প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গাছের সবুজ পাতার আড়াল থেকে এখন ঝুড়ি বা ক্যারেটে করে পাইকারি বাজারে রসালো আম আসা শুরু করেছে। মধুমাসের চিরায়ত রূপে, গুটি আমের প্রাথমিক কেনাবেচার পরে বাজারে রাজত্ব শুরু করেছে গোপালভোগ, ক্ষিরসাপাত, ল্যাংড়া ও লখনার মতো জনপ্রিয় সব জাত।
সুমিষ্ট ঘ্রাণ এবং স্বাদের কারণে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পাইকাররা আমের হাটে ছুটে আসছেন। তবে ঈদের পর ক্রেতাদের সমাগম কিছুটা কমে যাওয়ায় আম ব্যবসায়ী ও বাগান মালিকদের আশানুরূপ দাম না পাওয়ার বিষয়ে আক্ষেপ রয়েছে।
রাজশাহীর পুঠিয়া উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বানেশ্বর হাটে এমন চিত্র দেখা যায়। এই হাটে প্রায় অর্ধশত আড়ত রয়েছে এবং যেখানে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত চলে আমের জমজমাট বেচাকেনা।
বাগান মালিক আনোয়ার হোসেন জানান, তিনি দশ বছর ধরে আমের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত আছেন। তার বাগানে ২২০টি আম গাছ রয়েছে। খরার কারণে গুটি ঝরে গেলেও নিয়মিত সেচ দেয়ায় পর্যাপ্ত পরিমাণ আম পেয়েছেন। তবে গোপালভোগ ও ক্ষিরসাপাত আমের কিছুটা চাহিদা থাকলেও গুটি আমের চাহিদা একদমই নেই। তাই গুটি আম বিক্রি হচ্ছে মণপ্রতি ৮০০ থেকে ১ হাজার টাকায়।
আরেক ব্যবসায়ী মন্টু বলেন, ‘ঈদের ছুটির কারণে হাটে ক্রেতা এবং বাইরের ব্যাপারীর সংখ্যা অনেক কম। তাই লখনা আম বিক্রি হচ্ছে প্রতি মণ ৭০০ টাকায়।’
আম বাগানের মালিক শহিদুল ইসলামের কণ্ঠেও হতাশার সুর শোনা যায়। তিনি বলেন, ‘আমের বাজার ভালো নয়। সারা বছর পরিচর্যা করে যে খরচ হয়েছে, তা ওঠানোই কষ্টসাধ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতিটি গাছে কীটনাশক ও সেচ বাবদ খরচ হয়েছে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। দেড়শো গাছের বাগানটি তিন বছরের জন্য লিজ নিতে খরচ হয়েছে ৫ লাখ টাকা। গত দুই মৌসুমে যে আয় হয়েছে, তা বাগানের পেছনেই খরচ হয়ে গেছে। এবার কিছুটা আয়ের আশা করলেও দাম কম হওয়ায় খুব একটা লাভের মুখ দেখব না।’
বানেশ্বর বাজারের আড়তদার মনিরুল ইসলাম মানিক জানান, ‘মৌসুম শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ ট্রাক আম কিনে আড়তে রাখি। কিন্তু এবার বেচাকেনা অর্ধেকে নেমে এসেছে। চাহিদা কম থাকায় পাইকাররাও অর্ডার দিচ্ছেন কম, তাই আমের দামও কিছুটা কম।’
এদিকে, দাম সস্তা হওয়ায় খুশি হাটে আসা ক্রেতারা। হাটে আসা ক্রেতা প্রাঞ্জল ও কামরুল জানান, গত বছর আমের উৎপাদন কম হওয়ায় দাম বেশ চড়া ছিল। কিন্তু এ বছর দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকায় সাধারণ মানুষ আম কিনে খেতে পারছেন এবং পরিবারের পাশাপাশি আত্মীয়-স্বজনদেরও আম উপহার দেয়া সম্ভব হচ্ছে।
ক্রেতাদের তথ্যমতে, বানেশ্বর হাটে গোপালভোগ প্রতি মণ বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ২০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকার মধ্যে। আর ক্ষিরসাপাত আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৮০০ থেকে ২ হাজার ২০০ টাকায়। গত মৌসুমে এসব আমের দাম মণপ্রতি প্রায় এক হাজার টাকা বেশি ছিল।
হাট ইজারাদার জাকির হোসেন রাসেল জানান, মৌসুম শুরু হওয়ায় প্রতি দিন এই হাটে গড়ে অর্ধকোটি টাকার আম কেনাবেচা হচ্ছে। পুরোদমে আম নামানো শুরু হলে প্রতিদিন প্রায় এক কোটি টাকার লেনদেন হবে।
আমকে কেন্দ্র করে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৫০ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান গড়ে উঠেছে। এদের কেউ আম নামানোর কাজে, কেউ ক্যারেট বা ঝুড়ি সাজানোয়, আবার কেউ কুরিয়ার সার্ভিসে আম পৌঁছে দেয়ার কাজ করছেন। এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক চাকা সচল হয় আমের বাণিজ্যকে কেন্দ্র করেই। কুরিয়ার সার্ভিসের মাধ্যমে এসব আম চলে যাচ্ছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে।
রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক পাপিয়া রহমান মৌরী বলেন, ‘প্রশাসন ও কৃষি বিভাগের কঠোর নজরদারির কারণে শতভাগ নিরাপদ ও রাসায়নিকমুক্ত আম বাজারজাত করা সম্ভব হচ্ছে।’
রাজশাহী চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সিনিয়র সহ-সভাপতি শামসুর রহমান শান্তন বলেন, ‘আমের পাল্প থেকে আচার, জুস, আমসত্ত্ব বা চকোলেট তৈরির কারখানা গড়ে উঠলে আমের ন্যায্যমূল্য পেতেন বাগান মালিক এবং ব্যবসায়ীরা। এছাড়া আম কিছুদিন সংরক্ষণ করে বাজারে বিক্রি করতে পারলেও ভালো দাম পাওয়া যেত। ভবিষ্যতে আমভিত্তিক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠলে এবং আম রফতানি প্রক্রিয়া সহজ করা হলে আম চাষিরা বেশি লাভবান হবেন।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ১৯ হাজার ৬২ হেক্টর জমিতে ২ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন আম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই মৌসুমে শুধু রাজশাহীতেই প্রায় হাজার কোটি টাকার আমের বাণিজ্য হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন