০৫:১২ এম
২৮ ফেব্রুয়ারী, ২০২৬: বিদেশি ঋণনির্ভর বড় অবকাঠামো প্রকল্পগুলো নিয়ে ক্রমাগত বিভিন্ন প্রশ্ন উঠছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়া, ব্যয় বৃদ্ধি, পরিচালনাগত জটিলতা এবং প্রত্যাশিত অর্থনৈতিক সুফল না পাওয়ার কারণে দেশের বৈদেশিক ঋণের চাপ নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন ও ঋণ ব্যবস্থাপনার এই সমীকরণ এখন নতুন সরকারের জন্য বড় পরীক্ষা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০০৯-১০ অর্থবছরে সরকারের বৈদেশিক ঋণ ছিল ২০ দশমিক ৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সেটি বেড়ে দাঁড়ায় ৬৮ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরের শেষে ঋণের পরিমাণ পৌঁছায় ৮০ দশমিক ১৯ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ এক দশকের কিছু বেশি সময়ে ঋণ প্রায় চার গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রশ্ন উঠছে, এই ঋণের বিপরীতে অর্থনীতিতে কতটা প্রত্যাবর্তন ঘটেছে।
বিমানবন্দরের টার্মিনাল, ব্যয় বৃদ্ধি, সুফল ঝুলে রইল। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর-এর তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্পকে দেশের অন্যতম বৃহত্তম অবকাঠামো বিনিয়োগ হিসেবে দেখা হয়েছিল। প্রাথমিকভাবে ১৩ হাজার ৬১০ কোটি ৪৭ লাখ টাকা ব্যয়ের কথা বলা হলেও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে তা সংশোধন করে ২১ হাজার ৩০৯ কোটি ৬ লাখ টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। প্রকল্প ব্যয়ের প্রায় ৭৫ শতাংশ দ্বিপক্ষীয় ঋণ থেকে এসেছে।
আরও পড়ুন: সারাদেশেই কিশোর গ্যাংয়ের মাধ্যমে বাড়ছে অপরাধ
২০১৯ সালের ২৮ ডিসেম্বর নির্মাণকাজ শুরু হয়। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর আংশিক উদ্বোধন হয়েছে। তবে ২০২৪ সালে পূর্ণাঙ্গ চালুর লক্ষ্য পূরণ হয়নি। ভূমিসেবা এবং পরিচালনগত জটিলতা প্রকল্পটিকে আটকে রেখেছে। এই সময়ে ঋণের সুদ নিয়মিত পরিশোধ করতে হয়েছে। মূল ঋণের অবকাশকালও কমে গেছে।
বিশ্বব্যাংক-এর ঢাকা কার্যালয়ের প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, "বিদেশি ঋণের সুদ অর্থ ছাড়ের দিন থেকেই গণনা শুরু হয়। অর্থাৎ প্রকল্প চালু হোক বা না হোক, সুদের ঘড়ি থেমে থাকে না।"
ঋণ পরিশোধের চাপে নতুন সমীকরণ। অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রায় ৫ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের পূর্বাভাস দিয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এই পরিমাণ ছিল ৪ দশমিক ০৮৬ বিলিয়ন ডলার। পরিশোধের এই ঊর্ধ্বগতি বাজেট ব্যবস্থাপনায় বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের মহাপরিচালক এ কে এম এমামুল হক বলেন, চলমান প্রকল্পগুলোর পূর্ণাঙ্গ দায় অনেক সময় পূর্বাভাসে প্রতিফলিত হয় না। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ঋণমান হ্রাসের বিষয়টি উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
আরও পড়ুন: ট্রেনে যোগ করা হবে বিপুলসংখ্যক বাড়তি বগি
৩০ জানুয়ারি প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখনো বৈদেশিক ও সামগ্রিক ঋণঝুঁকিতে মাঝারি পর্যায়ে রয়েছে, তবে বড় ধাক্কা সামাল দেওয়ার সক্ষমতা সীমিত। বিশ্লেষকদের মতে, এই সতর্কবার্তা ঋণ ব্যবস্থাপনায় আরও শৃঙ্খলা ও অগ্রাধিকার পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেয়।
বিদ্যুৎকেন্দ্র, সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও উৎপাদন কম। ২০১৪ সালে শুরু হওয়া মাতারবাড়ী ২ গুণ ৬০০ মেগাওয়াট কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে ৫৬ হাজার ৬৯৩ কোটি ৯০ লাখ টাকা। এর মধ্যে ৪৭ হাজার ৯৪৫ কোটি ৩ লাখ টাকা বিদেশি ঋণ। ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে চালু হলেও বয়লারের প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে উৎপাদন অর্ধেকে নেমে আসে।
ইন্ডিপেনডেন্ট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ তামিম বলেন, প্রত্যাশিত উৎপাদন না হওয়ায় সরকার ক্ষতির মুখে পড়ছে। সক্ষমতা ভাড়া বাবদ বছরে প্রায় ১ হাজার ১৬৯ কোটি টাকা অপারেশনাল ক্ষতির বিষয়টি উঠে এসেছে।
অন্যদিকে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পের ব্যয় ২৫ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বাড়ানোর পর মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৫ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে। সময়সীমা ২০২৬ থেকে ২০২৮ বছর পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। প্রয়োজনীয় সঞ্চালন লাইন না থাকার কারণে শুরুতে অর্ধেক সক্ষমতা ব্যবহারের সম্ভাবনার কথাও বলা হয়েছে।
আরও পড়ুন: হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে কমছে না যাত্রী হয়রানি ও অপরাধীদের দৌরাত্ম্য
অবকাঠামো আছে, ব্যবহারের সুযোগ কম। ঢাকা খুলনা রেললাইন প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের পর দাঁড়িয়েছে ৩৮ হাজার ৬২৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে ২১ হাজার ৩৬ কোটি টাকা বিদেশি ঋণ। সক্ষমতা থাকলেও বাংলাদেশ রেলওয়ে দিনে মাত্র দুই জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন পরিচালনা করছে। অবকাঠামো বিনিয়োগ এবং বাস্তব চাহিদার মধ্যে এই ব্যবধান এখন আলোচনা হচ্ছে।
গাজীপুর বিমানবন্দর বাস দ্রুত পরিবহন করিডর প্রকল্পেও ২ হাজার ৮০০ কোটির বেশি ব্যয় হয়েছে। নকশাগত ও ধারণাগত ত্রুটির কারণে প্রকল্পটি এখনো শেষ হয়নি। ভেঙে ফেলতে হলে আরও প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা লাগতে পারে বলে জানানো হয়েছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, উন্নয়ন প্রকল্পে ঋণ নেওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু সময়মতো বাস্তবায়ন, সঠিক নকশা, কার্যকর তদারকি এবং অর্থনৈতিক ফেরত নিশ্চিত না হলে ঋণ উন্নয়নের পরিবর্তে দায়ে পরিণত হয়।
নতুন সরকারের জন্য তাই চ্যালেঞ্জ হচ্ছে শুধু ঋণ পরিশোধ নয়, বরং প্রকল্প বাছাই, ব্যয় নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যবহারযোগ্যতা নিশ্চিত করা। অন্যথায় ঋণের অঙ্ক বৃদ্ধি পাবে, এবং অর্থনৈতিক চাপও দীর্ঘমেয়াদে বহুগুণে বেড়ে যাবে।
আরও পড়ুন: দুর্নীতির জালে জর্জরিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, প্রশ্নে উচ্চশিক্ষার মান
তালাশ বিডি/মিডিয়া লিঃ
সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন