্য ইতিবাচক বার্তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সফরের তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। বড় কোনো সমস্যা না হলে ভারতের ভেতরের সূত্রগুলো জানিয়েছে, আগস্টের শেষ সপ্তাহে তারেক রহমানের সফর হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারত উভয় পক্ষই তারেক রহমান ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মধ্যে সরাসরি বৈঠক আয়োজনের চেষ্টা করছে। নয়াদিল্লি চায়, সেপ্টেম্বরের ব্রিকস সম্মেলনের ফাঁকে বৈঠকের ওপর নির্ভর না করে আগস্টেই দুই নেতার একটি দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হোক। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের পাশাপাশি বাংলাদেশে কর্মরত কয়েকজন বিদেশি কূটনীতিক সফর নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা জানিয়েছেন।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সূত্রগুলো জানাচ্ছে, তারেক রহমানের ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা কম। বরং তিনি দ্বিপক্ষীয় সফরকেই নিয়মিত গুরুত্ব দিতে পারেন। এবং সফরটি সেপ্টেম্বরের দিকে পিছিয়ে গেলেও তিনি ভারত সফর করতে আগ্রহী থাকতে পারেন।
দুই দেশের কর্মকর্তারা মনে করছেন, দুই নেতার সরাসরি বৈঠক হলে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা কমানো সম্ভব। একই সঙ্গে, সম্পর্ককে আরো গঠনমূলক পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার পথও খুলবে।
তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে দুই দেশের ব্যবসায়ী মহলেও আশাবাদ দেখা গেছে। সম্প্রতি ভারতের শিল্প সংগঠন কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশ সফর করে। দুই দেশের ব্যবসায়ী নেতারা এই সফরটিকে সম্পর্কের মধ্যে দূরত্ব কমানোর একটি উদ্যোগ হিসেবে দেখছেন। প্রতিনিধিদলটি Bangladesh সরকারের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কয়েকটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক করে। এসব বৈঠকে অর্থমন্ত্রীও অংশ নেন। সেখানে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যবসায়ী মহল এবং ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশন প্রতিনিধিদলের সফর আয়োজন ও সমন্বয়ে ভূমিকা রাখে। ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনের একটি সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে এক ব্যবসায়ী নেতা সরকারের সঙ্গে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের পর ভারত সফরের বিষয়ে আশাবাদী। ১৮ আগস্ট ওই অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের ব্যবসায়ী নেতা এবং সফররত ভারতীয় প্রতিনিধিদলের সদস্যদের সম্মানে আয়োজন করা হয়। সেখানে ভারতীয় নেতা দীনেশ ত্রিবেদীও দুই নেতার বৈঠকের বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন।
তিনি বলেন, বহুপক্ষীয় বৈঠকে নেতাদের মধ্যে সরাসরি আলোচনা করার সুযোগ সীমিত থাকে। তবে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে আনুষ্ঠানিক অভ্যর্থনা, নৈশভোজ এবং দুই নেতার সরাসরি আলোচনার সুযোগ থাকে। এসব বৈঠকে ভবিষ্যতে কী কাজ করা হবে, তা ঠিক করা এবং যৌথ বিবৃতি দেওয়ার সুযোগও থাকে। ত্রিবেদী জানান, দুই দেশের সম্পর্ককে অতীতের বিরোধ থেকে বের করে নতুন অধ্যায়ে নিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অতীতে আটকে না থেকে দুই দেশের উচিত একটি নতুন ও ইতিবাচক অধ্যায় শুরু করা। তারেক রহমান দ্বিপাক্ষিক সফরে ভারত যাবেন কি না জানতে চাইলে ত্রিবেদী বলেন, এখনো কিছু চূড়ান্ত হয়নি। কিন্তু তিনি খুবই আশাবাদী যে সফরটি শিগগিরই হবে।
ভারতীয় এই নেতা সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্যে বলেন, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তাকে আশ্বস্ত করেছেন যে ভারত সফরের সময় তারেক রহমানকে 'সম্মানজনক অভ্যর্থনা' দেওয়া হবে। ত্রিবেদীর ভাষ্য অনুযায়ী, মোদি চান তারেক রহমানের সফরটি স্মরণীয় হোক। দুই নেতার মধ্যকার সরাসরি ও নিয়মিত যোগাযোগ বাড়লে শেষ পর্যন্ত দুই দেশের সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীরা উপকৃত হবেন। তার মতে, দুই দেশের মধ্যে দূরত্ব কমাতে ব্যবসায়ীদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
কিন্তু তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এখন পর্যন্ত সফরটি নিয়ে প্রকাশ্যে কোনো অবস্থান নেই। তবে জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম সফরের বিষয়ে সতর্ক করেছেন। ১৪ আগস্ট ঢাকার যাত্রাবাড়ীতে দলের এক সমাবেশে তিনি বলেন, ভারত শেখ হাসিনা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের মামলার অভিযুক্ত ওসমান হাদীসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাংলাদেশে ফেরত না দেওয়া পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর করা উচিত নয়।
নাহিদ ইসলামের অভিযোগ, ভারতের সাথে কোনো ধরনের সমঝোতা করে তারেক রহমান যদি দেশটি সফর করেন, তাহলে বিএনপির জাতীয়তাবাদী রাজনীতির অবস্থান নিয়ে মানুষের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হবে। তিনি আরো অভিযোগ করেন, দিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, গণতন্ত্র ও বিচারব্যবস্থার ওপর আঘাত করেছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ সরকার শুধু বিবৃতি দিয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন। নাহিদ বলেন, জুলাই হত্যাকাণ্ডের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত জনগণ তারেক রহমানের ভারত সফর মেনে নেবে না।
বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র একেএম শহীদুল করিম জানান, তারেক রহমানের ভারত সফরের জন্য বাংলাদেশ একটি 'অনুকূল পরিবেশ' চাচ্ছে। তিনি জানান, তারেক রহমানের দ্বিপক্ষীয় সফরের সম্ভাবনা নিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে বাংলাদেশ ও ভারতের কর্মকর্তাদের মধ্যে যোগাযোগ চলছে। এর আগে দুই দেশের সম্পর্কের অবনতি হয় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দিল্লিতে সংবাদ সম্মেলন করার পর। এরপর থেকেই ঢাকা-নয়াদিল্লি সম্পর্কে রাজনৈতিক টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে।
তবে সম্পর্কের এই টানাপোড়েনের মধ্যেও বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী। বিশেষভাবে গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি নবায়নের বিষয়টি বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, চুক্তিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসায় ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বৃদ্ধি করতে হবে। বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। এর মধ্যে গঙ্গার পানি বণ্টন একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তির আওতায় রয়েছে।
১৯৯৬ সালে দুই দেশ গঙ্গার পানি বণ্টন নিয়ে চুক্তি করে। এখন সেই চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় ঘনিয়ে আসছে। চুক্তিটি নবায়ন বা নতুন করে আরও কার্যকর করা হলে দুই দেশই লাভবান হতে পারে। বাংলাদেশ এই ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে রাজনৈতিক আস্থা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে। বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের সভাপতি এবং যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের পর তৈরি হওয়া নতুন বাস্তবতার আলোকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ককে দেখতে হবে। তার মতে, এই সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত পারস্পরিক সম্মান, আস্থা, মর্যাদা এবং দুই দেশের সার্বভৌম সমতা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ভারতের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াতে প্রস্তুত। তবে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার জন্য নয়াদিল্লিকেও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে হবে।
হুমায়ুন কবির বলেন, বাংলাদেশের নতুন সরকার গঠনের পর দুই দেশের সম্পর্ক উন্নত হওয়ার আশা তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এখনো সম্পর্ক অনেকটা স্থবির। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড এবং বাংলাদেশি নাগরিকদের কথিত 'পুশ-ইন' নিয়েও বাংলাদেশে উদ্বেগ রয়েছে। এসব ঘটনা দুই দেশের মানুষের মধ্যে ভারতের প্রতি সংবেদনশীলতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। তার মতে, ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দেওয়ার জন্য তারেক রহমানকে ভারতের আমন্ত্রণ এবং এর আগে মোদির ভারত সফরের আমন্ত্রণ - দুটিই দেখায় যে ভারত সরাসরি যোগাযোগ বাড়াতে আগ্রহী। সম্প্রতি ভারতীয় হাইকমিশনারের সঙ্গে তারেক রহমানের বৈঠকও দুই দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগের আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
ভৌগোলিক অবস্থান, ইতিহাস এবং পারস্পরিক নির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ ও ভারত গভীরভাবে পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত। তাই দুই দেশের সম্পর্কের দীর্ঘদিনের টানাপোড়েনের সমাধান বাংলাদেশ এবং ভারতের জন্য একযোগে গুরুত্বপূর্ণ। তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিক সফরই নয়, বরং এটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। দুই নেতার বৈঠকে পানি বণ্টন, বাণিজ্য, জ্বালানি, সীমান্ত, নিরাপত্তা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হতে পারে।এ ছাড়া দুই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ বাড়লে সাম্প্রতিক উত্তেজনা কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। হুমায়ুন কবিরের মতে, বাংলাদেশকে ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্রসহ বড় দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে হলে দেশের ভেতরেও রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও সামাজিক ঐক্য প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ প্রথম’ নীতির অর্থ হলো দেশের রাজনৈতিক নেতা, সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষাবিদ, বুদ্ধিজীবী ও গণমাধ্যমকে একটি সমন্বিত জাতীয় অবস্থান থেকে কাজ করা। দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘদিনের উত্তেজনা কোনো পক্ষের জন্যই লাভজনক নয়। তাই পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও সার্বভৌম সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ককে নতুন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন