প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) লোক প্রশাসন বিভাগের ২০২১-২২ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন রিনথী (২৩) এবং তার মা তাহমিনা বেগম (৫২) হত্যার ঘটনার ২৭২ দিন পেরিয়ে গেলেও প্রকৃত অর্থে হত্যাকাণ্ডের বিচার কার্যক্রম শুরু হয়নি।
এ ধরনের আলোচিত এবং জঘন্য এই জোড়া হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় যিনি গ্রেপ্তার হয়েছেন, সেই আসামি আদালতে নিজের দোষ স্বীকার করলেও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের বিলম্বের কারণে মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া প্রয়োজনীয় অগ্রগতির দিকে এগোচ্ছে না।
জানা গেছে, গত বছরের ৮ সেপ্টেম্বর কুমিল্লা নগরীর কালিয়াজুড়ি এলাকার একটি ভাড়া বাসায় সুমাইয়া আফরিন ও তার মা তাহমিনা বেগমকে হত্যা করা হয়েছিল। ঘটনার দিনই পুলিশের অভিযানে মোবারক হোসেনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন ৯ সেপ্টেম্বর রাতে কুমিল্লার ১ নম্বর আমলি আদালতে দেওয়া তার জবানবন্দিতে তিনি হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করেন। পরে আদালতের নির্দেশে তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে এবং দীর্ঘ সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও বিচার এখনো সম্পন্ন হয়নি।
মামলার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে নিহত পরিবারের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সোহেল হোসাইন জানান, “মামলাটির ধার্য তারিখ রয়েছে। আসামি জামিনের আবেদনও করেননি। তবে তদন্ত কর্মকর্তা চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা না দেওয়া পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম এগোবে না।”
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে মামলার তদন্ত কর্মকর্তা শরিফ ইবনে আলম জানান, তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। তারা চার্জশিট প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা দিয়েছেন এবং সাক্ষীদের স্মারকলিপিও দাখিল করেছেন। সেখান থেকে অনুমোদন পাওয়া গেলে চার্জশিট আদালতে পাঠানো হবে। চূড়ান্ত প্রতিবেদন (ফাইনাল রিপোর্ট) জমা দেওয়ার আগে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন এখন প্রয়োজন। তিনি উল্লেখ করেন যে, কয়েকদিনের মধ্যেই তারা প্রতিবেদন জমা দিতে সক্ষম হবেন।
তদন্তে এতদিন সময় লাগার কারণ জানতে চাইলে তিনি প্রতিবেদককে জবাবদিহি করতে বাধ্য কিনা জানতে চান এবং বলেন, “আমি কতদূর কাজ করেছি বা করিনি, তা আমার ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ জানেন। আমি তাদের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য। আপনার কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য কি না, সেটাই আগে বলুন।”
এদিকে কুমিল্লা জেলার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামানকে একাধিকবার ফোন দিলেও তিনি রিসিভ করেননি।
অপরদিকে, আসামীর স্বীকারোক্তির পরেও বিচারিক কার্যক্রম ও শাস্তি নিশ্চিত না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন নিহতের পরিবার এবং সুমাইয়ার সহপাঠীরা।
নিহত সুমাইয়ার বড়ো ভাই মো. সাইফুল বলেন, গাফিলতি না থাকলে এরকম দীর্ঘ সময় লাগার কথা নয়। আমাদের একটাই দাবি, দ্রুত বিচার কার্যক্রম শুরু করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে মামলার নিষ্পত্তি করা হোক।”
সুমাইয়া আফরিনের সহপাঠী মেহেদী হাসান শাহিন বলেন, "তৎকালীন পুলিশ, প্রশাসন, ইন্টেরিম সরকারকে বাঁচানোর জন্য এই ঘটনাটাকে ধামাচাপা দিয়েছিল। ভাইরাল হয়নি আমরা বিচারও পাইনি। বাংলাদেশে তো ভাইরাল না হলে আবার বিচার পাওয়া যায় না। বর্তমান সরকারের কাছে আমার আবেদন থাকবে যেন এই নৃশংসতার বিচার আমরা পাই। ধর্ষক যেন পার না পেয়ে যায়। এর ব্যতিক্রম হলে আমরা সারাদেশ আন্দোলনের ডাক দিব।
আরেক সহপাঠী সামিউন ঔশি বলেন, "রামিসা হত্যাকাণ্ডের রায়ে দেশ স্বস্তি পেলেও আলোচনার বাইরে থাকা অসংখ্য মামলার বিচার এখনো অনিশ্চিত। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আফরিন ও তার মায়ের জোড়া হত্যাকাণ্ডের ২৮১ দিন পেরিয়ে গেলেও মামলার নিষ্পত্তি হয়নি। স্বীকারোক্তি এবং প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও বিচার বিলম্বিত হচ্ছে। আমরা চাই, সুমাইয়া ও তার মায়ের হত্যাকারীরও দ্রুত সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত হোক।”
এ বিষয়ে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইমরুল হাসান রাহাত বলেন, "কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা মেরুদণ্ডহীন। আমাদের একজন বোনকে এভাবে হত্যা করা হলো এত মাস পর সবে স্বীকারোক্তি। আমাদের উচিত ছিলো এর মৃত্যুদণ্ড নিশ্চিত করার জন্য সচেষ্ট হওয়া।"
পুলিশ ও আদালতে দেওয়া স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, ঝাড়ফুঁকের সূত্রে সুমাইয়ার পরিবারের সঙ্গে পরিচয় হয় মোবারক হোসেনের। ঘটনার আগে প্রায় এক মাস ধরে তিনি নিয়মিত ওই বাসায় যাতায়াত করতেন। তার স্বীকারোক্তিতে তিনি জানান, সুমাইয়ার ওপর ঝাড়ফুঁক করার সময় তাকে ধর্ষণ করেন। বিষয়টি দেখে ফেলায় প্রথমে সুমাইয়ার মা তাহমিনা বেগমকে শ্বাসরোধে হত্যা করেন। এরপর সুমাইয়াকেও হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডের পর তিনি বাসা থেকে চারটি মোবাইল ফোন এবং একটি ল্যাপটপ নিয়ে পালিয়ে যান।
অভিযুক্ত মো. মোবারক হোসেন (২৯) কুমিল্লার দেবীদ্বার উপজেলার কাবিলপুর গ্রামের মৃত আবদুল জলিলের ছেলে। তিনি কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকায় বসবাস করতেন। পেশায় ঝাড়ফুঁক এবং কবিরাজির কাজের পাশাপাশি বাবুস সালাম জামে মসজিদের খাদেম হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন