প্রিন্ট এর তারিখঃ ২৯শে অক্টোবর, ২০২৬ইং; ০৩:১১ এম || প্রকাশের তারিখঃ ২৪শে জুলাই, ২০২৬ইং; ০৯:৩৭ এম
ভারতে সাম্প্রতিক সময়ে বর্তমান রাজনীতিকে ব্যঙ্গ করে তৈরি হওয়া ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) মোদি সরকারের বিরুদ্ধে পুরো ভারত জুড়ে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে।
শিক্ষা ব্যবস্থায় দুর্নীতির বিরুদ্ধে গত কয়েক দিন থেকে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ সহ নির্দিষ্ট কিছু দাবিতে তৈরি হওয়া তাদের এই ছাত্র গণ আন্দোলন দিল্লির যন্তর মন্তরেই চলছিল। কিন্তু তাদের শান্তিপূর্ণ দাবি আদায়ের আন্দোলনের এই সময়ে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর দিল্লী পুলিশের অমাণবিক ও বর্বরোচিত হামলা ও নির্যাতন কি শেয পর্যন্ত এই আন্দোলনকে শ্রীলংকা, নেপাল ও বাংলাদেশের ছাত্র জনতার গণঅভ্যুত্থান কিংবা বিপ্লব কিংবা গণ-বিষ্ফোরণের মতো মোদি হটাও আন্দোলন কিংবা মোদি সরকার পতনের আন্দোলনে রুপ দেয় কিনা সেটাই এখন দেখার বিষয়?
কারণ আন্দোলনে গোটা ভারতবর্ষের জনগণের ছাত্রদের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থনের সম্পৃক্ততা ও তীব্রতা দেখে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তার গদি বাঁচাতেই কি গভীর রাতে নমনীয় মনোভাব নিয়ে ছাত্রদের উদ্দেশ্যে নিজের ভেরিফিক আইডি থেকে লাইভে এসে ভিডিও বার্তা প্রদান করেছেন?
যিনি ছাত্রদের এ আন্দোলনকে পাত্তাই দিচ্ছিলেন না, তাদের আন্দোলনের পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে গেছে বলে অনুভব করলে বা তিনি ক্ষমতাধর প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নিজেকে বিশ্বগুরু দাবি করা ব্যক্তি আন্দোলনের তীব্রতা কতটা অনুভব করলে ব্যক্তিগতভাবে লাইভে এসে একপ্রকার আকুতি জানাতে পারেন তা থেকে অনুমান করা যায়, এই আন্দোলন কি শেষ পর্যন্ত সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া শ্রীলংকা, বাংলাদেশ ও নেপালের মত ছাত্রদের সাথে জনতা মিলে ছাত্র জনতার আন্দোলনে রূপ নিয়ে গণবিস্ফোরণে পরিণত হবে না তো?
ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলনকে কেবল একটি পেপার লিক কেলেঙ্কারির প্রতিক্রিয়া হিসেবে দেখলে মোদি সরকারের অপ-শাসনের দীর্ঘ এক যুগের প্রকৃত বাস্তবতার বড় একটি অংশ আড়াল হয়ে যাবে। মূলত এটি বহু বছর ধরে জমে থাকা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ। প্রশ্নফাঁস ছিল কেবল সেই স্ফুলিঙ্গ, যা দীর্ঘদিনের ১৪০ কোটি নাগরিকের ভেতর জমে থাকা বারুদ ভর্তি মনে জ্বলে ওঠা অসন্তোষের আগুন।
নরেন্দ্র মোদী টানা প্রায় ১২ বছর ধরে ভারতের ক্ষমতায়। এই দীর্ঘ সময়ে তাঁর সরকার রাষ্ট্রযন্ত্র, নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন, তদন্ত সংস্থা ও বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা নিয়ে বিরোধী মহল থেকে ধারাবাহিক প্রশ্নের মুখে পড়েছে।
একই সঙ্গে বিরোধী মত দমন , সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত হওয়া, বিরোধী দলের ও কণ্ঠের ওপর ক্রমাগত চাপ বৃদ্ধি, সারাদিন গণমাধ্যমকে নিজের করতল গত পরে একপ্রকার গলা চেপে ধরা এবং ভিন্নমত প্রকাশের পরিসর সীমিত হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে বৃহৎ এই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রটির গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করার মাধ্যমে দীর্ঘদিনের হবে তীব্র ক্ষোভের প্রতিফলন আজকের ছাত্র আন্দোলন।
এটি শুধু একটি পেপার লিংক ঘটনার বিষয়ে আন্দোলন বললে ভুল হবে। কারণ কাশ্মীর থেকে তামিলনাডু, গুজরাট থেকে অরুণাচল সর্বভারতে জনতার ক্ষোভের যে বিস্ফোরণ দেখা গেছে তা মোদির দীর্ঘ ১২ বছরের অপশাসনের বিরুদ্ধে জনতার ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ।
ক্ষমতা ধরে রাখতে, নাগরিকদের নাগরিকত্ব অধিকার কেড়ে নিতে , বিরোধীপক্ষের মতাদর্শ বা জনতার শক্তিকে খর্ব করতে এনআরসি, সিএএসহ নাগরিকত্ব-সংক্রান্ত নীতিগুলোও ভারতীয় রাজনীতিতে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে। জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা ভারতীয় নাগরিকদের জন্মের অধিকার তথা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে মোদি সরকার চরম ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সমালোচকদের মতে, এসব উদ্যোগ বিশেষ করে সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে পশ্চিমবঙ্গ ও আসামের বিপুলসংখ্যক মুসলিম , দলিত হিন্দু ও মোদি বিরোধী বিভিন্ন ধর্মের মানুষের প্রায় ৯০ লক্ষাধিক ভোটাধিকার কেড়ে নেওয়ার মাধ্যমে তাদের নাগরিকত্ব ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তার জন্ম দিয়েছে। সরকারের অবস্থান অবশ্য ভিন্ন; তারা দাবি করে, এসব পদক্ষেপ জাতীয় নিরাপত্তা ও নাগরিক নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে সুসংহত করার জন্য -যা মূলত মোদী সরকারের নিরঙ্কুশ, একনায়ক ও স্বৈরাশশাসন টিকিয়ে রাখার জন্য একটি কৌশল বা হাতিয়ার ছিল মাত্র।
কিন্তু রাষ্ট্রবিজ্ঞানের একটি পুরোনো সত্য হলো—যখন একটি সমাজে দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ক্ষোভ জমতে থাকে, তখন একটি মাত্র ঘটনাই বিস্ফোরণের কারণ হয়ে উঠতে পারে। ভারতের সাম্প্রতিক ছাত্র আন্দোলন কি সেই বিস্ফোরণের সূচনা? প্রশ্নটি এখন আর অমূলক নয়।
আজ যে তরুণেরা প্রশ্নফাঁসের বিরুদ্ধে রাজপথে নেমেছে, তাদের অনেকের ক্ষোভ কেবল একটি পরীক্ষাকে ঘিরে নয়; বরং কর্মসংস্থান, বৈষম্য, দুর্নীতি, মত প্রকাশের স্বাধীনতা হরণ, নিজেদের মত জনগণের উপর বাধ্যতামূলকভাবে চাপিয়ে দেয়া, সকল সাধারণ হিন্দুদের উপর উগ্র হিন্দুত্ববাদী চেতনা চাপিয়ে দেয়া, মুসলিমদের মসজিদ ভেঙে মন্দির নির্মাণ করার মত উগ্র জাতীয়তাবাদীর নামে সাম্প্রদায়িক চেতনা চাপিয়ে দেয়া, প্রশাসন, বিচার বিভাগ থেকে শুরু করে প্রত্যেকটি রাষ্ট্র কাঠামোকে দলীয়করণ করে ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠায় বাধা সৃষ্টি করা, জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হওয়া এবং জনগণের ভোটাধিকার ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়েও গোটা ভারতেই এই ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। সেই কারণেই ছাত্রদের এই আন্দোলন ১৪০ কোটির বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অকুণ্ঠ সমর্থন পাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে যাদের হয়ে কথা বলার প্রতিনিধি এতদিন ছিল না।
এটি শুধু পেপার প্রশ্ন ফাঁস বা লিক বিরোধী ছাত্র আন্দোলন নয়; এটি মোদি সরকারের দীর্ঘ অপশাসন ও গণতন্ত্রের লেবাসে কৌশলে একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করার বিষয় নিয়ে মানুষের পুঞ্জিভূত ক্ষোভের ও অসন্তোষের চুড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।
ক্ষমতার দীর্ঘস্থায়িত্ব অনেক সময় শাসকদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়, ক্ষমতায় থাকায় দম্ভ ও অহংকার সৃষ্টি হয়, কিন্তু একই সঙ্গে জনগণের ক্ষোভও নীরবে জমতে থাকে যা যুগে যুগে স্বৈরশাসকেরা কখনো অনুধাবন করতে পারেনি। ইতিহাস বহুবার দেখিয়েছে—সেই ক্ষোভ যখন বিস্ফোরিত হয়, তখন সবচেয়ে শক্তিশালী ক্ষমতার মসনদও কেঁপে ওঠে।
আর তার সর্বশেষ উদাহরণ এশিয়ায় মালদ্বীপ থেকে শুরু করে শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল সরকারের যারা এককভাবে ক্ষমতায় টিকে থাকার সর্বশেষ চেষ্টা যা প্রশাসন দ্বারা নির্ধারিত সময় পর্যন্ত ক্ষমতা ধরে রাখতে মরিয়া চেষ্টা করেছিল কিন্তু পারেনি। সাম্প্রতিক সিজেপির (ককরোজ জনতা পার্টির) ছাত্র আন্দোলনে পুলিশের পক্ষ থেকে ছাত্র-ছাত্রীদের উপর যে হিংস্র আচরণ মোদি সরকার পেটোয়া বাহিনী দ্বারা করা হয়েছে কিংবা নিরাপত্তা বাহিনীর কথায় পুলিশকে ছাত্রদের উপর লেলিয়ে দেওয়া এবং এসব ব্যবহার করেও ক্ষমতায় থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করাও শেষ পর্যন্ত সফল নাও হতে পারে।
ভারতের রাজপথে আজ যে উত্তাল তরঙ্গ দেখা যাচ্ছে, সেটি শেষ পর্যন্ত কোথায় গিয়ে থামবে, তা সময়ই বলবে। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—যে আগুন একবার মানুষের মনে জ্বলে ওঠে, তাকে শুধু প্রশাসনিক শক্তি দিয়ে চিরদিন দমিয়ে রাখা যায় না। যদি এই ক্ষোভ আরও বিস্তৃত সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেয়, তবে ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা হতে পারে।
কাজেই মোদি সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আন্দোলন থামাতে কিংবা ক্ষমতা ধরে রাখতে কিংবা ক্ষমতায় টিকে থাকতে সরকার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দাবানলের মত উত্তাল আন্দোলন দেখে গদি সামলাতে রাতে তার স্যেসাল মিডিয়ায় লাইভে ভাল মানুষ হয়ে সেজে এসে ভাল কথা বলে কি বারুদসম ১৪০ কোটি নাগরিকের ভেতর দাবানলের মতো জ্বলে ওঠা অগ্নি স্ফুলিঙ্গে জল ঢালতে পারবে?-আমার মনে হয় সেটি সম্ভব নয়, বাকিটা হয়তো সময়েই বলবে - এমন কথা বলা মনে হয় আজকের দিনে বলা অমূলক নয়।
লেখকঃ সাংবাদিক, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও কলামিস্ট।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন