প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত এক বছর ধরে লিউকেমিয়ায় আক্রান্ত রয়েছেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসাইন শরিফ। চিকিৎসার খরচ মেটানোর জন্য তাঁর পরিবার জমি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছে। দুই মাস আগে তিনি বোনমেরু ট্রান্সপ্লান্ট করিয়েছেন, যার জন্য ব্যয় হয়েছে অন্তত ২০ লাখ টাকা।
সাজ্জাদের চিকিৎসার জন্য অর্থের একটি অংশ সংগ্রহ করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও বিভাগের সহযোগিতায়। তিনি এখনও পুরোপুরি সুস্থ না হওয়ায় কেমোথেরাপি ও অন্যান্য চিকিৎসা চালিয়ে যেতে হচ্ছে। এর ফলে প্রতি মাসে তাঁর পরিবারের ব্যয় হচ্ছে প্রায় ৮০ হাজার থেকে ৯০ হাজার টাকা।
আরেক শিক্ষার্থী তাসনিম হক অনন্যা একই অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছেন। সম্প্রতি ক্যানসারজনিত সমস্যার চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হলেও, এখনও প্রতিমাসে তার ওষুধের জন্য খরচ হচ্ছে প্রায় ৬০ হাজার টাকা। চিকিৎসার খরচ মেটাতে তাঁর বাবা জমি বিক্রি করেছেন। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে অর্থ সংগ্রহ করে তাঁর সহপাঠীরা সহযোগিতা করেছেন।
সাজ্জাদ ও তাসনিমের মতো গুরুতর অসুস্থ আরো অনেক শিক্ষার্থীকে চিকিৎসার খরচ মেটাতে সহপাঠীদের কাছ থেকে কিংবা ক্রাউড ফান্ডিং (গণ-অর্থায়ন)-এর মাধ্যমে সহযোগিতা নিতে হচ্ছে। কেউ বিশ্ববিদ্যালয় ও বিভাগভিত্তিক অর্থ সংগ্রহ করছেন, আবার কেউ আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে ধার-দেনা করে চিকিৎসা করাচ্ছেন। ফলে দীর্ঘমেয়াদি ও ব্যয়বহুল চিকিৎসা শিক্ষার্থীদের পরিবারের জন্য আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।
অথচ একই ধরনের অসুস্থতায় চিকিৎসা করাতে গিয়ে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার আর্থিক সহায়তা পাচ্ছেন। শিক্ষার্থীরা বলছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা করা হলে গুরুতর অসুস্থতায় চিকিৎসা ব্যয়ের একটি অংশ বিমার আওতায় আসতে পারে। এতে পরিবারের আর্থিক চাপ কমবে এবং চিকিৎসার জন্য সহপাঠীদের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহের ওপর নির্ভরতা কমবে।
জানা গেছে, প্রতিষ্ঠার দুই যুগ পরেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় (কুবি)-এর শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু হয়নি। দীর্ঘ ২০ বছরেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নেই নিয়মিত বা কাঠামোবদ্ধ আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা।
তবে শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমার ব্যবস্থা ইতিমধ্যে করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০২২ সালের ১০ নভেম্বর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও প্রগতি লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের মধ্যে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য সাময়িক জীবনবিমার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে।
গত বছরের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হায়দার আলীর উপস্থিতিতে উপাচার্যের কার্যালয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও জেনিথ ইসলামী লাইফ ইনস্যুরেন্স লিমিটেডের মধ্যে শিক্ষক এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য জীবন ও স্বাস্থ্যবিমার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। ওই সময় শিক্ষার্থীদের জন্য দ্রুত সময়ের মধ্যে সেমিস্টার প্রতি ১০০ টাকা প্রিমিয়ামে স্বাস্থ্যবিমা চালুর আশ্বাস দেওয়া হয়েছিল।
কিন্তু সেই আশ্বাসের প্রায় নয় মাস পেরিয়ে গেলেও শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর দৃশ্যমান কোনো কার্যক্রম দেখা যায়নি। লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী মানসুরা আফরিন বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা থাকা এখন সময়ের দাবি। সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী মধ্যবিত্ত এবং নিম্ন মধ্যবিত্ত ও দরিদ্র পরিবার থেকে আসা। হঠাৎ বড় ধরনের চিকিৎসার খরচ তাদের পরিবারের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে সাশ্রয়ী স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হলে শিক্ষার্থীরা আর্থিক ঝুঁকি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পেতে পারে।’
অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা
দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিমধ্যে শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালু করা হয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) ও জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি)-এ স্বাস্থ্যবিমার সুবিধা পাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাবিতে ভর্তির সময় এককালীন ২৭০ টাকা প্রিমিয়াম দিয়ে শিক্ষার্থীরা তালিকাভুক্ত বিভিন্ন হাসপাতালে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা নেওয়ার ক্ষেত্রে বছরে সর্বোচ্চ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত বিমা সুবিধা পান। কোনো শিক্ষার্থী চিকিৎসা চলাকালে মারা গেলে তার পরিবারের জন্য রয়েছে এককালীন এক লাখ টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজ নিজ বিভাগে ভর্তির সময় বছরে ২৫০ টাকা পরিশোধের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা স্বাস্থ্যবিমার আওতায় আসেন। বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত প্রত্যেক শিক্ষার্থীর জন্য এ বিমা বাধ্যতামূলক। অধ্যয়নরত অবস্থায় কোনো শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে অথবা ছাত্রত্ব শেষ হলে বিমার মেয়াদও শেষ হয়।
জাবিতে শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমার অন্তর্ভুক্ত হতে প্রতিবছর ৩৯০ টাকা প্রিমিয়াম দিতে হয়। বিমার আওতায় কোনো শিক্ষার্থী মারা গেলে এককালীন দুই লাখ টাকা পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। জীবিত অবস্থায় তালিকাভুক্ত হাসপাতালে চিকিৎসা নিলে বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ ২০ হাজার টাকা এবং হাসপাতালে ভর্তি না হয়ে চিকিৎসা নিলে বছরে সর্বোচ্চ ১০ হাজার টাকা পাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে।
ঢাবি, রাবি ও জাবির পর কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও শিক্ষার্থীদের জন্য স্বাস্থ্যবিমা চালুর দাবি জানাচ্ছেন শিক্ষার্থীরা।
শিক্ষার্থী মন্দিরা দাস বলেন, ‘ঢাবি, রাবি ও জাবির মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়েও স্বাস্থ্যবিমা থাকা দরকার। বিশেষ করে শিক্ষকদের এই ক্ষেত্রে বিবেচনা উচিত যে, তাদের শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে, শহরে এবং বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে চাঁদা তুলে চিকিৎসার খরচ চালায়। এই ক্ষেত্রে শিক্ষক ও প্রশাসনকে আরো আন্তরিক হওয়া উচিত।’
আবারও উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস
শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমা চালুর বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র পরামর্শক ও নির্দেশনা দপ্তরের পরিচালক ড. মোহাম্মদ জুলহাস উদ্দিন। তিনি বলেন, ‘আমরা এই ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে, তথ্য বিশ্লেষণ করে যদি উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হয় তাহলে নেব।’
উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আমজাদ হোসেন সরকার বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যবিমার ব্যাপারে একবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে ক্ষেত্রে ইনস্যুরেন্স কম্পানিগুলো কিছু জটিলতা দেখিয়েছে। আমরা আবার কথা বলব। কোনো কম্পানি আগ্রহ দেখালে আমরা তাদের সঙ্গে কাজ করব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন