প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
গত পাঁচ দশকে (৫০ বছরে) রাজশাহীতে বর্ষা মৌসুমের বৃষ্টিপাত প্রায় ৩৪ শতাংশ কমে গেছে। একই সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে তাপমাত্রা। পাশাপাশি নিচে নেমে যাচ্ছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। বৃষ্টিপাত কমার ফলে দেশের অন্যতম খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চলে পানির সংকট আরও গভীর হচ্ছে এবং কৃষি, জীবিকা ও দীর্ঘমেয়াদি পানির নিরাপত্তা ক্রমেই বৃহৎ হুমকির মুখে পড়ছে বলে এক গবেষণায় উঠে এসেছে।
সম্প্রতি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ক্লিনার ওয়াটার এ প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, কমে আসা বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির অতিরিক্ত ব্যবহার এবং প্রাতিষ্ঠানিক অসহযোগিতার কারণে ২০৩২ সাল পর্যন্ত রাজশাহী অঞ্চলে মাঝারি থেকে তীব্র পানিসংকট অব্যাহত থাকতে পারে। এক্সট্রিম ক্লাইমেট এ্যান্ড হাইড্রোক্লাইম্যাট মডেলিং অফ ওয়াটার স্ট্রিচ: ভমপ্লেকিশন ফর লাইভহুডস ইন রাজশাহী, বাংলাদেশ শীর্ষক গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের একদল গবেষক। গবেষণায় স্যাটেলাইট চিত্র, আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, ভূগর্ভস্থ পানির উপাত্ত এবং রাজশাহীর ১৩টি উপজেলার ৩৮৫টি পরিবারের ওপর পরিচালিত মাঠ জরিপের তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে গড় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। কিন্তু ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ কয়েক দশকে বৃষ্টিপাত কমেছে প্রায় ৩৪ শতাংশ। প্রতি বছর গড়ে প্রায় ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত হ্রাস পাচ্ছে বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
গবেষকদের মতে, বরেন্দ্র অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার প্রবণতার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ক্রমবর্ধমান তাপমাত্রা ও চরম আবহাওয়া পরিস্থিতি। গবেষণার পূর্বাভাস অনুযায়ী, চলতি শতাব্দীর শেষভাগে রাজশাহীতে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কয়েক দফা ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করতে পারে। ২০৮৮ সালের মধ্যে তা ৪৭ দশমিক ১৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কাও রয়েছে।
এ ছাড়া বছরে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রা বিরাজ করার দিনের সংখ্যা ২০১৮ সালের ১৩ দিন থেকে বেড়ে ২০৭৮ সালে প্রায় ১৯৫ দিনে পৌঁছাতে পারে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়েছে।
বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া ও দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণ প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। এর ফলে সেচের জন্য পানির চাহিদা বাড়ছে এবং বিদ্যমান পানিসম্পদের ওপর চাপ আরও তীব্র হচ্ছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, গত ৩৫ বছরে রাজশাহীর ভূগর্ভস্থ পানির স্তর গড়ে ৩ দশমিক ৭৮ মিটার নিচে নেমে গেছে। ১৯৯০ সালে যেখানে ভূগর্ভস্থ পানির গড় গভীরতা ছিল ১১ দশমিক ৬৬ মিটার, ২০২৪ সালে তা বেড়ে হয়েছে ১৫ দশমিক ৪৪ মিটার। গবেষকদের ভাষ্য, বিশেষ করে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিএমডিএ) আওতাধীন এলাকায় কৃষিকাজে অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
গবেষণায় ব্যবহৃত আর্টিফিশিয়াল নিউরাল নেটওয়ার্কভিত্তিক পূর্বাভাস মডেল দেখিয়েছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৮ ও ২০৩২ সাল পর্যন্ত রাজশাহীর পানিসংকট মাঝারি থেকে তীব্র পর্যায়েই থাকবে।
মাঠ জরিপে অংশ নেওয়া মানুষের অভিজ্ঞতাও গবেষণার ফলাফলের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। জরিপে অংশ নেওয়া ৬১ শতাংশের বেশি উত্তরদাতা জানিয়েছেন, পানিসংকট তাদের আয় ও জীবিকাকে নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত করছে। ৯৫ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, দৈনন্দিন ব্যবহারের পানি সংগ্রহ ও নিশ্চিত করতে তাদের অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
জরিপে অংশ নেওয়া পরিবারগুলোর এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল। ফলে পানিসংকটের কারণে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে কৃষিখাত। একই সঙ্গে প্রায় ৭৩ শতাংশ মানুষ তাদের পানির চাহিদা পূরণে সম্পূর্ণভাবে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল বলে জানিয়েছেন।
জরিপে অংশ নেওয়া শতভাগ উত্তরদাতা বলেছেন, তারা ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ধারাবাহিকভাবে নিচে নেমে যেতে দেখছেন। দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ মনে করেন, জলবায়ু পরিবর্তন সরাসরি তাদের পানি প্রাপ্তির সুযোগ সীমিত করে দিচ্ছে। তবে সংকট বাড়লেও প্রায় ৭৮ শতাংশ মানুষ জানিয়েছেন, পানি ব্যবস্থাপনা বা সংকট মোকাবিলায় তারা কোনো ধরনের সরকারি বা প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা পাননি।
গবেষকরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত ও সমন্বিত পদক্ষেপ না নিলে রাজশাহীর পানির নিরাপত্তা আরও ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলাগুলোতে এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণের পাশাপাশি সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা সম্প্রসারণ, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, কৃত্রিমভাবে ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ, ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনে কঠোর নিয়ন্ত্রণ এবং খরা-সহনশীল ফসলের চাষ বাড়ানোর সুপারিশ করেছেন।
গবেষকদের মতে, পানি-নির্ভর ধান চাষের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো এবং কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হলে রাজশাহীর ক্রমবর্ধমান পানিসংকট মোকাবিলায় কার্যকর অগ্রগতি অর্জন করা সম্ভব হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন