প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দক্ষিণ আফ্রিকায় এইচআইভি এবং এইডস প্রতিরোধে চলমান বিভিন্ন কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্র আর অর্থ সহায়তা দেবে না। মার্কিন সরকার এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছে।
এই কারণেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় এইচআইভি আক্রান্ত জনগোষ্ঠীর দেশের স্বাস্থ্য খাত নতুন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ৮০ লাখেরও বেশি মানুষ এইচআইভি নিয়ে বসবাস করছেন। বিশ্বের অন্য যেকোনো দেশের তুলনায় এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। বহু বছর ধরে এই রোগ মোকাবিলায় যুক্তরাষ্ট্র দেশটিকে বড় ধরনের আর্থিক সহায়তা দিয়ে এসেছে।
মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তর ইঙ্গিত দিয়েছে, দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে চলমান রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিরোধের কারণেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যালঘু আফ্রিকানার সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দক্ষিণ আফ্রিকা ব্যর্থ হয়েছে বলেই যুক্তরাষ্ট্রের এ অভিযোগের সাথে এই সিদ্ধান্তের সম্পর্ক রয়েছে।
তবে দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার এসব অভিযোগ একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করেছে। দেশটি দাবি করেছে, আফ্রিকানারদের বিরুদ্ধে কোনো ধরনের বৈষম্য বা নিপীড়ন চলছে না।
দক্ষিণ আফ্রিকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তাদের পূর্বে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি। তবে তারা দীর্ঘদিন ধরেই বিদেশি সহায়তার ওপর নির্ভরতা কমিয়ে নিজেদের অর্থায়নে স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনার পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে। ২০২৫ সাল পর্যন্ত দক্ষিণ আফ্রিকার এইচআইভি প্রতিরোধ কর্মসূচিতে প্রতিবছর প্রায় ৪০ কোটি ডলার সহায়তা দিত যুক্তরাষ্ট্র। এই অর্থ ‘প্রেসিডেন্টস ইমার্জেন্সি প্ল্যান ফর এইডস রিলিফ’ বা পিইপিএফএআর কর্মসূচির মাধ্যমে আসত। এই কর্মসূচি বহু বছর ধরে আফ্রিকাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এইচআইভি মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
যদিও প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় আসার পর দুই দেশের সম্পর্ক আরো খারাপ হতে শুরু করে। ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প একটি নির্বাহী আদেশে অভিযোগ করেন, দক্ষিণ আফ্রিকার কিছু সরকারি নীতি সমান সুযোগের পরিবেশ নষ্ট করছে। তিনি আরও দাবি করেন, দেশটির নীতিমালা বর্ণগত কারণে কিছু জমির মালিকদের বিরুদ্ধে বৈরী পরিস্থিতি তৈরি করছে। দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের মতে, বর্ণবাদী শাসনের সময় তৈরি হওয়া অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে কৃষ্ণাঙ্গ জনগণের জন্য বিশেষ অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন নীতি প্রয়োজন। ট্রাম্পের ওই নির্বাহী আদেশে আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে ইসরায়েলের বিরুদ্ধে দক্ষিণ আফ্রিকার করা মামলার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়। সঙ্গে সঙ্গেই ইরানের সাথে সম্পর্ক নিয়েও সমালোচনা করা হয়। হোয়াইট হাউস বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকার এসব কর্মকাণ্ডকে তারা ‘অন্যায় ও অনৈতিক’ মনে করছে। এজন্য দেশটিকে আর সহায়তা দেওয়া হবে না। ট্রাম্প আরো দাবি করেছেন, দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের বিরুদ্ধে ‘গণহত্যা’ ঘটছে। তবে এই দাবির পক্ষে কোনো বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ পাওয়া যায়নি। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এবং গবেষকরা এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন বলেও উল্লেখ করেছেন। ট্রাম্প প্রশাসন আফ্রিকানারদের জন্য একটি বিশেষ শরণার্থী কর্মসূচি চালু করেছে এই দাবির ভিত্তিতে।
আফ্রিকানাররা মূলত পশ্চিম ইউরোপীয় বংশোদ্ভূত শ্বেতাঙ্গ জনগোষ্ঠী, যারা ১৭শ শতকে দক্ষিণ আফ্রিকায় বসতি স্থাপন করেছিলেন। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশের অনুমতি পাওয়া শরণার্থীদের মধ্যে এই গোষ্ঠী অন্যতম প্রধান। দক্ষিণ আফ্রিকার এইচআইভি কর্মসূচির মোট ব্যয়ের প্রায় ২০ শতাংশ আসত পিইপিএফএআরের অর্থ থেকে। গত বছরের অক্টোবরে একটি ‘সেতুবন্ধন পরিকল্পনার’ মাধ্যমে এই অর্থায়ন সাময়িকভাবে চালু রাখা হয়েছিল। তবে এখন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর নিশ্চিত করেছে, এই অর্থায়ন ধাপে ধাপে কমানো হবে এবং শেষ পর্যন্ত বন্ধ করে দেওয়া হবে। পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, দক্ষিণ আফ্রিকা যুক্তরাষ্ট্রের নীতিগত উদ্বেগগুলো দূর করতে দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি প্রদর্শন করতে পারেনি। এজন্য অর্থ সহায়তা কমানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র চায় দক্ষিণ আফ্রিকা নিজেদের সক্ষমতার ওপর আরো বেশি নির্ভরশীল হোক এবং মার্কিন অর্থের ওপর নির্ভরতা কমাতে চাইছে। তার মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা একটি মধ্যম আয়ের দেশ এবং তাদের নিজেদের স্বাস্থ্য কর্মসূচি পরিচালনা করার মতো সক্ষমতা রয়েছে। তবে দক্ষিণ আফ্রিয়ার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এইচআইভি আক্রান্তদের জীবন রক্ষাকারী অ্যান্টিরেট্রোভাইরাল ওষুধের অর্থায়ন সরাসরি এই সহায়তার ওপর নির্ভরশীল নয়। এসব ওষুধের বেশিরভাগ অর্থই দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার নিজেই বহন করে।
এদিকে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার বিভিন্ন উদ্যোগও সফল হয়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ছিল হোয়াইট হাউসে ট্রাম্প এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার বৈঠক। সেই বৈঠকে ট্রাম্প দক্ষিণ আফ্রিকায় শ্বেতাঙ্গদের ওপর নিপীড়নের অভিযোগ নিয়ে রামাফোসার মুখোমুখি হন। গত নভেম্বরে দক্ষিণ আফ্রিকায় অনুষ্ঠিত জি-২০ সম্মেলনেও যুক্তরাষ্ট্র অংশ নেয়নি। বিশ্বের বৃহৎ অর্থনীতির দেশগুলোর এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকের আয়োজক ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দুই দেশের মধ্যে বাড়তে থাকা দূরত্বের পূর্বাভাস দিচ্ছে। এবং এর প্রভাব শুধুমাত্র কূটনীতিতে নয়, স্বাস্থ্য খাতেও দেখা দিতে পারে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন