প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন দেশের জনসংখ্যাকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের জন্যে সংশ্লিষ্ট সকলের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান এবং সুশাসন নিশ্চিতের মাধ্যমে।
তিনি বলেন, ‘গুণগত ও পরিকল্পিত জনসংখ্যা একটি দেশের প্রধান সম্পদ ও শক্তি। এটি দেশের উন্নয়নের ভিত্তি এবং সমৃদ্ধির চাবিকাঠি। অন্যদিকে, অপরিকল্পিত ও অদক্ষ জনসংখ্যা একটি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।’
রাষ্ট্রপতি আজ দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে বিশ্ব জনসংখ্যা দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার জনসংখ্যার আকারের উপর নির্ভর করে না, বরং জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনশীলতার ওপর নির্ভর করে।
তিনি আরও বলেন, ‘অদক্ষ ও বেকার জনসংখ্যা শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, আবাসন, শ্রমবাজার, পরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা এবং জনসেবার ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে, যা নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের জন্ম দেয়।’
এছাড়া তিনি ভারসাম্যপূর্ণ জনসংখ্যা নিশ্চিত করতে এবং এর গুণগত মান উন্নয়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করেন।
বাংলাদেশের জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে অগ্রযাত্রার কথা স্মরণ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এ যাত্রার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।
তিনি উল্লেখ করেন, ‘তিনি ১৯৭৬ সালে জাতীয় জনসংখ্যা পরিষদ গঠন ও ‘জনসংখ্যা নীতি’ প্রণয়ন করেন, যা তাঁর ঘোষিত ১৯ দফা সামাজিক-অর্থনৈতিক মুক্তি কর্মসূচির অন্যতম দফা ছিল ‘জনসংখ্যা বিস্ফোরণ রোধ।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, পরবর্তী সময়ে সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এই প্রক্রিয়াকে বিশেষ গুরুত্ব দেন জনমিতিক লভ্যাংশ অর্জনের লক্ষ্যে।
তিনি বলেন, ‘বেগম খালেদা জিয়া শিক্ষায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করেন, যার ফলে বাল্যবিবাহ কমে যায় এবং নারীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ ও পরিবার পরিকল্পনার প্রবণতা বৃদ্ধি পায়।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, বাংলাদেশের জনসংখ্যা বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ। আমাদের জনসংখ্যার চাপ সীমিত ভূমি, প্রাকৃতিক সম্পদ ও অবকাঠামোর তুলনায় অত্যন্ত বেশি। দ্রুত নগরায়ণ, জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব, পরিবেশগত ঝুঁকি, সীমিত বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত কর্মসংস্থানের অভাব নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে।
এমন বাস্তবতায় জনসংখ্যা ব্যবস্থাপনা শুধুমাত্র পরিবার পরিকল্পনা বা স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়, বরং এটি অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সুশাসন, সামাজিক স্থিতিশীলতা এবং টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মাণের অঙ্গীকার।
তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ এবং এই বিশাল কর্মক্ষম জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা। অর্থনীতির ভাষায় যা জনমিতিক লভ্যাংশ।
জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, সিঙ্গাপুর এবং চীনের মতো বহু দেশ এই সুযোগের যথাযথ ব্যবহার করে স্বল্প সময়ে অর্থনৈতিক উন্নয়নের উদাহরণ স্থাপন করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, এই সুযোগ সীমিত সময়ের জন্য। তাই আজকের তরুণদের আগামী দিনের দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে।
তিনি বলেন, ‘আমি আনন্দিত যে এ year's বিশ্ব জনসংখ্যা দিবসের প্রতিপাদ্য ‘তারুণ্যের আশা-আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করি, আজকের প্রত্যয়ে সুন্দর আগামী গড়ি’, যা আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকারের সঙ্গে গভীরভাবে মিল রেখে চলেছে।’
তিনি এ প্রতিপাদ্যকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার আহ্বান জানান।
রাষ্ট্রপতি বলেন, চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এই যুগে বিশ্ব অর্থনীতি ও শ্রমবাজার দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে তরুণদের বিভিন্ন দক্ষতায় সমৃদ্ধ করতে হবে। সৃজনশীলতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, নেতৃত্ব ও নৈতিকতা উন্নয়ন প্রয়োজন।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত এবং শ্রমবাজারের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় গড়ে তুলে এমন শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে, যা তরুণদের দেশীয় এবং বৈশ্বিক উভয় শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে সক্ষম করে।
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, প্রথমত, জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও মোট জনসংখ্যার বিশাল ভিত্তির কারণে প্রতিবছর উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিশু জন্মগ্রহণ করছে।
দ্বিতীয়ত, মোট প্রজনন হার গত দেড় দশক ধরে প্রায় দুই দশমিক তিন-এ স্থির রয়েছে। এই হারকে দুই এর কাছাকাছি নিয়ে আসা এবং তা ধরে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় চ্যালেঞ্জ।
তৃতীয়ত, অশিক্ষিত ও পশ্চাৎপদ পরিবারের জন্মহার তুলনামূলক বেশি। পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমকে নতুনভাবে ঢেলে সাজাতে হবে।
চতুর্থত, বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, বিয়ের গড় বয়স বৃদ্ধি এবং কিশোর-কিশোরীদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা আমাদের অন্যতম সামাজিক অগ্রাধিকার। এ বিষয়ে পরিবার, সমাজ এবং রাষ্ট্রকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, সরকার স্বাস্থ্যকে নাগরিকের মৌলিক অধিকার এবং জাতীয় উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে। ‘সবার জন্য স্বাস্থ্য’ এবং ‘চিকিৎসার অভাবে কোনো মৃত্যু নয়’ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম গ্রহণ করেছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুষ্টি, দক্ষতা উন্নয়ন এবং জনমিতিক লভ্যাংশের সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করে জনগণকে উৎপাদনশীল মানবসম্পদে রূপান্তরের ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকার রয়েছে। সরকারের উদ্যোগের পাশাপাশি বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং জনগণের অংশগ্রহণও অপরিহার্য।
রাষ্ট্রপতি বলেন, আমাদের সামনে চ্যালেঞ্জ রয়েছে, তবে সুযোগও আছে। আমি মনে করি, আজকের সঠিক সিদ্ধান্ত, সঠিক বিনিয়োগ এবং সঠিক পরিকল্পনাই আগামী দিনের সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনের ভিত্তি রচনা করবে। পরিকল্পিত পরিবার, মানসম্মত শিক্ষা, আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থান ও সুশাসন এই ছয়টি ভিত্তিকে সমান গুরুত্ব দিতে পারলেই জনসংখ্যা জাতীয় সম্পদে পরিণত হবে।
রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিয়ে সুস্থ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে সরকারের নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগের প্রশংসা করেন।
তিনি বলেন, ‘উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোতে ডায়ালাইসিস সুবিধা চালুর সরকারের সিদ্ধান্তকে আমি আন্তরিকভাবে স্বাগত জানাই।’
এর আগে রাষ্ট্রপতি স্বাস্থ্য খাতের তৃণমূল পর্যায়ে অবদান রাখা প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তিদের মধ্যে ক্রেস্ট ও সনদপত্র বিতরণ করেন।
স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত।
অনুষ্ঠানে সম্মানিত অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বাংলাদেশে জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের প্রতিনিধি ক্যাথরিন ব্রিন কামকং। স্বাগত বক্তব্য দেন পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. জিন্নাত রেহানা।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন