প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জুমার দিন হলো শ্রেষ্ঠ দিন। এটি সপ্তাহের ঈদের দিন। ইসলামের মধ্যে এই দিনের মর্যাদা বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। আল্লাহ তাআলা সব দিনের মধ্যে জুমাবারকে যে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন, সেটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোরআন ও হাদিসে এই দিনের বিশেষ সম্মান ও মর্যাদা সম্পর্কিত আলোচনা করা হয়েছে।
হজরত হুজাইফা ইবনুল ইয়ামান রা. দ্বারা বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তাআলা পূর্ব জাহান সবার কাছে জুমার মর্যাদা অজ্ঞাত রেখেছিলেন। এজন্য ইহুদিরা শনিবারকে এবং খ্রিস্টানরা রবিবারকে নির্ধারণ করেছে। তারপর আমরা এসেছি এবং আমাদের কাছে তিনি জুমার দিনের মর্যাদা প্রকাশ করেছেন।’ (মুসলিম, হাদিস ৮৫৬)
জুমার দিনটি ইসলামি ইতিহাসে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হজরত আবু লুবাবা বিন আবদুল মুনজির রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুলুল্লাহ সা. জুমার দিন শ্রেষ্ঠ হওয়ার কিছু কারণ উল্লেখ করেছেন। প্রথমত, আল্লাহ তাআলা এই দিনে প্রথম মানব হজরত আদম আ.-কে সৃষ্টি করেছেন। দ্বিতীয়ত, জুমার দিনে আদম আ.-কে জমিনে অবতরণ করিয়েছেন। তৃতীয়ত, জুমাবারে হজরত আদম আ.-কে মৃত্যু দিয়েছেন। চতুর্থত, এ দিনে এমন একটি সময় আছে, যখন বান্দা আল্লাহর কাছে যা কিছু প্রার্থনা করবে, তা কুবল করা হবে। যদি সে হারাম কিছু না প্রার্থনা করে। পঞ্চমত, সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এ দিনে কিয়ামত সংঘটিত হবে। (ইবনে মাজাহ, হাদিস ৮৯৫)
জুমার নামাজের গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করতে গেলে, হজরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসের কথা উল্লেখ করতে হয়, যেখানে রাসুল সা. বলেন, ‘পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ, এক জুমা থেকে পরবর্তী জুমা এবং এক রমজান থেকে পরবর্তী রমজান মধ্যবর্তী সময়ের পাপ মোচন করে; যদি সেই ব্যক্তি সব ধরনের কবিরা গুনাহ থেকে বিরত থাকে।’ (মুসলিম হাদিস ২৩৩)
হজরত সালমান ফারসি রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসুল সা. বলেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন গোসল করে, সাধ্যমতো পবিত্র হয়, তেল ব্যবহার করে, ঘর থেকে সুগন্ধি ব্যবহার করে, অতঃপর মসজিদে এসে নামাজ আদায় করে, সেখানে দুই মুসল্লির মধ্যে ফাঁক করে সামনে এগিয়ে যায় না, নির্দিষ্ট পরিমাণ নামাজ পড়ে এবং যখন ইমাম কথা বলেন, তখন চুপ থাকে; তাহলে আল্লাহ তাআলা তার দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ের গুনাহ মাফ করবেন।’ (বোখারি, হাদিস ৮৮৩)
জুমার দিনে গোসল করার অনেক ফজিলত রয়েছে। যারা আগে মসজিদে যান, তাদের জন্য মহান সওয়াব লাভ হয়। হজরত আউস বিন আউস সাকাফি রা. থেকে বলা হয়েছে, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন ভালো করে গোসল করে, দ্রুততর সময়ে মসজিদে যায় এবং (ইমামের) কাছাকাছি বসে মনোযোগসহ (খুতবা) শুনতে পারে, তার জন্য প্রতি কদমের বদলে এক বছরের রোজা ও নামাজের সওয়াব থাকবে।’ (আবু দাউদ, হাদিস ৩৪৫)
জুমার নামাজের জন্য মসজিদে আগে প্রবেশ করার বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রথমে মসজিদে যাওয়ার জন্য গোসল করে, সে যেন একটি উট কোরবানি করল। যে তারপরে মসজিদে গেল, সে যেন একটি গরু কোরবানি করল। আর যে পরে ঢুকল, সে যেন একটি ছাগল কোরবানি করল, এরপর যে ঢুকল সে যেন মুরগি কোরবানি করল, আর যে এরপর ঢুকল সে যেন ডিম সদকা করল। এরপর যখন ইমাম খুতবার জন্য বের হন, ফেরেশতারা আলোচনা শুনতে শুরু করে।’ (বোখারি, হাদিস ৮৪১)
জুমার দিনে একটি বিশেষ সময় আছে, যখন মানুষ আল্লাহর কাছে দোয়া করলে আল্লাহ তা কবুল করেন। হজরত জাবের রা. থেকে বলা হয়েছে, রাসুল সা. বলেন, ‘জুমার দিনে কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে ভালো কিছু প্রার্থনা করলে আল্লাহ তা দেন। তোমরা সময়টি আছরের পর অনুসন্ধান কোরো।’ (আবু দাউদ ১০৪৮)
হজরত জাবের ইবনে আবদুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে রাসুল সা. বলেছেন, ‘জুমার দিন বারো ঘণ্টার মধ্যে একটি মুহূর্ত রয়েছে যা কোনো মুসলিম আল্লাহর কাছে কিছু প্রার্থনা করে, মহান ও সর্বশক্তিমান আল্লাহ তাকে তা দান করেন। এই মুহূর্তটি তোমরা আছরের শেষ সময়ে অনুসন্ধান করো।’ (আবু দাউদ ১০৪৮)
জুমার অন্যতম আমল হল সুরা কাহাফ পাঠ করা। হজরত আবু সাইদ খুদরি রা. থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুল সা. বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি জুমার দিন সুরা কাহাফ পড়বে, তা তার জন্য দুই জুমার মধ্যবর্তী সময়ে আলোকিত হয়ে থাকবে। আর যে ব্যক্তি এই সুরার শেষ ১০ আয়াত পাঠ করবে, অতঃপর দাজ্জাল বের হলে তার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। যে ব্যক্তি অজুর পর এই দোয়া পড়বে, তার নাম একটি চিঠিতে লেখা হবে এবং তাতে সিল দেওয়া হবে, যা কিয়ামত পর্যন্ত আর ভাঙা হবে না।’ (তারগিব ১৪৭৩, আল মুসতাদরাক ২/৩৯৯)
জুমার দিন রাসুল সা.-এর ওপর বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা অনেক সাওয়াবের বিষয়। হজরত আউস বিন আবি আউস রা. থেকে এসেছে, রাসুল সা. বলেছেন, ‘তোমাদের দিনগুলোর মধ্যে জুমার দিন সর্বোত্তম। এই দিনে আদম আ.-কে সৃষ্টি করা হয়েছে। এই দিনে তিনি ইন্তেকাল করেছেন। এই দিনে শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে এবং এই দিনে সবাইকে বেহুঁশ করা হবে। অতএব, তোমরা এই দিনে আমার ওপর বেশি পরিমাণ দরুদ পড়ো। কারণ জুমার দিনে তোমাদের দরুদ আমার কাছে পেশ করা হয়।’ সাহাবারা বললেন, আমাদের দরুদ আপনার কাছে কিভাবে পেশ করা হবে, অথচ আপনার দেহ একসময় নিঃশেষ হয়ে যাবে। তিনি বলেন, ‘আল্লাহ জমিনের জন্য আমার দেহের ভক্ষণ নিষিদ্ধ করেছেন।’ (আবু দাউদ ১০৪৭)
জুমার দিনের আমলের মধ্যে রয়েছে নখ কাটা, গায়ের অবাঞ্চিত লোম পরিস্কার করা, উত্তম রূপে গোসল করা, উত্তম পোশাক পরিধান করা, সুগন্ধি ব্যবহার করা, যদি তা তার কাছে থাকে। এরপর জুমার নামাজে অংশগ্রহণ করতে হবে এবং অন্য মুসল্লিদের গায়ের ওপর দিয়ে টপকে সামনের দিকে না যেতে হবে। নির্ধারিত নামাজ আদায় করতে হবে। এরপর ইমাম খুতবার জন্য বের হওয়ার পর থেকে সালাম পর্যন্ত চুপ থাকতে হবে। তাহলে তার এই আমল পূর্ববর্তী জুমার দিন থেকে পরবর্তী জুমা পর্যন্ত সব সগিরা গুনাহের জন্য কাফ্ফারা হবে (আবু দাউদ, হাদিস : ৩৪৩)।
মহিলাদের জন্য শুক্রবারের আমলও রয়েছে। শুক্রবার জুমার দিন হলো ফজিলতের দিন। এ দিনে মহিলাদের জন্য বিশেষ কিছু আমল রয়েছে, যা পুরুষদের মতোই সমান ফজিলত প্রদান করে। তবে, কিছু আমল মসজিদে যাওয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যা মূলত পুরুষদের জন্য নির্ধারিত। অন্য সব আমলগুলো নারী-পুরুষ উভয়ের জন্য প্রযোজ্য। যেমন, গোসল করা, বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা, সুরা কাহাফ তিলাওয়াত করা, নখ কাটা ইত্যাদি।
এছাড়া নারীরা জুমার নামাজের পরিবর্তে ঘরে জোহরের নামাজ আদায় করবেন। হজরত উম্মে সালামা রা. থেকে বর্ণিত হাদিসে এতে উল্লেখ রয়েছে, ‘নারীদের ঘরে নামাজ পড়া বাইরে নামাজ পড়ার চেয়ে উত্তম’ (আল মু’জামুল আওসাত ৯১০১)। হাদিসে আরও উল্লেখ রয়েছে, ‘নারীদের নামাজের উত্তম জায়গা হলো তাদের ঘরের নির্জন কোণে।’ (মুসনাদে আহমদ ২৬৫৪২)
নারীরা জুমার দিনে পুরুষদের সাওয়াব অর্জনে সহায়তা করবে। রাসুলুল্লাহ সা. বলেছেন, যে ব্যক্তি সৎপথের দিকে ডাকবে, সে তার অনুসারীর সমান সওয়াব পাবে এবং এর ফলে অনুসরণকারীর সওয়াব কমানো হবে না। অন্যদিকে, যে ব্যক্তি ভ্রষ্টতার দিকে ডাকবে, সে তার অনুসারীর সমান পাপে জর্জরিত হবে এবং অনুসারীর পাপের কোনো কমতি হবে না। (আবু দাউদ ৪৬০৯)
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন