প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যুক্তরাষ্ট্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কোম্পানি মেটার বিরুদ্ধে শিশু-কিশোরদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে আসক্ত করে তোলার অভিযোগে একটি বড় ধরনের আইনি লড়াই শুরু হয়েছে। মঙ্গলবার ক্যালিফোর্নিয়ার অকল্যান্ডে এ মামলার শুনানি শুরু হয়।
আগামী ছয় সপ্তাহ ধরে একটি জুরি দুই পক্ষের যুক্তি ও প্রমাণ শুনবে।
মামলায় যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি হচ্ছে, মেটা জানতো ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম শিশু-কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। এরপরও তরুণদের এসব প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখতে কোম্পানিটি বিভিন্ন ব্যবস্থা চালু রেখেছে।
মঙ্গলবার শুনানির শুরুতেই দুই পক্ষের আইনজীবীরা একে অপরের বক্তব্য ও তথ্যের বিরোধিতা করতে থাকেন। ক্যালিফোর্নিয়ার আইনজীবীরা জানান, মেটা জানতে পেরেছিল যে ১১ ও ১২ বছর বয়সী লাখ লাখ শিশু ইনস্টাগ্রাম ব্যবহার করছে। তবে কোম্পানিটি তাদের ব্যবহার ঠেকাতে যথেষ্ট ব্যবস্থা নেয়নি। তবে মেটার আইনজীবীরা এই দাবি অস্বীকার করেন।
তাদের ভাষ্যে, এমন বয়সী ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক লাখের কিছু বেশি ছিল। মেটার পক্ষ আরো দাবি করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে 'আসক্তি' বলে কোনো স্বীকৃত বিষয় নেই।
অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনজীবীরা বলেন, মেটা নিজেরাই জানত যে তাদের প্ল্যাটফর্ম কিশোরদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে। তবে মেটার আইনজীবীরা বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে অনেক কিশোরের ভালো অভিজ্ঞতা হয়েছে- এই বিষয়টি অঙ্গরাজ্যগুলো গুরুত্ব দিচ্ছে না। ২০২৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ২৯টি অঙ্গরাজ্য মেটার বিরুদ্ধে মামলা করে।
এসব অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ক্যালিফোর্নিয়া ও নিউইয়র্কও রয়েছে। ওই মামলার ভিত্তিতেই বর্তমান বিচার চলছে। অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, শিশুদের সুরক্ষা ও গোপনীয়তা–সংক্রান্ত কেন্দ্রীয় এবং অঙ্গরাজ্যের আইন মেটা বহুবার লঙ্ঘন করেছে। তারা মেটার কাছ থেকে শত শত কোটি ডলার ক্ষতিপূরণ চায়। পাশাপাশি ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার দাবিও করেছে অঙ্গরাজ্যগুলো। এর মধ্যে রয়েছে পোস্টে 'লাইক' সংখ্যা দেখানো বন্ধ করা এবং ব্যবহারকারীদের একের পর এক কনটেন্ট দেখানোর 'ইনফিনিট স্ক্রল' ব্যবস্থা বন্ধ করা।
মঙ্গলবার শুনানিতে মেটার অভ্যন্তরীণ গবেষণা ও নথি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। ক্যালিফোর্নিয়ার প্রধান আইনজীবীদের একজন মেগান ও’নিল অঙ্গরাজ্যগুলোর প্রাথমিক বক্তব্যে মেটার একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণা প্রতিবেদন তুলে ধরেন। ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রতি পাঁচজন কিশোরের মধ্যে একজন জানিয়েছে, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের ফলে তাদের আরো খারাপ লাগে। মেটার প্রধান আইনজীবীদের একজন পল শ্মিট এই তথ্যের অন্য দিক তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একই গবেষণায় ৪১ শতাংশ কিশোর জানিয়েছিল, ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের পর তাদের ভালো লাগে। আরও ৪১ শতাংশ বলেছিল, এতে তাদের ওপর কোনো প্রভাব পড়ে না। শ্মিট বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে মানুষ সমস্যায় পড়তে পারে- এটি মেটা অস্বীকার করছে না। তবে তিনি দাবি করেন, এটিকে 'আসক্তি' বলা ঠিক নয়।
শ্মিট বলেন, মেটা স্বীকার করে যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারের কারণে কিছু মানুষ সমস্যায় পড়তে পারে। এ সমস্যা কমাতে কোম্পানিটি বিভিন্ন ব্যবস্থাও নিয়েছে। তবে মেটার প্রধান নির্বাহী মার্ক জাকারবার্গ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রধান অ্যাডাম মোসেরির আগের বক্তব্যও তিনি তুলে ধরেন। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামকে মানুষকে আসক্ত করার জন্য তৈরি করা হয়নি। মেটার পক্ষ আরো দাবি করা হয়, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসক্তি সম্ভব- এমন ধারণার পক্ষে বৈজ্ঞানিক গবেষণায় এখনো যথেষ্ট প্রমাণ নেই। শ্মিট আরো বলেন, শিশুদের বয়স যাচাইয়ের ক্ষেত্রেও মেটার কিছু আইনি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার যুক্তি, যেসব গোপনীয়তা আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে মেটার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, সেসব আইনই অপ্রাপ্তবয়স্ক ব্যবহারকারীদের শনাক্ত করতে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
অন্যদিকে অঙ্গরাজ্যগুলোর আইনজীবী মেগান ও’নিল মেটার বিপুলসংখ্যক অভ্যন্তরীণ নথির ওপর জোর দেন। এসব নথির মধ্যে কোম্পানির অভ্যন্তরীণ গবেষণা, কর্মীদের ই-মেইল ও বিভিন্ন কথোপকথনের তথ্য অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কিছু নথিতে মার্ক জাকারবার্গের সঙ্গে সম্পর্কিত তথ্যও রয়েছে। ও’নিল জুরিদের সামনে একটি অভ্যন্তরীণ গবেষণার তথ্য তুলে ধরেন। সেখানে তরুণদের ইনস্টাগ্রাম ব্যবহারের বিষয়ে বলা হয়েছিল, কিশোরদের ব্যবহার নিয়ে দেওয়া বক্তব্য অনেকটা আসক্ত ব্যক্তির বক্তব্যের মতো। আরেকটি অভ্যন্তরীণ নথিতে মেটা বলেছিল, ব্যবহারকারীদের প্ল্যাটফর্মে বেশি সময় ধরে রাখার জন্য তৈরি কিছু সুবিধা তাদের ভালো থাকার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে। এসব সুবিধা মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ কাজে মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতাও কমিয়ে দিতে পারে। ও’নিলের অভিযোগ, মেটা এসব সম্ভাব্য ক্ষতির বিষয়ে জানতো। তারপরও তারা শিশু-কিশোরদের ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামের ব্যবহারকারী হিসেবে টার্গেট করেছে। একই সঙ্গে শিশুদের জন্য তাদের প্ল্যাটফর্ম নিরাপদ- এমন ধারণা তৈরি করতে জনসমক্ষে নানা বক্তব্য দিয়েছে।
ও’নিল বলেন, মেটার ব্যবসায়িক কৌশল ছিল ব্যবহারকারীদের আকৃষ্ট করা, যত বেশি সময় সম্ভব প্ল্যাটফর্মে ধরে রাখা এবং তাদের তথ্য সংগ্রহ করা। তার অভিযোগ, কোম্পানিটি এসব বিষয় সম্পর্কে জনসমক্ষে পুরো সত্য প্রকাশ করেনি। তিনি বলেন, পুরো বিচার চলার সময় মেটা প্রকাশ্যে যা বলেছে এবং তাদের অভ্যন্তরীণ গবেষণা ও নথিতে যা উঠে এসেছে, তার মধ্যে বড় পার্থক্য দেখা যাবে। ও’নিলের দাবি, মেটা সবসময় বলেছে ব্যবহারকারীদের নিরাপত্তাকে তারা মুনাফার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়। তবে অঙ্গরাজ্যগুলোর অভিযোগ, বাস্তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় বারবার মুনাফাকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে কোম্পানিটি। আগামী ছয় সপ্তাহের শুনানিতে দুই পক্ষ তাদের নথি, গবেষণা ও অন্যান্য প্রমাণ উপস্থাপন করবে। এরপর জুরি মেটার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোর বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন