প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বাগেরহাটের ঐতিহাসিক হযরত খান জাহান আলী (রহ.)-এর মাজারের দিঘি থেকে উদ্ধার করা শতবর্ষী জাতের মিঠাপানির কুমিরটি ১৯ দিন ধরে কোনো খাবার মুখে তোলেনি। গত ৩ জুন খুলনার বন্য প্রাণী উদ্ধার ও পুনর্বাসন কেন্দ্রে স্থানান্তরের পর মাছ, মাংস কিংবা জীবন্ত হাঁস দেওয়ার পরেও ৪৫ বছর বয়সী এই মাদী কুমিরটি কিছুই গ্রহণ করেনি।
৩ জুন বাগেরহাট জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বন বিভাগের একটি বিশেষ রেসকিউ টিম কুমিরটিকে দিঘি থেকে উদ্ধার করে। এরপর কুমিরটিকে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
দীর্ঘদিন অনাহারে থাকার কারণে প্রাণীটির স্বাস্থ্যগত ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বন বিভাগ জানিয়েছে, কুমিরটির শরীরে অতিরিক্ত চর্বি থাকায় আপাতত উদ্বেগের কোনো কারণ নেই। তবে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, খ cagesাবদ্ধ পরিবেশে থাকার কারণে এটি চরম মনস্তাত্ত্বিক চাপে রয়েছে।
গত ১ জুন, মাজারের দিঘিতে গোসল করতে নামা সাত বছর বয়সী এক শিশুকে টেনে নিয়ে যায় এই কুমিরটি, যার ফলে শিশুটির মৃত্যু ঘটে। এই ঘটনার পর স্থানীয় বাসিন্দা ও মাজারের দর্শনার্থীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ৩ জুন জেলা প্রশাসনের অনুরোধে বন বিভাগের একটি বিশেষ রেসকিউ টিম কুমিরটিকে উদ্ধার করে। তারপর সেটিকে খুলনার বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের নিবিড় তত্ত্বাবধানে রাখা হয়।
বর্তমানে পুনর্বাসন কেন্দ্রের একটি বিশেষ জোনে অ্যানিমেল কিপার ও ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ টিম নিয়মিতভাবে সেটির দেখভাল করছে। প্রতিদিন কুমিরটির জন্য পানি পরিবর্তন ও কৃত্রিম শাওয়ারের মাধ্যমে গোসলের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
খুলনা কার্যালয়ের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) নির্মল কুমার পাল ঘটনার বিস্তারিত জানিয়ে বলেছেন, 'সরীসৃপ জাতীয় প্রাণী হিসেবে কুমিরের মেটাবলিজম রেট (বিপাক প্রক্রিয়া) অত্যন্ত ধীর। ফলে এরা দীর্ঘ সময় না খেয়ে অনায়াসে বেঁচে থাকতে পারে। বিশেষ করে এই কুমিরটি মাজারের দিঘিতে থাকার সময় মানুষের দেওয়া অতিরিক্ত খাবার খেয়ে অত্যন্ত চর্বিবহুল ও স্থূল হয়ে পড়েছে। ৪-৫ শত কেজি ওজনের কুমিরটির শরীরে যে পরিমাণ ফ্যাট বা চর্বি জমা আছে, তাতে এটি এক থেকে দুই মাস অনায়াসে না খেয়ে থাকতে পারবে।'
তিনি আরও জানান, পুনর্বাসন কেন্দ্র থেকে কুমিরটিকে স্বাভাবিক করার জন্য ছোট-বড় মাছ, মুরগি এবং শিকারের অভ্যাস ফেরাতে জীবন্ত হাঁস দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কুমিরটি একবার একটি মুরগিকে ধরে কামড় দিয়ে আঘাত করলেও শেষ পর্যন্ত তা না খেয়ে মুখে উগড়ে দেয়।
শারীরিক গঠনে অতিরিক্ত চর্বি থাকায় কুমিরটি স্থলে মাত্র কয়েক কদম হাঁটার পর অলস হয়ে বসে পড়ে। তবে কৃত্রিম জলাধারের পানিতে এর চলাচলে কোনো সমস্যা হচ্ছে না। কর্মচারীরা লক্ষ্য করেছেন, কুমিরটির মধ্যে মুক্ত ও বড় পরিসরে বিচরণ করার একটি তীব্র প্রবণতা কাজ করছে; এটি প্রায়ই পানির বাইরে উঠে খাঁচার লোহার গেটে জোরে ধাক্কা দিচ্ছে, যা মূলত বন্দিদশা থেকে মুক্তির আকুলতা।

কুমিরটিকে সুন্দরবনের বিশাল অভয়ারণ্যে অবমুক্ত করা হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে বন বিভাগ জানিয়েছে, সুন্দরবনে এই কুমিরটি ছাড়ার বৈজ্ঞানিক সুযোগ নেই। সুন্দরবনের নদী ও খালের পানি লবণাক্ত এবং সেখানে মূলত লোনাপানির কুমির বাস করে। অন্যদিকে, উদ্ধার হওয়া কুমিরটি পুরোপুরি মিঠাপানির জাত। লোনাপানিতে ছাড়লে এটি অভিযোজন করতে না পেরে মারা যাবে।
ডিএফও নির্মল কুমার পাল বলেন, 'মাজার কর্তৃপক্ষ যদি কুমির এবং সেখানে আসা হাজারো ভক্ত-দর্শনার্থী উভয় পক্ষের শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারে, তবে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সেটিকে ফেরত দেওয়া হতে পারে। কারণ কুমিরটি দিঘির পাড় গলে মাঝেমধ্যেই লোকালয়ে বা রাস্তায় চলে যেত, যা মানুষ ও প্রাণী উভয়ের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ।'
তিনি বলেন, 'মাজার কর্তৃপক্ষ যদি নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর ব্যবস্থা না নেয়, তবে আমরা বিষয়টি সরকারের পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়কে লিখিতভাবে জানাব এবং পরবর্তী স্থায়ী পুনর্বাসনের পদক্ষেপ নেব।'
প্রাথমিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রাণীটির আচরণ স্বাভাবিক করার জন্য আরও অন্তত এক মাস কুমিরটিকে খুলনার এই পুনর্বাসন কেন্দ্রেই রাখা হবে।
আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন) ২০০০ সালে বাংলাদেশের প্রাকৃতিকভাবে মুক্ত জলাশয় থেকে মিঠাপানির কুমিরকে আনুষ্ঠানিকভাবে 'বিলুপ্ত' ঘোষণা করেছিল। বাগেরহাটের এই মাজারের দিঘিটিই ছিল বাংলাদেশে মিঠাপানির কুমিরের শেষ ঐতিহাসিক আশ্রয়স্থল।
তবে গত ৫-৭ বছরে দেশের নদী অববাহিকার বাস্তুসংস্থানে কিছু পরিবর্তনের ফলে পাবনা, রাজশাহী, মাগুরা, ফরিদপুর এবং বরিশাল অঞ্চলের বিভিন্ন নদ-নদী থেকে বেশ কিছু মিঠাপানির কুমির উদ্ধার হয়েছে।
বন্যপ্রাণী বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি দেশের নদী ও জীববৈচিত্র্যের পুনরুজ্জীবনের একটি ইতিবাচক লক্ষণ। উদ্ধার হওয়া কুমিরগুলোর কিছু অংশ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্কসহ বিভিন্ন বিশেষায়িত কেন্দ্রে বংশবৃদ্ধির জন্য এবং কয়েকটিকে অনুকূল মিঠাপানির প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হয়েছে।
বাগেরহাটের এই কুমিরটির ভবিষ্যৎ এখন নির্ভর করছে মাজারের নিরাপত্তা অবকাঠামো এবং বন বিভাগের চূড়ান্ত নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন