প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
মোঃ আল হেলাল, নির্বাহী সম্পাদক:
উপ-সম্পাদকীয়: বাংলাদেশের অর্থনীতি বর্তমানে এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। একদিকে মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমেছে, রেমিট্যান্সে শক্তিশালী প্রবাহ এসেছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেড়েছে এবং রপ্তানিতে পুনরুদ্ধারের কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। অন্যদিকে জ্বালানি ব্যয়ের ঊর্ধ্বগতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বিনিয়োগের স্থবিরতা, মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অস্থিরতা অর্থনীতির সামনে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। ফলে বর্তমান পরিস্থিতিকে নিছক ‘সংকট’ কিংবা ‘সাফল্য’ কোনো একক শব্দে ব্যাখ্যা করা যথেষ্ট নয়।
সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, মূল্যস্ফীতির চাপ কিছুটা কমেছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে, আগস্টে সাধারণ মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে নেমে এসেছে, যা জুলাইয়ে ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। খাদ্য মূল্যস্ফীতিও কমে হয়েছে ৭ দশমিক ০২ শতাংশ। তবে একই সময়ে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি বেড়ে ৯ দশমিক ৩২ শতাংশ হয়েছে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা জরুরি-মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ পণ্যের দাম কমে যাওয়া নয়; বরং দাম বাড়ার গতি কিছুটা কমেছে। গত কয়েক বছরে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যে উচ্চ স্তরে উঠে গেছে, সেখান থেকে মানুষের প্রকৃত স্বস্তি আসতে হলে মূল্যস্ফীতি আরও দীর্ঘ সময় ধরে কমতে হবে এবং একই সঙ্গে আয় বৃদ্ধির গতি বাড়াতে হবে। আগস্টে জাতীয় মজুরি বৃদ্ধির হার ছিল ৮ দশমিক ০৫ শতাংশ, যা সামগ্রিক মূল্যস্ফীতির তুলনায় সামান্য কম। অর্থাৎ অনেক পরিবারের বাস্তব ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ এখনো রয়ে গেছে।
অর্থনীতির সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো প্রবাসী আয়। ২০২৬ সালের আগস্টে প্রবাসীরা দেশে প্রায় ২ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলার পাঠিয়েছেন, যা আগের বছরের একই মাসের তুলনায় ২২ দশমিক ৫০ শতাংশ বেশি। এর আগে জুলাইয়েও এসেছিল ২ দশমিক ৮৬ বিলিয়ন ডলার।
রেমিট্যান্সের এই শক্তিশালী প্রবাহ বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তি তৈরি করেছে এবং রিজার্ভ পুনর্গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে আগস্ট শেষে মোট বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ছিল প্রায় ৩৭ দশমিক ৩৫ বিলিয়ন ডলার; আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের BPM6 পদ্ধতিতে তা ছিল প্রায় ৩২ দশমিক ৪৪ বিলিয়ন ডলার।
তবে এই স্বস্তির মাঝেও বৈদেশিক খাত পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত নয়। বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা বাংলাদেশের আমদানি ব্যয় বাড়িয়ে দিতে পারে। ইতোমধ্যে ২১ সেপ্টেম্বর সরকার ডিজেলের দাম লিটারপ্রতি ১১৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১৩৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা করেছে। বিশ্ববাজারে জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয় বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও এর প্রভাব পরিবহন, কৃষি, শিল্প ও ভোক্তা পর্যায়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিশেষ করে জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব শুধু পাম্পে সীমাবদ্ধ থাকে না। পণ্য পরিবহন থেকে শুরু করে কৃষি উৎপাদন, কারখানার পরিচালন ব্যয়, বাজারজাতকরণ—সব ক্ষেত্রেই ব্যয় বাড়ে। শেষ পর্যন্ত এর একটি অংশ ভোক্তার ওপর গিয়ে পড়ে। তাই নতুন করে মূল্যস্ফীতির চাপ তৈরি না হয়, সে বিষয়ে নীতিনির্ধারকদের সতর্ক থাকতে হবে।
অর্থনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক রপ্তানি। চলতি অর্থবছরের জুলাই-আগস্টে বাংলাদেশের পণ্য রপ্তানি আয় ৫ দশমিক ৪৩ শতাংশ বেড়ে ৯ দশমিক ১৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। তৈরি পোশাকের পাশাপাশি পাট, ওষুধ, চামড়া, প্রকৌশল পণ্য ও জুতাসহ কয়েকটি খাতেও প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে।
তবে রপ্তানির এই ইতিবাচক প্রবণতাকে টেকসই করতে হলে শুধু পোশাকনির্ভরতা কমিয়ে পণ্য ও বাজার বহুমুখীকরণে আরও জোর দিতে হবে। বিশ্ববাজারে প্রতিযোগিতা বাড়ছে। জ্বালানি, শ্রম, পরিবহন ও অর্থায়ন ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে উৎপাদনশীলতা বাড়াতে না পারলে রপ্তানি খাতের ওপর চাপ বাড়বে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গাগুলোর একটি ব্যাংকিং খাত। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) সাম্প্রতিক মূল্যায়নে বাংলাদেশের আর্থিক খাতের চাপ, রাজস্ব ঘাটতি ও মূল্যস্ফীতির চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠন, রাজস্ব আহরণ বাড়ানো এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হয়েছে। আইএমএফের হিসাবে, প্রয়োজনীয় সংস্কার দ্রুত বাস্তবায়িত না হলে প্রবৃদ্ধির ওপরও দীর্ঘমেয়াদি চাপ তৈরি হতে পারে।
এখানেই অর্থনীতির মূল প্রশ্নটি সামনে আসে শুধু বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বাড়ানো বা মূল্যস্ফীতি সামান্য কমানোই কি যথেষ্ট? উত্তর হলো, না। একটি টেকসই অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দক্ষ মানবসম্পদ, শক্তিশালী ব্যাংকিং ব্যবস্থা, কার্যকর রাজস্ব প্রশাসন এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক তথ্যেও অর্থনীতির মিশ্র চিত্র দেখা যায়। FY26-এ রপ্তানি প্রবৃদ্ধি ছিল মাত্র ০ দশমিক ১৭ শতাংশ, যেখানে আমদানি বেড়েছে ৫ দশমিক ৮৯ শতাংশ। একই সময়ে রেমিট্যান্স উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে এবং বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও শক্তিশালী হয়েছে।
অর্থাৎ অর্থনীতিতে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন সামষ্টিক স্থিতিশীলতার সঙ্গে বাস্তব অর্থনীতির পুনরুজ্জীবন। ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ না বাড়লে, শিল্পের উৎপাদন না বাড়লে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি না হলে কেবল মুদ্রা ও রিজার্ভের সূচকে উন্নতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনতে পারবে না।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের সামনে কয়েকটি বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া জরুরি। প্রথমত, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে সরবরাহব্যবস্থা ও প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, জ্বালানি ও আমদানি ব্যয়ের অভিঘাত যাতে অস্বাভাবিকভাবে ভোক্তার ওপর না পড়ে, সে জন্য লক্ষ্যভিত্তিক নীতি গ্রহণ করতে হবে। তৃতীয়ত, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম ও দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা মোকাবিলা করে আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। চতুর্থত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য অর্থায়নের সুযোগ বাড়াতে হবে। পঞ্চমত, রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর পাশাপাশি কর ব্যবস্থাকে আরও স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে হবে।
সর্বোপরি, অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলো মানুষের জীবনযাত্রা। একজন নিম্নআয়ের মানুষ বাজারে গিয়ে যদি আগের তুলনায় কম পণ্য কিনতে পারেন, একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যদি উচ্চ ব্যয়ের কারণে ব্যবসা সম্প্রসারণ করতে না পারে কিংবা একজন তরুণ যদি উপযুক্ত কর্মসংস্থান না পায়-তাহলে কাগজে-কলমে কিছু সূচকের উন্নতি সাধারণ মানুষের কাছে পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক স্বস্তি হিসেবে ধরা দেবে না।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখনো ঘুরে দাঁড়ানোর সক্ষমতা রাখে-রেমিট্যান্স, রিজার্ভ ও রপ্তানির সাম্প্রতিক কিছু ইতিবাচক তথ্য তার প্রমাণ। কিন্তু একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি ব্যয়, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের চ্যালেঞ্জও বাস্তব। তাই এখন প্রয়োজন আতঙ্ক নয়, আবার আত্মতুষ্টিও নয়; প্রয়োজন সঠিক তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত, জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংস্কারের ধারাবাহিকতা।
অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়—ব্যাংক, ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা, ভোক্তা, শ্রমিক এবং সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন। সামনের দিনগুলোতে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সাফল্য নির্ভর করবে আমরা সাময়িক স্বস্তিকে কতটা টেকসই পুনরুদ্ধারে রূপ দিতে পারি তার ওপর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন