প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সুদূর আফ্রিকার কৃষ্ণাঙ্গ বেলাল রা. কৃতদাস হিসেবে এসেছিলেন আরবের অত্যাচারী নেতা উমাইয়ার ঘরে। নবীজি সা. নবুয়ত লাভের পর আবু বকর রা. বেলাল রা. এর কাছে দাওয়াত পৌঁছালে, কাল বিলম্ব না করে বেলাল ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে চলে আসেন।
বেলাল রা. এর সাথে আবু বকরের আন্তঃসম্পর্ক উমাইয়াকে সন্দিহান করে তোলে। এক পর্যায়ে যখন উমাইয়া তার ইসলাম সম্পর্কে জানতে পারে, তখন তার উপর নেমে আসে বর্বর উমাইয়ার পাশবিক নির্যাতনের স্টিম রোলার!
কখনো দিনের প্রখর রোদে, মরুভূমির জলন্ত বালিতে শুইয়ে, কখনো পাথর চাপা দিয়ে, আবার কখনো গলায় রশি দিয়ে মক্কার অলিগলিতে হাঁটানোর মাধ্যমে তার উপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হতো! তখন তাকে বলা হতো, মুহাম্মদকে ছাড়ো, লাত-উজ্জাকে মানো। কিন্তু নবী প্রেমী, আল্লাহ প্রেমী বেলালের মুমুর্ষ কন্ঠে একটিমাত্র শব্দ উচ্চারিত হতো, "আহাদ, আহাদ!" নির্যাতনে মৃত্যুর দোয়ারে যাওয়ার সময়, বেলাল একটি বারও তার রবের নাম মুখে থেকে রাখতে পারেনি। তিনি তার নবী মুহাম্মদকে ভুলে যাননি।
বেলালের উপর এহেন বর্বরতা আবু বকরের কোমল হৃদয়ে তীব্র দাগ কাটলো। এসব দেখে নবীজীর এই মহান সহচর তার আবেগকে আর ধরে রাখতে পারেননি। পরক্ষণে তিনি উমাইয়াকে প্রস্তাব দিলেন বেলালকে কিনে নেওয়ার জন্য। দর কষাকষির মাধ্যমে আবু বকর রা. বেলালকে মুক্ত করলেন।
আজ বেলাল রা. স্বাধীন। আজ তাকে তপ্ত দুপুরে পাথর ফাটা বালিতে শুইয়ে রাখার কেউ নেই। আজ তার কোনো দুঃখ নেই, নেই কোনো বিয়োগ বেদনা। আছে শুধু নবীজীর পরম মমতা ও আবু বকরের অহর্নিশ ভালোবাসা। সেই পরম মমতা এবং অহর্নিশ ভালোবাসা বেলালকে নবী প্রেমে ডুবিয়ে রেখেছিল।
আজানের নির্দেশনা এসে পড়লে, বেলাল রা. হয়ে যান মুমিনদের নামাজে আহ্বানকারী মুয়াজ্জিন। নবীজি সা. এর নির্দেশে বেলাল আজান দিতেন। বেলালের আজানের সুর মুমিনদেরকে মুগ্ধ করতো। মদিনার অলিগলিতে তার সুরের মুর্ছনায় মাতোয়ারা হতো মুমিনদের ক্বলব।
মুমিনদের জীবনের সবচেয়ে কঠিনতম দিনটি এসে উপস্থিত হলো। সেদিন উমরের মতো শক্ত হৃদয়ের অধিকারী, যিনি কঠিন থেকে কঠিন মুহূর্তেও হিমালয়ের মতো অটল থাকেন, তিনি জ্ঞানশূন্য হয়ে মদিনার পথে পথে ঘুরছেন নবীজির ইন্তেকালের দিনে।
নবীজি ইন্তেকাল করলে, বেলাল নিজেকে ঠিক রাখতে পারেননি। তার মনে হল, যার জন্য তিনি এতদিন আজান দিতেন, যাকে ঘিরে তার সুরের মূর্ছনা—আজ তিনি নেই। এই আজান দিয়ে কী লাভ? যেন বেলালের এক মুহূর্তও থাকতে ইচ্ছে হচ্ছে না। নবীজির বিয়োগ বেদনায় মর্মাহত বেলাল, এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে মদিনা ছেড়ে সুদূর দামেস্কে পাড়ি জমালেন।
সেখানে অবস্থানরত তার প্রায় ছয় বছর কাটতে চললো। একদা, বেলাল স্বপ্নে দেখলেন, নবীজি তাকে বলছেন, "বেলাল, তোমার কি আমার কথা একটুও মনে পড়ছে না? তুমি কি আমাকে এভাবে ভুলে গেছো? তোমার কি মন চায় না আমার রওজায় এসে হাজিরা দাও?" সকালে ঘুম থেকে উঠেই বেলাল পুটলিটা কাঁধে নিয়ে মদিনার পথে বেরিয়ে পড়েন। নবীজির প্রেমে বিভোর বেলাল ফিরে আসেন সেই চিরচেনা মদিনায় রওজায়ে হাবিবে।
পরক্ষণে নামাজের সময় হলে, উপস্থিত লোকেরা তাকে আযান দিতে পীড়াপীড়ি শুরু করলো। কিন্তু নবীজির অনুপস্থিতিতে, বেলাল আযান দেবার পাত্র ছিলেন না। পরবর্তীতে উমর রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর অনুরোধে তিনি আযান দিতে শুরু করেন।
সেই আযান! সেই মধুময় সময়! রসুলুল্লাহর স্মৃতি! এগুলো সব একসাথে ভেসে আসা শুরু হলো মানুষের মনে। সব মানুষ মনে করলো, যেন নবীজি আবার ফিরে এসেছেন!
মদিনার ঘর থেকে লোকজন বেরিয়ে আসতে লাগলো। যখন হযরত বেলাল আযানে, "আশহাদু আন্না মুহাম্মদার রসুলুল্লাহ" বলতে গিয়ে প্রচণ্ড কান্নায় ভেঙে পড়লেন, তখন পুরো মদিনা জুড়ে হুঁ হুঁ কান্নার শব্দ ছাড়া আর কিছুই শোনা যায়নি! আমরা তো নিজেদের নবী প্রেমিক বলি, আমরা কি কখনো তার জন্য কান্না করেছি?
আচ্ছা, মনে করুন, শেষ কবে কেঁদেছিলেন? ঠিক কবে?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন