প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
নীলফামারীর ডিমলা উপজেলার কালিগঞ্জ এলাকায় তিস্তা নদী তীর সংরক্ষণ প্রকল্প বর্তমানে নদীভাঙন রোধের চেয়ে অনিয়ম, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং বালু বিক্রির অভিযোগে বেশি সমালোচিত হচ্ছে। নদী রক্ষার উদ্দেশ্যে পরিচালিত সরকারি এই প্রকল্পকে কেন্দ্র করে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ এবং প্রশ্ন ক্রমবর্ধমান হয়ে উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে যে, প্রকল্পের আড়ালে তিস্তা নদীর তলদেশ থেকে শক্তিশালী ড্রেজার (বোমা মেশিন) ব্যবহার করে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন করে তা বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্রের তথ্য বলছে, জিও ব্যাগ ভরাটের প্রয়োজনীয়তার দাবি তুলে বিপুল পরিমাণ বালু তোলা হলেও প্রকল্পের চাহিদার অতিরিক্ত বালু বিক্রির মাধ্যমে একটি চক্র বিশাল অংকের অর্থ হাতিয়ে নিচ্ছে। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছে—নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প কি এখন বালু ব্যবসার বৈধ আড়ালে পরিণত হয়েছে?
এছাড়া অভিযোগ রয়েছে যে, রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মুম ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী মো. সাহিন হোসেনের নেতৃত্বে এসব কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে চলছে। স্থানীয় লোকজনের দাবি, প্রকাশ্যে বালুবাহী মাহিন্দ্র চলাচল করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না।
প্রকল্পের তথাকথিত ‘ইমার্জেন্সি পয়েন্ট’ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ডালিয়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী অমিতাভ চৌধুরী এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করলেও স্থানীয়রা দাবি করছেন, সেখানে কোনো জরুরি পরিস্থিতির বাস্তব চিত্র নেই। তাদের অভিযোগ, ‘ইমার্জেন্সি’ শব্দটিকে একটি ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে নিয়মছাড়া বালু উত্তোলন এবং প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী ঠিকাদার নিয়োগের পর প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কিন্তু মাঠ পর্যায়ে পাউবো কর্মকর্তাদের সরাসরি সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন আলোচনা চলছে। স্থানীয়রা প্রশ্ন তুলছেন, যদি সবকিছু নিয়মমাফিক হয়, তাহলে নদী থেকে সরাসরি বালু উত্তোলনের অনুমতি কোন কর্তৃপক্ষ দিয়েছে? ডিমলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. ইমরানুজ্জামান জানাচ্ছেন, “উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো অনুমোদন কিংবা সম্মতি দেওয়া হয়নি।”
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি আল আমিন বলেন, “সাংবাদিকের কাজ ভুল ধরা, ভুল ধরাই সাংবাদিকের কাজ।” তবে বালু উত্তোলন এবং বিক্রির অভিযোগের বিষয়ে তার পরিষ্কার কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। ঘটনাস্থলে উপস্থিত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের আরেক প্রতিনিধি মো. হাসানুল হক বলেন, “এ ধরনের কাজের অভিজ্ঞতা আমার অনেক। আগেও বহু প্রকল্পে কাজ করেছি। আপনারা আমাকে নিয়ম শেখাবেন না, অনিয়মই নিয়ম হয়।” জিও ব্যাগ স্থাপন করার আগে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন না করেই কাজ পরিচালনার অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট উত্তর দেননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্ধারিত কারিগরি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই তাড়াহুড়া করে জিও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। এতে প্রক project's স্থায়িত্ব এবং কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। পাশাপাশি ব্যবহৃত জিও ব্যাগের মান নিয়েও তাদের পক্ষ থেকে সন্দেহ প্রকাশ করা হয়েছে। তাদের বক্তব্য হল, নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করে এত টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নের পরিণতি নদীতীর রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে না।
ডিমলা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রওশন কবির জানিয়েছেন, “অভিযোগের বিষয়টি আমরা গুরুত্ব সহকারে দেখছি। বিষয়টি নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। তদন্তে কোনো অনিয়মের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
স্থানীয় সচেতন মহলের মত, অভিযোগগুলো সত্য হয়ে গেলে এটি শুধুমাত্র প্রকল্প বাস্তবায়নে অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের একটি বড় উদাহরণ হিসেবে গণ্য হবে। তারা অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন, অবৈধ বালু উত্তোলন বন্ধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি করেছেন। তাদের ভাষ্য, জনগণের করের টাকায় পরিচালিত উন্নয়ন প্রকল্পে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে তিস্তা নদী রক্ষার এই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত দুর্নীতি ও অনিয়মের আরেকটি নজির হিসাবেই ইতিহাসে স্থান পাবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন