প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
চিত্রনায়ক সালমান শাহের হত্যা মামলায় পুলিশের পক্ষ থেকে খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) দুপুরের সময় রাজধানীর বিমানবন্দর এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ, যা সিআইডি হিসেবে পরিচিত, সেখানে হস্তান্তর করা হয়েছে।
ডনের গ্রেপ্তারের খবর গণমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর সালমান শাহের মা নীলা চৌধুরী তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেন। তিনি ছেলে হত্যার সঙ্গে ডনের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ তুলেছেন এবং তাঁর গ্রেপ্তারে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন।
নীলা চৌধুরী মন্তব্য করেন, ‘সালমান আমার সন্তান। সে আমার বুকের মধ্যে আছে এবং থাকবে। তাকে হত্যা করা হয়েছে। সালমান হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত এই ডন ছিল। শুধু তা-ই নয়, সালমানের মৃত্যুর পর সে আমাকে নানা ভাবে অপমান করেছে এবং আমার ছেলের নামে অনেক মিথ্যা অপবাদ দিয়েছে। আজ সে গ্রেপ্তার হয়েছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘সব প্রমাণ একদিন সামনে আসবে।’
সালমান শাহর মা তার বক্তব্যে বলেন, ‘আল্লাহর কাছে আমি কৃতজ্ঞ এবং বর্তমান সরকারের প্রতি আমার আস্থা রয়েছে। সালমান হত্যার সাথে জড়িত সকলকে গ্রেপ্তার করা হোক। আমি আশা করি, একদিন আমি আমার সন্তান হত্যার সুবিচার পাব।’
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, জনপ্রিয় চিত্রনায়ক চৌধুরী মোহাম্মদ শাহরিয়ার ইমন, যিনি সালমান শাহ নামে পরিচিত, রাজধানীর নিউ ইস্কাটনের বাসায় মারা যান। তার মৃত্যুর ঘটনায় তার বাবা, প্রয়াত কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী অপমৃত্যুর মামলা করেন। পরে, ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই, সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে অভিযোগ করে মামলাটি হত্যা মামলায় রূপান্তরের আবেদন করেন। আদালত তার জন্য সিআইডিকে অপমৃত্যু ও হত্যার অভিযোগ একসঙ্গে তদন্তের নির্দেশ দেন।
১৯৯৭ সালের ৩ নভেম্বর সিআইডি আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেয়। সেখানে সালমান শাহর মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ২৫ নভেম্বর ঢাকার সিএমএম আদালত সেই প্রতিবেদন গ্রহণ করে। তবে সিআইডির প্রতিবেদন প্রত্যাখ্যান করে রিভিশন মামলা করেন সালমানের বাবা।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ মো. জান্নাতুল ফেরদৌস ইবনে হক বাদীপক্ষের রিভিশন মঞ্জুর করেন। একই সঙ্গে মামলাটি হত্যার মামলা হিসেবে গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এর পরদিন, ২১ অক্টোবর, রাজধানীর রমনা থানায় সালমান শাহর মামা মোহাম্মদ আলমগীর কুমকুম হত্যা মামলা করেন। এতে সালমান শাহের স্ত্রী সামিরা হকসহ ১১ জনকে আসামি বলা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে দণ্ডবিধির ৩০২ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে।
মামলার অন্যান্য আসামিরা হলেন শিল্পপতি ও সাবেক চলচ্চিত্র প্রযোজক আজিজ মোহাম্মদ ভাই, লতিফা হক লুঁচি, খলনায়ক ডন, ডেবিট, জাভেদ, ফারুক, মে-ফেয়ার বিউটি সেন্টারের রুবি, আব্দুস ছাত্তার, সাজু ও রিজভী আহমেদ ফরহাদ। মামলায় অজ্ঞাত পরিচয় আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে।
মামলার অভিযোগে মোহাম্মদ আলমগীর উল্লেখ করেন, ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর, নীলা চৌধুরী, তার স্বামী কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী এবং ছোট ছেলে শাহরান শাহ নিউ ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহের সঙ্গে দেখা করতে যান। সেখানে গিয়ে তারা জানতে পারেন, সালমান ঘুমাচ্ছেন।
কিছুক্ষণ পর প্রডাকশন ম্যানেজার সেলিম ফোন করে সালমানের কিছু হয়েছে বলে জানান। দ্রুত বাসায় ফিরে তারা সালমানকে শয়নকক্ষে নিথর অবস্থায় দেখতে পান। অভিযোগে বলা হয়েছে, তখন কয়েকজন নারী তার হাত-পায়ে তেল মালিশ করছিলেন এবং পাশের কক্ষে সামীরার আত্মীয় রুবি বসেছিলেন।
সালমানের মা হাসপাতালে নেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার পথে তার গলায় দড়ির দাগ এবং মুখমণ্ডল ও পায়ে নীলচে দাগ দেখা যায় বলে মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে হলি ফ্যামিলি হাসপাতাল হয়ে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক সালমান শাহকে মৃত ঘোষণা করেন।
মামলার অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, ছেলের মৃত্যুর আগেই ঘটানাটিকে হত্যা বলে সন্দেহ করেছিলেন সালমানের বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী। এ কারণে ১৯৯৭ সালের ২৪ জুলাই তিনি চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আবেদন করেন। তার মৃত্যুর পর সালমানের মামা মোহাম্মদ আলমগীর বোনের পক্ষ থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন।
এদিকে মামলার তদন্তের অংশ হিসেবে চলতি বছরের ২০ মে সালমান শাহের মরদেহ কবর থেকে উত্তোলনের অনুমতি চেয়ে আবেদন করেন তদন্ত কর্মকর্তা। হত্যার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের উপস্থিতিতে মরদেহ উত্তোলন, সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরি ও ময়নাতদন্তের আবেদন করা হয়। পরে ২৪ মে আদালত মরদেহ উত্তোলন ও ময়নাতদন্তের অনুমতি দেন। তবে বাদীপক্ষ ওই আদেশ বাতিল চেয়ে আবেদন করলে তা নথিভুক্ত করেন আদালত।
পরবর্তী সময়ে ২২ জুন দেহাবশেষ উত্তোলনের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সিলেটের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পিংকি সাহাকে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এ-সংক্রান্ত আদেশের অনুলিপিও আদালতে দাখিল করে নথিভুক্ত করা হয়েছে।
প্রায় তিন দশক পর সালমান শাহের মৃত্যুর ঘটনায় হত্যামামলা হিসাবে তদন্ত চলছে। সেক্ষেত্রে মামলার অন্যতম আসামি ডনের গ্রেপ্তারকে তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে গণ্য করা হচ্ছে। মামলায় তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ৩০ আগস্ট দিন ধার্য হয়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন