প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, রোগীদের প্রতি চিকিৎসক এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের আন্তরিক ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং সঠিক চিকিৎসা প্রদানের মাধ্যমে দেশের স্বাস্থ্যসেবার ওপর মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস পুরোপুরি ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
তিনি জানান, 'স্বাস্থ্যসেবা খাতকে শক্তিশালী করতে চিকিৎসকদের সময়নিষ্ঠা, দায়িত্ববোধ এবং সর্বোপরি রোগীদের প্রতি সহমর্মী আচরণ অত্যন্ত জরুরি।'
আজ দুপুরে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ৮১তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ঢামেক মেডিকেল কলেজ অডিটোরিয়ামে আয়োজিত ‘বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার আধুনিকায়নে ডিএমসিয়ানদের ভাবনা’ শীর্ষক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্য রাখেন প্রধানমন্ত্রীর সহধর্মিণী ডা: জুবাইদা রহমান।
চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, 'এ দেশ থেকে বহু মানুষ বিদেশে যাচ্ছেন চিকিৎসা করাতে। এর ফলে প্রতি বছর পাঁচ বিলিয়ন ডলার বিদেশে চলে যাচ্ছে চিকিৎসার খরচে। দেশের মানুষের এই চিকিৎসা আমরা কেনো দেশে করাতে পারবো না? আমরা কেনো মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারবো না? এটা আইন প্রয়োগ করে হবে না। কেবল চিকিৎসকরাই পারবেন তাদের মানবিক এপ্রোচ আর সঠিক চিকিৎসা দানের মাধ্যমে দেশের মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস সম্পূর্ণ ফিরিয়ে আনতে। তাই চিকিৎসকদের প্রতি আহ্বান থাকবে রোগীর আস্থা অর্জনে আরও মানবিক হোন।'
প্রধানমন্ত্রী সরকারের উদ্যোগগুলো তুলে ধরে বলেন, জনগণ যাতে শুরুতেই স্বাস্থ্যসেবা পরামর্শ পায়, এ লক্ষ্যে সারাদেশে এক লাখ হেলথ কেয়ারার বা স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। 'এদের মধ্যে ৮০ শতাংশ হবেন নারী হেলথ কেয়ারার, যারা পরিবারভিত্তিক প্রতিরোধমূলক ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেবেন।'
তিনি আরও বলেন, 'একটি সুস্থ জাতি শুধু হাসপাতাল দিয়ে গড়ে ওঠে না, বরং পারিবারিক সচেতনতা, পরিচ্ছন্ন প্রতিবেশ ও পরিবেশ, স্বাস্থ্য পরামর্শ, নিরাপদ খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং নাগরিক হিসেবে দায়িত্বশীল জীবনাচরণের ওপর শারীরিক সুস্থতার অনেকখানি নির্ভর করে।'
'প্রতিকারের চেয়ে প্রতিরোধ উত্তম' সরকার এই নীতিতে সবার কাছে স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছাতে চায় বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী। 'পুষ্টি, টিকাদান, মাতৃস্বাস্থ্য, শিশুর স্বাভাবিক বেড়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ, ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার, কিডনি রোগ, হৃদরোগ কিংবা ক্যানসার এমন অনেক বিষয় সম্পর্কে আগেভাগেই স্বাস্থ্যসম্মত পরামর্শ পেলে শুরুতেই রোগের নিরাময় অনেকাংশেই সহজ হয়ে যায়। তাই পরামর্শ অনুযায়ী সচেতনতা অবলম্বন করলে, নিয়মিত পরীক্ষা এবং জীবনযাত্রার পরিবর্তনের মাধ্যমে অনেক রোগ গোড়াতেই নিরাময় কিংবা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।'
তিনি জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা উল্লেখ করে বলেন, 'এটি জিডিপির ১ দশমিক শূন্য ২ শতাংশ। পর্যায়ক্রমে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের পরিমাণ আগামী পাঁচ বছরে জিডিপির পাঁচ শতাংশে উন্নীত করার পরিকল্পনা রয়েছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'শুধু বাজেট বৃদ্ধি নয়, সরকার বিভিন্ন চিকিৎসা সামগ্রী এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে চিকিৎসা ব্যয় কমিয়েছে। ডায়ালাইসিস ফিল্টার, হার্টের স্টেন্ট, হার্টের ভাল্ব, পেসমেকার, অক্সিজেনাটোরস, পেরিফেরাল ভাসকুলার স্টেন্ট, রেডিও ফ্রিকোয়েন্সি এবলেশন ফাইবার, চোখের লেন্স এবং ক্যানসার চিকিৎসায় ব্যবহৃত কিছু কাঁচামালের ওপর ভ্যাট এবং ট্যাক্স কমানো হয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ট্যাক্স সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করা হয়েছে।'
তিনি জানান, সরকার দেশের প্রতিটি হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০১ বেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং বর্তমানে দেশের ৫শ’ উপজেলার মধ্যে মাত্র পাঁচটি উপজেলায় ১শ’ বেডের হাসপাতাল রয়েছে। এতে চিকিৎসার প্রয়োজনে রোগীদের শহরমুখী হতে হয়। তাই সরকার দেশের সবকটি উপজেলায় বিদ্যমান ৩১ থেকে ৫১ বেডের হাসপাতালকে পর্যায়ক্রমে ১০১ বেডে উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি সকল হাসপাতালের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করে বিরতিহীন বিদ্যুৎ সরবরাহের পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে।
শিশু স্বাস্থ্য রক্ষায় বর্তমান সরকার বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী জানান, সরকার ইতোমধ্যে শিশুস্বাস্থ্য সুরক্ষায় বরিশাল ও রাজশাহীতে নির্মিত ২শ’ শয্যাবিশিষ্ট শিশু হাসপাতালসহ মোট পাঁচটি শিশু হাসপাতাল দ্রুত চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। এতে শিশু চিকিৎসা রাজধানীকেন্দ্রিক না হয়ে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সহজলভ্য হবে।'
স্বাস্থ্য ও চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে মেডিক্যাল বর্জ্য অপসারণ বিজ্ঞানসম্মত করার বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'আসুন, আমরা সবাই মিলে মেডিক্যাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনাকে বিজ্ঞানসম্মত এবং হাসপাতালগুলোকে ক্লিন রাখার চেষ্টা করি।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'প্রতিটি হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থা তথা চিকিৎসক, নার্স এবং সকল স্বাস্থ্যকর্মীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করছে। ইতোমধ্যেই হাসপাতালগুলোতে ১০ জন করে আনসার সদস্য মোতায়েনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।'
তিনি জানান, 'রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করতে আরো পাঁচ হাজার এমবিবিএস চিকিৎসক নিয়োগের কার্যক্রম ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। পাশাপাশি চিকিৎসক, নার্স, মেডিকেল টেকনোলজিস্ট, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ এবং অন্যান্য স্বাস্থ্য পেশাজীবীর বিদ্যমান শূন্যপদ দ্রুত পূরণের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হচ্ছে।'
প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'চিকিৎসকগণই সত্যিকার অর্থে মানুষের বিপদের বন্ধু। চিকিৎসকগণই রোগে শোকে কাতর মানুষটির পরম বন্ধু হয়ে ওঠেন। একজন চিকিৎসকের উপদেশ ও আন্তরিক ব্যবহার একজন রোগীর কাছে ঔষধের মতো কার্যকরী হয়ে ওঠে। সুতরাং একজন চিকিৎসকের জন্য পেশাগত উৎকর্ষের পাশাপাশি মানবিক মানুষ হয়ে ওঠাও জরুরি।'
বক্তব্যের শুরুতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজকে জীবন্ত ইতিহাস ও কালের সাক্ষী উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, 'শুধুমাত্র চিকিৎসা ক্ষেত্রেই নয়, ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ, ৯০ এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলন কিংবা দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষায় ২০২৪ সালের বীর ছাত্র-জনতার গণ অভ্যুত্থান প্রতিটি ক্ষেত্রেই এই প্রতিষ্ঠানের রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা।'
তিনি বলেন, 'এই ক্যাম্পাসে শুধুমাত্র দেশ বিদেশের সেরা চিকিৎসকই তৈরী হয়নি, শিক্ষক, গবেষক, সমাজনেতা কিংবা মুক্তিযোদ্ধাসহ এই প্রতিষ্ঠান থেকে এমন মহৎ মানুষ তৈরী হয়েছেন, যারা অন্যের জীবন রক্ষায় নিজেদের জীবন ও স্বার্থ বিলিয়ে দিতেও কুন্ঠাবোধ করেননি।'
পরিশেষে ঐতিহাসিক মেডিক্যাল কলেজের ৮১ তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সাবেক এবং বর্তমান শিক্ষার্থী-শিক্ষক এবং ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মীসহ এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
এর আগে সকাল ১০টায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ ক্যাম্পাসের শহীদ মিলন চত্বরে শান্তির প্রতীক পায়রা ও বেলুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী।
পরে তারেক রহমান উন্মুক্ত আলোচনায় অংশ নেন। শিক্ষার্থীদের নানা সমস্যার কথা মন দিয়ে শোনেন। আলোচনায় শিক্ষক, চিকিৎসক ও শিক্ষার্থীদের একটাই প্রত্যাশা উঠে আসে। ঐতিহ্যের এই গৌরব ধরে রেখে ঢামেককে যেন বিশ্বমানের একটি আধুনিক গবেষণা, শিক্ষা ও চিকিৎসাকেন্দ্রে রূপান্তরের কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়।
ঢাকা মেডিকেল কলেজের উপাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. মুসাররাত সুলতানার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এম এ মুহিত, প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী ডা. এস এম জিয়াউদ্দিন হায়দার, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, বিএনপির স্বাস্থ্য বিষয়ক সম্পাদক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রফিকুল ইসলাম, ড্যাবের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক ডা. হারুন আল রশিদ, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাজমুল হোসেন, স্বাস্থ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন