প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সরকার র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব) বিলুপ্ত করে একটি নতুন বাহিনী গঠন করতে যাচ্ছে, যা হচ্ছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। এই লক্ষ্যে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর একটি খসড়া সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। জনসাধারণের জন্য এই বিষয়ে মতামত প্রদান করার সুযোগ রাখা হয়েছে।
সূত্রে জানা গেছে, খসড়াটির চূড়ান্ত উপস্থাপন শেষে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নিয়ে এটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপন করা হবে। মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলেই আইনটি জাতীয় সংসদে উত্থাপন করা হবে। নতুন আইন কার্যকর হলে র্যাব-সংক্রান্ত বিদ্যমান আইনি ভিত্তি বিলুপ্ত হবে। তবে নতুন বিধিমালা প্রণীত না হওয়া পর্যন্ত আগের কিছু বিধান কার্যকর থাকবে।
খসড়া আইনে র্যাবের বর্তমান কাঠামোকে আইনি ভিত্তি দেওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে বিশেষায়িত এটি ইউনিট গঠনের প্রস্তাব করা হয়েছে। পাশাপাশি, বাহিনীটির দায়িত্ব, অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা, মামলা তদন্ত, সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং নাগরিক অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য আলাদা কমিটি গঠনের বিধান যুক্ত করা হয়েছে।
নতুন ইউনিটের জন্য সরকার নির্ধারিত একটি প্রতীক (লোগো), পতাকা এবং সুনির্দিষ্ট পোশাক থাকবে, খসড়ার মধ্যে এটি উল্লেখ করা হয়েছে। খসড়া আইন অনুযায়ী, এসআরবি হবে বাংলাদেশ পুলিশের অধীনে একটি বিশেষায়িত ইউনিট। এই ইউনিটের নেতৃত্বে থাকবেন অতিরিক্ত আইজিপি পদমর্যাদার একজন মহাপরিচালক। প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যাটালিয়ন, কোম্পানি, প্লাটুন ও সেকশন গঠন করা যাবে।
বাহিনীর সদর দপ্তর থাকবে ঢাকায়, তবে দেশের যেকোনো স্থানে ইউনিট স্থাপনের সুযোগ রাখা হয়েছে। শুধু পুলিশ নয়, অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণে এনে এই ইউনিট গঠন করা যাবে। প্রয়োজন অনুযায়ী সদস্যদের নির্ধারিত শর্তাধীনে চাকরিতে প্রেষণে নিযুক্ত বা অস্থায়ীভাবে সংযুক্ত করা যাবে। প্রেষণে নিয়োগের মেয়াদ ন্যূনতম দুই বছর রাখতে হবে।
এই খসড়া আইনে দেখা যায়, ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসরণ করে এসআরবির সদস্যরা নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তার করতে পারবেন। মাদক, অস্ত্র, গোলাবারুদ, বিস্ফোরক, সন্ত্রাসী আস্তানা, মানবপাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, সাইবার অপরাধ এবং রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তাবিরোধী অপরাধের ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার ক্ষমতা থাকবে তাদের।
এছাড়া, আদালত, সরকার বা পুলিশ আইজিপির নির্দেশে ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত পরিচালনার সুযোগ রাখা হয়েছে। তদন্ত পরিচালনা করবেন অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তা এবং পুরো প্রক্রিয়ায় ফৌজদারি কার্যবিধি ও পুলিশ রেগুলেশন অনুসরণের বাধ্যবাধকতা থাকবে।
স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) হাজতখানা, মালখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ কক্ষ থাকবে, সুষ্ঠু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা অনুযায়ী। জব্দ মালামাল আদালতের আদেশমতে বা সরকারের বিধি মোতাবেক নিষ্পত্তি করতে হবে।
‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়ার একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন হলো অভিযোগ প্রতিকার কমিটি। র্যাবের বিরুদ্ধে অতীতে ওঠা নানা অভিযোগের প্রেক্ষাপটে নতুন বাহিনীর জবাবদিহি বাড়ানোর উদ্যোগ হিসেবে এটিকে দেখা হচ্ছে। অভিযোগ প্রতিকার কমিটির সভাপতি হবেন এসআরবির একজন অতিরিক্ত মহাপরিচালক। সদস্য হিসেবে থাকবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি, পুলিশ সদর দপ্তরের একজন কর্মকর্তা, পরিচালক (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) এবং মানবাধিকার, আইন বা বিচার প্রশাসনে অন্তত ১০ বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন সরকার মনোনীত একজন ব্যক্তি।
কমিটি নাগরিকদের অভিযোগ তদন্ত করতে পারবে। প্রয়োজনে আলাদা অনুসন্ধান দল গঠন করতে পারবে এবং অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করবে। বাহিনীর কার্যক্রমে অবৈধ প্রভাব, হয়রানি বা অনিয়মের অভিযোগেরও পর্যালোচনা করতে পারবে এই কমিটি।
অভিযোগ প্রতিকার কমিটি অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সুপারিশ প্রদান করতে পারবে। ইউনিটের কার্যক্রমে বিধিবহির্ভূত প্রভাব, পদোন্নতি, পদায়ন, বিভাগীয় শাস্তি, হয়রানি বা অন্যায় আচরণ সংক্রান্ত ক্ষোভ নিরসনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষে পরামর্শ দেওয়ার সুযোগ থাকবে।
অন্তত সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তারা গঠিত দল নিয়ে অভিযোগের তদন্ত পরিচালনা করবেন। ইউনিটের আইনানুগ কার্যক্রমে কোনো ব্যক্তি বা সত্তা বিধিবহির্ভূত এবং অযাচিত প্রভাব বিস্তার করলে এবং সেই অনুসন্ধানে প্রমাণিত হলে, ওই ব্যক্তি বা সত্তার বিরুদ্ধে দায়-দায়িত্ব নিরূপণপূর্বক ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে সুপারিশ করবে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি।
খসড়া আইনে নতুন বাহিনীর সদস্যদের শৃঙ্খলা এবং আচরণবিধি বিস্তারিতভাবে নির্ধারণ করা হয়েছে। সদস্যদের দায়িত্ব পালনকালে মাদকাসক্ত থাকা, ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্য করা, দায়িত্ব অবহেলা, বেআইনি অর্থ আদায়, সরকারি অস্ত্র কিংবা সরঞ্জামের অপব্যবহার, অপরাধীকে পালাতে সহায়তা করা এবং জুয়া ও অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার মতো অপরাধের জন্য বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে।
অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট সদস্যকে নিজ বাহিনীতে ফেরত পাঠিয়ে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের কথাও খসড়ায় বলা হয়েছে। আইনের খসড়া অনুযায়ী, এসআরবির সদস্য যদি শৃঙ্খলা লঙ্ঘন অথবা অন্য কোনো ফৌজদারি অপরাধ করে পালিয়ে যায়, তাহলে ব্যাটালিয়ন অধিনায়ক তাকে গ্রেফতার করে সংশ্লিষ্ট ব্যাটালিয়নে সোপর্দ করবেন।
পলাতক সদস্যের স্থায়ী অথবা বর্তমান বাসস্থান যে থানায় অবস্থিত, সেই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে অনুরোধ করবেন এবং থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ওই অনুরোধকে কোনো ম্যাজিস্ট্রেট জারি করা পরোয়ানা হিসেবে গণ্য করে পলাতক সদস্যকে ব্যাটালিয়নে সোপর্দ করবেন।
খসড়ায় উল্লেখ করা হয়েছে, নতুন আইন কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে র্যাবের সব সম্পদ, জনবল, তহবিল, দায়-দায়িত্ব, চলমান মামলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম এবং বিদ্যমান চুক্তি এসআরবির অধীনে স্থানান্তরিত হবে। নতুন বিধিমালা না হওয়া পর্যন্ত র্যাবের বিদ্যমান বিভাগীয় কার্যবিধি প্রয়োজনীয় অভিযোজনসহ কার্যকর থাকবে।
র্যাব প্রতিষ্ঠার পর বিভিন্ন সময় বাহিনীটির বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ দেশ-বিদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে। সেই প্রেক্ষাপটে সরকারের নতুন নামে বাহিনী গঠনের উদ্যোগকে একটি কাঠামোগত সংস্কার হিসেবে দেখা হচ্ছে।
যদিও বাহিনীর নাম ও সাংগঠনিক কাঠামোয় কিছু পরিবর্তন এসেছে, তবে অভিযান পরিচালনা, গ্রেফতার, তল্লাশি ও তদন্তের মৌলিক ক্ষমতার বড় অংশই বহাল রাখা হয়েছে। নতুন সংযোজন হিসেবে এসেছে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি এবং সদস্যদের জন্য আরও স্পষ্ট শৃঙ্খলা বিধি।
২০০৪ সালের ২৬ মার্চ র্যাব বা র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন গঠিত হয়েছিল। একই বছরের ১৪ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে কার্যক্রম শুরু করে বাহিনীটি। গত দুই দশকের বেশি সময় ধরে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাজ করছে র্যাব।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন