প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিশ্বের বহু দেশে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় চীনের প্রতি বেশি ইতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পিউ রিসার্চ সেন্টারের নতুন এক বৈশ্বিক জরিপে এটি সামনে এসেছে।
এই প্রতিষ্ঠানটি ২০০২ সাল থেকে বিভিন্ন সময়ে জরিপ করছে এবং এবারই প্রথম এত বেশি দেশে চীনের প্রতি মানুষের ইতিবাচক মনোভাব যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে বেশী দেখা গেছে।
পিউ রিসার্চ সেন্টার জানিয়েছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা আজ ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি মানুষের ইতিবাচক ধারণা আগের তুলনায় আরও কমেছে। জরিপে আরও দেখানো হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি চিনপিং—দুজনের প্রতি মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে দারুণভাবে কমেছে।
তবে বেশিরভাগ দেশে ট্রাম্পের চেয়ে শি চিনপিংয়ে আস্থা প্রকাশ করেছেন, কিছুটা বেশি। এই গবেষণার জন্য চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে মে মাসের মধ্যে বিশ্বের ৩৬টি দেশের ৪২,০০০ এর বেশি মানুষের মতামত নেওয়া হয়। তাদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, তারা যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে খুব ইতিবাচক, কিছুটা ইতিবাচক, কিছুটা নেতিবাচক নাকি খুব নেতিবাচকভাবে দেখেন। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৩৬টি দেশের মধ্যে ২৫টিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শনকারী মানুষের সংখ্যা যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি।
মাত্র ছয়টি দেশে এখনো যুক্তরাষ্ট্রকে চীনের চেয়ে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে। দেশগুলো হল পোল্যান্ড, ফিলিপাইন, দক্ষিণ কোরিয়া, ভারত, জাপান ও ইসরায়েল। এগুলোর বেশিরভাগ যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র।
পিউ রিসার্চ সেন্টারের গবেষক জনাথন শুলম্যান বলেছেন, ২০০২ সাল থেকে তারা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বড় শক্তিধর দেশগুলো সম্পর্কে মানুষের মতামত সংগ্রহ করছেন। কিন্তু এবারে প্রথমবারের মতো এত বেশি দেশে চীনকে যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় বেশি ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছে।
তিনি জানান, অতীতের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয়তা কমেছে এবং বিশেষ করে ২০০৮ সালে জর্জ ডব্লিউ বুশ প্রশাসনের শেষ দিকে এবং ২০১৭ সালে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদের শুরুর দিকে এই প্রবণতা দেখা গিয়েছিল। তবে সে সময়ে চীনের ভাবমূর্তি সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সমান বা কিছুটা কম ছিল। এবারের জরিপে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব সবচেয়ে বেশি বেড়েছে স্পেন, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, গ্রিস এবং কানাডায়। এছাড়া ইতালি, স্পেন, কলম্বিয়া, মেক্সিকো, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, নাইজেরিয়া ও তুরস্কে চীন সম্পর্কে ইতিবাচক মতামত ইতিহাসের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। জরিপে দেখা গেছে, মধ্যম আয়ের দেশগুলোর মানুষ সাধারণভাবে চীনকে তুলনামূলকভাবে বেশি ইতিবাচকভাবে দেখে। অন্যদিকে ধনী দেশগুলোর চীন সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা তুলনামূলকভাবে বেশি।
এই প্রবণতার একটি ব্যতিক্রম সিঙ্গাপুর। মাথাপিছু আয়ের দিক থেকে জরিপে থাকা দেশগুলোর মধ্যে সিঙ্গাপুর শীর্ষে থাকলেও দেশটিতে চীনের প্রতি ইতিবাচক মনোভাব শক্তিশালী। জরিপে সবচেয়ে বেশি ইতিবাচক মত পাওয়া গেছে পাকিস্তান থেকে। সেখানে প্রায় ৯০ শতাংশ মানুষ চীনকে ইতিবাচকভাবে দেখছেন। অন্যদিকে সবচেয়ে কম ইতিবাচক মত পাওয়া গেছে জাপান থেকে। সেখানে মাত্র ১১ শতাংশ মানুষ চীন সম্পর্কে ইতিবাচক ধারণা প্রকাশ করেছেন।
জরিপে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিদের কাছে আরও জানতে চাওয়া হয়েছিল, বিশ্ব রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তারা ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং শি চিনপিংয়ের ওপর কতটা আস্থা রাখেন। ফলাফল থেকে দেখা যায়, দুই নেতার প্রতি আস্থার হার বেশিরভাগ দেশে ৫০ শতাংশের নিচে। তবে অনেক দেশে ট্রাম্পের তুলনায় শি চিনপিংয়ের প্রতি মানুষের আস্থা বেশি। শি চিনপিংয়ের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা দেখা গেছে পাকিস্তানে, যেখানে ৮৩ শতাংশ মানুষ তার ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন। বিপরীতে সবচেয়ে কম আস্থা দেখা গেছে জাপানে। সেখানে মাত্র ৭ শতাংশ মানুষ শির ওপর আস্থা রাখেন। অন্যদিকে, ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রতি সবচেয়ে বেশি আস্থা প্রকাশ করেছেন ফিলিপাইনের মানুষ। সেখানে তার প্রতি আস্থার হার ৬৮ শতাংশ। আর সবচেয়ে কম আস্থা দেখা গেছে পশ্চিম তীর ও পূর্ব জেরুজালেমে। সেখানে মাত্র ৪ শতাংশ মানুষ ট্রাম্পের ওপর আস্থা প্রকাশ করেছেন।
গবেষক জনাথন শুলম্যান বলেছেন, শি চিনপিংকে নিয়ে মানুষের মতামত সাধারণত খুব শক্ত অবস্থানের হয় না। কিন্তু ট্রাম্পের ক্ষেত্রে মানুষ অনেক বেশি স্পষ্ট এবং চরম অবস্থান থেকে মতামত দিয়েছেন।
জরিপে দেখা গেছে, এখনো বেশিরভাগ মানুষ মনে করেন, চীনের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজেদের নাগরিকদের ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে অনেক বেশি সম্মান করে। তবে আগের তুলনায় এই ব্যবধান কমে এসেছে। অন্যদিকে, পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে। মধ্যম আয়ের কয়েকটি দেশের করা অতিরিক্ত জরিপে ৭৫ শতাংশ মানুষ বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনেক বেশি হস্তক্ষেপ করে। একই প্রশ্নে চীনের ক্ষেত্রে এই মত দিয়েছেন ৪৫ শতাংশ মানুষ। সাম্প্রতিক কিছু বছরে অন্যান্য আন্তর্জাতিক গবেষণায়ও একই ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। জরিপকারী প্রতিষ্ঠান গ্যালাপ জানিয়েছে, গত বছর বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার দিক থেকে চীন প্রথমবার যুক্তরাষ্ট্রকে ছাড়িয়ে গেছে। গত দুই দশকে এটিই ছিল সবচেয়ে বড় ব্যবধান।
তবে এশিয়া সোসাইটির আরেকটি গবেষণায় বলা হয়েছে, করোনা মহামারির সময় চীনের যে ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, তা এখনও সীমিত পরিসরে উন্নতি করতে পেরেছে। কার্নেগি চায়নার গবেষক ড. চং জা ইয়ান বলেন, পিউর সর্বশেষ ফল তার কাছে অস্বাভাবিক মনে হয়নি। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতির ঘন ঘন পরিবর্তন, শক্তি প্রয়োগের প্রবণতা এবং এর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেক দেশকে উদ্বিগ্ন করে তুলেছে। যার ফলে অনেক দেশের মানুষ চীনকে তুলনামূলকভাবে বেশি স্থিতিশীল ও পূর্বানুমানযোগ্য অংশীদার হিসেবে দেখতে শুরু করেছেন। তিনি আরও বলেন, বিশেষ করে যে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে সম্পর্ক উন্নত করতে চীন দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছে, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে ড. চং মনে করে যে, এর প্রভাবও এখন দৃশ্যমান। যদিও ড. চং মনে করেন, চীনের প্রতি ইতিবাচক ধারণা বাড়ছে, তবে শি চিনপিংয়ের প্রতিও মানুষের আস্থা তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে। তার মতে, অনেক মানুষ চীনকে একটি স্থিতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে দেখেন। তবে একই সঙ্গে তারা শি চিনপিংকে একজন শক্তিশালী কর্তৃত্ববাদী নেতা হিসেবেও মনে করেন। তিনি আরও বলেন, শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে চীন আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আরো দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে এবং বিভিন্ন ইস্যুতে নিজেদের অবস্থান অন্য দেশগুলোর ওপরও জোর দিয়ে তুলে ধরছে। এ ছাড়া দেশটিতে সংখ্যালঘু অধিকার ও তাদের সঙ্গে আচরণ নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রশ্ন রয়েছে। তার মতে, অনেক মানুষ প্রযুক্তি ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির মতো ইতিবাচক বিষয়গুলো চীনের সাফল্য হিসেবে দেখেন। তবে কঠোর নীতি ও চাপ সৃষ্টি করা সিদ্ধান্তগুলোর জন্য ব্যক্তিগতভাবে শি চিনপিংকে দায়ী করেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন