প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্র এবং ইরানের মধ্যে সংঘাত আবারও তীব্র আকার ধারণ করেছে। টানা পঞ্চম দিনের মতো মার্কিন বাহিনী ইরানের ওপর হামলা চালাচ্ছে, আর সেই হামলার প্রতিক্রিয়ায় ইরান উপসাগরীয় কয়েকটি দেশ এবং জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হেনেছে।
এই অবস্থায় গঠন করা হয়েছে যুদ্ধবিরতি ও আলোচনার সমঝোতা স্মারক, যা গত জুন মাসে স্বাক্ষরিত হয়। কিন্তু বর্তমানে এই সমঝোতা কার্যত ভেঙে পড়েছে। উভয় দেশই জানিয়েছে, ওই সমঝোতা আর কার্যকর নয়। তবে এদিকে ওয়াশিংটন ও তেহরান কূটনৈতিক আলোচনার দরজাও সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করেনি।
মধ্যস্থতাকারী দেশ পাকিস্তান দুই পক্ষকে মানসিক শান্তি ফিরিয়ে এনে হামলা বন্ধ করার এবং আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। বৃহস্পতিবার ইসলামাবাদে এক সংবাদ সম্মেলনে পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দ্রাবি দাবি করেছেন, “স্থায়ী শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির জন্য সংলাপ, কূটনীতি ও ধারাবাহিক সম্পৃক্ততার কোনো বিকল্প নেই।”
যদিও প্রকাশ্যে দুই দেশের নেতারা আপসের বিষয়ে অনাগ্রহী অবস্থান দেখাচ্ছেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা করেছেন যে ইরান শান্তিচুক্তির জন্য মরিয়া হলেও তিনি তেহরানের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না।
অন্যদিকে, ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ বলেছেন, “ইরান যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অস্তিত্বের লড়াইয়ে রয়েছে। তাই শান্তি চুক্তি মেনে চলার আর কোনো কারণ নেই।”
এখন প্রশ্ন উঠেছে, দীর্ঘস্থায়ী এই সংঘাত চালিয়ে যাওয়ার সামর্থ্য আদৌ কার বেশি?
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, ইরান একটি দীর্ঘ সময় ধরে কঠোর মার্কিন নিষেধাজ্ঞার চাপের মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক যুদ্ধ দেশটির অর্থনীতি এবং সামরিক সক্ষমতার ওপর নতুন করে বড় আঘাত হেনেছে।
বিশ্বের সবচেয়ে বেশি নিষেধাজ্ঞার সম্মুখীন থাকা দেশগুলোর মধ্যে ইরান অন্যতম। মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে এই দেশের তেল রফতানি, আন্তর্জাতিক আর্থিক ব্যবস্থায় প্রবেশ এবং বিদেশে থাকা সম্পদ ব্যবহারে দীর্ঘদিন ধরেই সীমাবদ্ধতা বিরাজ করছে।
ফলস্বরূপ ২০১২ সালের মাথাপিছু জিডিপি যেখানে প্রায় ৮ হাজার মার্কিন ডলার ছিল, তা ২০২৪ সালের মধ্যে নেমে এসেছে প্রায় ৫ হাজার ডলারে। একই সময়ে দৈনিক তেল রফতানি ২২ লাখ ব্যারেল থেকে কমে ২০২৫ সালে দাঁড়িয়েছে ১৫ লাখ ব্যারেলে।
গত জুনে যুদ্ধবিরতির সমঝোতা হওয়ার পরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সাময়িকভাবে নৌ অবরোধ প্রত্যাহার, ৬০ দিনের নিষেধাজ্ঞা শিথিল এবং ইরানের জব্দকৃত সম্পদ ছেড়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। এটির ইতিবাচক প্রভাবে ইরানি রিয়ালের মূল্য একদিনেই প্রায় ১৫ শতাংশ বেড়েছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে আবারও নিষেধাজ্ঞা পুনর্বহাল করায় ইরানের অর্থনীতি নতুন করে অবনতি ঘটেছে।
এছাড়া, যুদ্ধের প্রথম ধাপে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্রের মজুদের প্রায় ৩০ শতাংশ এবং ড্রোনের প্রায় ৬০ শতাংশ ব্যবহৃত বা ধ্বংস হয়ে গেছে বলে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের বিশ্লেষণ অনুযায়ী জানা গেছে।
অন্যদিকে আঞ্চলিক সম্পর্কেও চাপ সৃষ্টি হয়েছে। ইরানের পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় কয়েকটি দেশের ভূখণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ফলে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে তেহরানের সম্পর্ক আরও উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যে অন্তত ১৯টি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। এসব ঘাঁটি বাহরাইন, কাতার, কুয়েত, সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও জর্ডানসহ বিভিন্ন দেশে অবস্থিত।
ইরান দাবি করছে, তারা কেবল মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালাচ্ছে। তবে বাস্তবে কিছু হামলায় বেসামরিক হতাহতের ঘটনাও ঘটেছে। এই পরিস্থিতিতে উপসাগরীয় দেশগুলো যৌথভাবে সামরিক তথ্য আদান-প্রদান ও আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও জোরদার করছে।
জন্ম নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রেরও চাপ। যুদ্ধের দীর্ঘায়িত হওয়ায় তাদের বিভিন্ন দিক থেকে বাড়তি চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে। সাম্প্রতিক মার্কিন হামলার পর আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম প্রায় ১২ শতাংশ বেড়েছে। হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
যুদ্ধের আগে বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ হরমুজ প্রণালী দিয়ে পরিবাহিত হতো। ইরানের অবরোধের ফলে সেই সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়ে যাওয়ার কারণে জনসমর্থন কমছে। সাম্প্রতিক এক জরিপে দেখা গেছে, ৫৭ শতাংশ মার্কিন নাগরিক ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতিকে ভুল সিদ্ধান্ত বলে উল্লেখ করেছেন।
এদিকে, নভেম্বরে অনুষ্ঠিতব্য মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির জন্য এই যুদ্ধ বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। বিভিন্ন জরিপে ইতোমধ্যে ডেমোক্র্যাটদের সামান্য এগিয়ে থাকার ইঙ্গিত মিলছে।
যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুদ এখনও সংকটজনক পর্যায়ে না পৌঁছালেও সম্প্রতি তা দ্রুত কমছে। ইরানের বিরুদ্ধে ব্যবহৃত প্রায় সাত ধরনের অস্ত্রের মধ্যে অন্তত চারটির অর্ধেকের বেশি মজুদ প্রথম দফার যুদ্ধেই শেষ হয়ে গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ চলাকালে ইতোমধ্যে ১৪ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৪১৪ জন আহত হয়েছে বলে সেন্টার ফর আমেরিকান প্রগ্রেসের বিশ্লেষণে উল্লেখ করা হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক আলম সালেহের বিশ্লেষণের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, অর্থনৈতিক চাপ থাকলেও ইরান এই যুদ্ধকে অস্তিত্বের লড়াই হিসেবে দেখছে। তিনি বলেছেন, “প্রায় ৪৭ বছর ধরে নিষেধাজ্ঞার মধ্যেই ইরান টিকে আছে। তাই শুধু অর্থনৈতিক চাপ দিয়ে তাদের নতি স্বীকার করানো সহজ নয়।”
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, ইরান দুর্বলতার বার্তা দিতে চাইছে না। তাই তারা নিরাপত্তার নিশ্চয়তা ছাড়া নতুন কোনও চুক্তিতে আগ্রহী হবে না। এই পরিস্থিতিতে বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধ অব্যাহত থাকলে দুই পক্ষেরই ক্ষয়ক্ষতি বাড়বে, এবং কূটনৈতিক আলোচনা ফেরার চাপ উভয়ের ওপরও বাড়তে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন