প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
যাত্রাপথে চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল বা লাইনচ্যুতি যেন নিয়মিত ঘটনা হয়ে উঠেছে ঢাকা–ময়মনসিংহ–জামালপুর রেলপথে। একটির পর এক এই ধরনের ঘটনায় ট্রেনের সময়সূচি ভেঙে পড়ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভোগান্তিতে পড়ছেন যাত্রীরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো ইঞ্জিন আর দুর্বল লাইনের সামগ্রিক সমস্যা হচ্ছে বড় কারণ। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, দীর্ঘকাল ধরে সিন্ডিকেটের কারণে রেলপথে উন্নয়ন না হওয়ায় রেলসেবা থেকে জনগণকে অবরুদ্ধ করাও হচ্ছে। তবে কর্মকর্তারা জানিয়ে দিয়েছেন, রেলপথের মানোন্নয়নে সরকার সচেষ্ট হয়েছে এবং প্রকল্প প্রণয়নের কাজ চলছে।
লোকোশেড থেকে ট্রেন ছাড়ার আগে ইঞ্জিনের ব্রেক, ইলেকট্রিক্যাল সিস্টেম, জ্বালানি ও অন্যান্য কারিগরি বিষয় পরীক্ষা করা হয়। যাকে রেলওয়ের পরিভাষায় বলা হয় লোকোমেটিভ। সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা–ময়মনসিংহ–জামালপুর রেলপথে বিভিন্ন যান্ত্রিক ত্রুটির ঘটনা বেড়েছে। কখনও চলন্ত ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লেগেছে, কখনও ইঞ্জিন বিকল হয়ে মাঝপথে থেমে গেছে, আবার কখনও হুক ভেঙে ইঞ্জিন থেকে বগি বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এই রুটে চলতি জুন মাসেই তিনটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ ১৫ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে গফরগাঁও এলাকায় আন্তনগর জামালপুর এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন ও বগির সংযোগস্থলের হুক ভেঙে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। এতে প্রায় দুই ঘণ্টা ঢাকা–ময়মনসিংহ রেলপথে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একই দিন সন্ধ্যার আগে চট্টগ্রাম থেকে জামালপুরগামী বিজয় এক্সপ্রেসের ইঞ্জিনে আগুন লাগে। ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় প্রায় তিন ঘণ্টা ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। পরে বিকল্প ইঞ্জিনে ট্রেনটি চালানোর চেষ্টা হলেও কিশোরগঞ্জের বাজিতপুরের সরারচর এলাকায় সেটিও বিকল হয়ে পড়ে। ইঞ্জিনের সংকটের কারণে সেদিন চট্টগ্রামগামী ময়মনসিংহ এক্সপ্রেস মেইল ট্রেনের যাত্রাও বাতিল হতে হয়েছিল।
এছাড়া চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত ১৮টি এবং ২০২৫ সালে ২৫টি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়েছিল। এমন ঘটনার কারণে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে আটকে থাকে ট্রেন। বিপরীতে ট্রেনের সময়সূচি ভেঙে পড়ে এবং যাত্রীরা চরম দুর্ভোগে পড়ছেন।
কিন্তু কেন বারবার এই বিকল দশা? সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই রুটে চলাচলকারী ট্রেনের অধিকাংশ ইঞ্জিনের বয়স পেরিয়েছে ৩০ থেকে ৪৫ বছর। এর মধ্যে দুটি ৭৩ বছরের পুরনো ইঞ্জিনও রয়েছে। ২০ বছরের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল শেষ হওয়ায় মাঝপথেই এগুলো অচল হয়ে পড়ছে।
অন্যদিকে, রেলপথে পাথর, স্লিপার ও নাট–বল্টুর ঘাটতি এবং লাইনের দুর্বল অবস্থার কারণে ধীরগতিতে ট্রেন চালাতে হয়। তবে প্রায়ই ঘটছে লাইনচ্যুতি। সম্প্রতি লাইনচ্যুত বগি উদ্ধার করতে গিয়ে রিলিফ ট্রেনও লাইনচ্যুত হয়ে পড়ে।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, এ অঞ্চলের অধিকাংশ ইঞ্জিনই পুরোনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ। চলাচলের সময় অতিরিক্ত গরম হলে অনেক ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। অন্যদিকে, রেলপথে পাথর, স্লিপার ও নাট–বল্টুর ঘাটতি এবং লাইনের দুর্বল অবস্থার কারণে ট্রেন ধীরগতিতে চালাতে হয়। নতুন ইঞ্জিন সংযোজন ও রেলপথ সংস্কার ব্যতীত পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।
ময়মনসিংহ লোকোশেডের পরিদর্শক শফিউল হাসান বলেছেন, পুরোনো ইঞ্জিন ও দুর্বল রেলপথের কারণে নির্ধারিত গতিতে ট্রেন চলালে এসব সমস্যা হয়। অনেক সময় পূর্ণাঙ্গ মেরামতের আগেই ইঞ্জিন আবার চলাচলে নিয়ে গিয়ে সমস্যা দেখা দেয়। রেলপথ সংস্কারের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগে একাধিক বার চিঠিও দেওয়া হয়েছে।
ময়মনসিংহ থেকে ঢাকা, জামালপুর, নেত্রকোনা ও চট্টগ্রাম রুটে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করে। তবে ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে ভাওয়াল ও ধলেশ্বরী নামে দুটি মেইল ট্রেন এবং মোহনগঞ্জগামী দুটি লোকাল ট্রেন ও জামালপুরের দেওয়ানগঞ্জগামী একটি লোকাল ট্রেন বন্ধ রয়েছে।
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় ধরে সিন্ডিকেটের কারণে রেলপথে উন্নয়ন না হওয়ায় রেলসেবা থেকে জনগণকে অবরুদ্ধ করে ফেলা হয়েছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ জানান, রেলপথে দায়িত্বপ্রাপ্তরা এ বিষয়ে অবহেলা করছেন। দীর্ঘদিন রেলপথ সংস্কার না হওয়া, নিয়মিত পাথর না ফেলা এবং পুরোনো ইঞ্জিন যথাযথভাবে মেরামত না করায় যাত্রা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। তাঁর দাবি, রেলের উন্নয়নে অবহেলার কারণে জনগণ যেমন নিরাপদ যাতায়াত থেকে বঞ্চিত হচ্ছে, তেমনি সরকারও সম্ভাব্য রাজস্ব হারিয়ে যাচ্ছে।
তবে রেলওয়ে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, রেলপথের মানোন্নয়নে সরকারের নজর রয়েছে, তারা প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে। রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, লাইনচ্যুতির ঘটনা তুলনামূলকভাবে কম হলেও তারা নিয়মিত ইঞ্জিন বিকলের সমস্যায় পড়ে যাচ্ছেন। অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন সংগ্রহ প্রয়োজন। একই সঙ্গে শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ সংস্কার জরুরি। পাথর কমে যাওয়ায় চাপ পড়ে এসব রেলপথে লাইন ভেঙে যায়। এখন লাইন সংস্কার হলে লাইনচ্যুতির ঘটনা কমে আসবে এবং ট্রেনের গতিও বাড়বে। এ বিষয়ে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চল একটি প্রকল্প প্রণয়নের কাজ করছে।
শুধুমাত্র মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন আর নড়বড়ে লাইনের কারণে এই রুটের এক্সপ্রেস ট্রেনগুলো যেন চলে লোকালের গতিতে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কোটি কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল পেতে হলে ইঞ্জিন সংকট ও ফিটনেস সমস্যার স্থায়ী সমাধান দরকার। সেই সঙ্গে ট্রেন চলাচল নির্বিঘ্ন করতে প্রয়োজন ডুয়েল গেল ডাবল লাইন স্থাপন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন