প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা-বেইজিং সম্পর্কে নতুন মাত্রা দেয়ার লক্ষ্য নিয়ে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান চীনে তিন দিনের দ্বিপাক্ষিক সফরে আছেন। এটি তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর, যেখানে দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে বেইজিংকে বেছে নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর এই সফর ঘিরে দেশের কূটনৈতিক ও ব্যবসা-বাণিজ্য মহলে ব্যাপক আগ্রহ ও কৌতুহল সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রগুলো আভাস দিয়েছে, এই গুরুত্বপূর্ণ সফরে দুই দেশের মধ্যে শিল্পখাত ও মেগা অবকাঠামোসহ বহুমাত্রিক সহযোগিতার লক্ষ্যে ১৫টিরও বেশি চুক্তি ও সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হতে পারে।
চীনের রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল টাইমসের এক মতামত নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী শুক্রবার পর্যন্ত চীন সফর করবেন। এটি তার দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম বিদেশ সফর এবং দ্বিতীয় গন্তব্য হিসেবে চীনে এসেছেন।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমগুলো এ সফর নিয়ে ব্যাপক আশাবাদী। তাদের ধারণা, এ সফরে ১৫টির বেশি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি ও সমঝোতা সই হতে পারে, যার মধ্যে বড় অবকাঠামো ও শিল্প খাতের প্রকল্পও অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
চীন ও বাংলাদেশ দীর্ঘকাল ধরে একে-অপরের বন্ধু, প্রতিবেশী এবং কৌশলগত সহযোগী হিসেবে পরিচিত। কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার ৫০ বছরেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশ শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান ও পারস্পরিক সম্মান ও সমতার ভিত্তিতে সম্পর্ক বজায় রেখেছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রেও তারা একটি উদাহরণ তৈরি করেছে। রাজনৈতিক পর্যায়ে দুই দেশের মধ্যে নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ বিদ্যমান। ২০২৪ সালে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে ‘সমন্বিত কৌশলগত সহযোগিতা অংশীদারত্বে’ উন্নীত করা হয়েছে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে টানা ১৫ বছর ধরে চীন বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি, বাংলাদেশ থেকে চীনে রপ্তানি হওয়া শতভাগ শুল্কযোগ্য পণ্যে শূন্য শুল্ক সুবিধা প্রদানের মাধ্যমে সহকারিতার নজির স্থাপন করেছে বেইজিং।
অবকাঠামো উন্নয়নে দুই দেশের সহযোগিতা উল্লেখযোগ্য। পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্প বাংলাদেশে পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আঞ্চলিক পর্যায়ে চীন ও বাংলাদেশ শান্তি ও স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে একসঙ্গে কাজ করছে এবং রোহিঙ্গা সংকট মোকাবিলায়ও সহযোগিতা চালিয়ে যাচ্ছে। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভের আওতায় তাদের সহযোগিতা আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তুলতে সহায়তা করেছে। এছাড়া, দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের সঙ্গে দারিদ্র্য বিমোচন ও আঞ্চলিক সুশাসন নিয়ে বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মও গড়ে তোলার কাজ করেছে দুই দেশ।
তবে এসব সাফল্যের পরও দুই দেশের সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিতে কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। প্রথম চ্যালেঞ্জ হলো ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার প্রভাব। কিছু পরাশক্তি বাংলাদেশকে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা ও উন্নয়ন কাঠামোর মধ্যে টানার চেষ্টা করছে। এমনকি দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়েও হস্তক্ষেপ, অসম চুক্তির চাপ এবং ‘ঋণের ফাঁদ’ তত্ত্বের মতো ধারণা ব্যবহার করে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্ঠা চালানো হচ্ছে।
দ্বিতীয় চ্যালেঞ্জ হলো বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতির ধারাবাহিকতা। তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য। দক্ষিণ এশিয়ায় এখনও অনেকের মধ্যে চীন সম্পর্কে ধারণা সীমিত। বাংলাদেশের কিছু প্রভাবশালী মহল পশ্চিমা উন্নয়ন মডেলের প্রতি বেশি আস্থাশীল এবং চীনের উন্নয়নপথ ও শিল্প সহযোগিতার বিষয়ে সতর্ক অবস্থান গ্রহণ করছে।
অন্যদিকে, কিছু অভিজাত মহল চীনের উন্নয়ন মডেল ও সহযোগিতার সুবিধা স্বীকার করলেও যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমা দেশগুলোর প্রতিক্রিয়া নিয়ে উদ্বিগ্ন। একই সঙ্গে, দেশের কিছু আলোচনায় বাণিজ্য ঘাটতির জন্য শুধুমাত্র চীনা পণ্যের প্রবেশকে দায়ী করা হচ্ছে, অথচ রপ্তানি পণ্যের সীমিত বৈচিত্র্য ও সক্ষমতা সম্পর্কিত কাঠামোগত বিষয়গুলো উপেক্ষিত থাকে।
যাই হোক, এসব চ্যালেঞ্জ অতিক্রম করা অসম্ভব নয়। এজন্য উভয় পক্ষের আরও দূরদর্শিতা ও ধৈর্যের প্রয়োজন। বিশেষ করে, পারস্পরিক দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্য কমাতে খোলামেলা আলোচনা ও যোগাযোগ বৃদ্ধি করা জরুরি। একই সঙ্গে বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের প্রকৃত অর্থে ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতি অনুসরণের রাজনৈতিক সাহস দেখাতে হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এই সফর কতটা গভীর সহযোগিতা চান, তা দুই দেশ এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সামনে পরিষ্কার করে তুলে ধরবে।
বাংলাদেশি গণমাধ্যমে সফরটির যেসব গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে, তা থেকে বোঝা যায় যে দুই দেশ আরও ঘনিষ্ঠ অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতার দিকে এগোচ্ছে। প্রথমত, শিল্প খাতে সহযোগিতা বাড়বে। চীন দীর্ঘদিন ধরেই তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে উৎপাদন কেন্দ্র স্থাপনে উৎসাহিত করে আসছে। তুলনামূলক কম শ্রমব্যয়ের সুবিধা কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশে উচ্চমূল্যের পণ্য উৎপাদন করে রপ্তানির সুযোগ রয়েছে।
দ্বিতীয়ত, গ্লোবাল সাউথ এবং আঞ্চলিক পর্যায়ের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশ এশিয়ার শিল্প শৃঙ্খল ও বহুপক্ষীয় সহযোগিতা কাঠামোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত হতে পারবে। চীন-দক্ষিণ এশিয়া এক্সপো এবং চীন-পাকিস্তান-বাংলাদেশ ত্রিপক্ষীয় সহযোগিতা ব্যবস্থার মতো প্ল্যাটফর্ম এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করতে পারে।
সবশেষে, সুশাসন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে অভিজ্ঞতা বিনিময় বাড়ানোর প্রচেষ্টা শুরু হবে, যাতে বাংলাদেশ নিজস্ব বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ উন্নয়নপথ খুঁজে নিতে পারে। রাজনৈতিক দল, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে আরও জোরদার করা সম্ভব হবে।
উন্নয়নের কোনও একক মডেল নেই। পূর্ব ও পশ্চিম—উভয় অভিজ্ঞতার সমন্বয়ে নিজস্ব আধুনিকায়নের পথ অনুসরণ করার মতো সক্ষমতা ও সুযোগ বাংলাদেশের রয়েছে।
এই মতামত নিবন্ধটি গ্লোবাল টাইমসে লিখেছেন লিউ জোংই। তিনি সাংহাই ইনস্টিটিউটস ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ-এর সেন্টার ফর সাউথ এশিয়া স্টাডিজ-এর পরিচালক।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন