প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জুয়া নিষিদ্ধের অঙ্গীকার জেনেও হাউজি-লটারির আয়োজনের উদ্যোগ, এত সাহস কোথায় পেল চেম্বার অব কমার্স?
উপকূলীয় জেলা বরগুনায় শিল্প ও বাণিজ্য মেলার আয়োজনের নামে হাউজি ও পুরস্কারভিত্তিক লটারি কার্যক্রমের প্রস্তাব ঘিরে প্রশ্ন উঠেছে বরগুনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির বিরুদ্ধে। কুটিরশিল্পের প্রসার, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের বিকাশ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে মেলার আয়োজনের কথা বলা হলেও আবেদনপত্রে হাউজি, প্রবেশ টিকিটের বিপরীতে আকর্ষণীয় পুরস্কার, জেলার বিভিন্ন শহর ও গ্রামে টিকিট বিক্রি এবং স্থানীয় ডিসকেবলে প্রতিদিনের ড্র সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার উল্লেখ রয়েছে। এতে মেলার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও প্রস্তাবিত কার্যক্রমের আইনগত বৈধতা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বরগুনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সচিব মো. নাসির উদ্দিন স্বাক্ষরিত আবেদনটি জেলা প্রশাসকের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এতে আগামী ৫ নভেম্বর থেকে ৫ ডিসেম্বর ২০২৬ পর্যন্ত বরগুনার ভূতমারা দক্ষিণ মনসাতলী বালির মাঠে মাসব্যাপী শিল্প ও বাণিজ্য মেলা আয়োজনের অনুমতি চাওয়া হয়েছে।
আবেদনে দেশীয় কুটিরশিল্প ও পণ্যের দোকান, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের উদ্ভাবিত পণ্যের প্রদর্শনী এবং বিভিন্ন বিনোদনমূলক আয়োজনের পাশাপাশি হাউজির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে মেলায় প্রবেশের টিকিটের বিপরীতে আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়ার পরিকল্পনাও তুলে ধরা হয়েছে। অন্যদিকে, আবেদনপত্রে মেলা চলাকালে অবৈধ জুয়া থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার করা হয়েছে। ফলে একদিকে হাউজি ও পুরস্কারভিত্তিক টিকিটের পরিকল্পনা, অন্যদিকে অবৈধ জুয়া থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকার—এই দুইয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
মেলার প্রবেশ টিকিটের নামে গ্রামগঞ্জে লটারি বিক্রির পরিকল্পনা:
বরগুনা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির আবেদনে বলা হয়েছে, মেলায় প্রবেশের টিকিট বিক্রির জন্য জেলার বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি এবং বুথের ব্যবস্থা করা হবে। প্রতিটি টিকিটের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। একই সঙ্গে প্রবেশ টিকিটের বিপরীতে আকর্ষণীয় পুরস্কার দেওয়ার এবং স্থানীয় ডিসকেবলের মাধ্যমে প্রতিদিনের ড্র সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনার কথাও উল্লেখ রয়েছে।
এখানেই উঠেছে গুরুতর প্রশ্ন। মেলায় প্রবেশের টিকিট সাধারণত মেলার প্রবেশপথে বিক্রি করা হয়। কিন্তু সেই টিকিট জেলার বিভিন্ন শহর, গ্রাম ও হাটবাজারে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি এবং বুথের মাধ্যমে বিক্রির পরিকল্পনা কেন? মেলায় প্রবেশের টিকিটের সঙ্গে পুরস্কারের ড্র যুক্ত করে তা মেলার বাইরেও ছড়িয়ে দেওয়ার এই উদ্যোগ কি কেবল দর্শনার্থীদের প্রবেশের সুবিধার জন্য, নাকি এর মাধ্যমে পুরো জেলায় লটারি টিকিট বিক্রির কার্যক্রম পরিচালিত হবে?
প্রতিদিনের ড্র স্থানীয় ডিসকেবলে সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা বিষয়টিকে আরও গুরুত্বপূর্ণ করে তুলেছে। এর ফলে মানুষ শুধু মেলায় উপস্থিত হয়েই নয়, ঘরে বসেও লটারির ড্র দেখতে পারবেন। অর্থাৎ, আবেদনপত্রে বর্ণিত পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে টিকিট বিক্রি ও ড্র সম্প্রচারের কার্যক্রম মেলার মাঠের বাইরেও বিস্তৃত হবে। এতে সাধারণ মানুষকে আকর্ষণীয় পুরস্কারের আশায় টিকিট কিনতে উৎসাহিত করার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তাহলে প্রশ্ন হলো, মেলার প্রবেশ টিকিটের নামে জেলার শহর, গ্রাম ও হাটবাজারে টিকিট বিক্রি এবং প্রতিদিনের ড্র ডিসকেবলে সম্প্রচারের পরিকল্পনা আসলে কোন উদ্দেশ্যে? শিল্প ও বাণিজ্য মেলার মূল উদ্দেশ্যের সঙ্গে এই কার্যক্রমের সম্পর্ক কী, এবং এর আইনগত ভিত্তি কোথায়? বিষয়টি শুধু মেলার অনুমতির প্রশ্ন নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে টিকিট বিক্রির প্রকৃতি, পুরস্কারভিত্তিক ড্রয়ের বৈধতা এবং সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বার্থ।
প্রতিদিনের ড্র ঘরে বসে দেখার ব্যবস্থা, প্রশ্ন আইনগত বৈধতা নিয়ে,:
আবেদনপত্রে মেলার প্রবেশ টিকিটের বিপরীতে পুরস্কার দেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় ডিসকেবলের মাধ্যমে প্রতিদিনের ড্র সরাসরি সম্প্রচারের কথা উল্লেখ রয়েছে। অর্থাৎ, প্রস্তাবিত পরিকল্পনায় পুরস্কারের ড্র কেবল মেলার মাঠে সীমাবদ্ধ থাকবে না; সম্প্রচারের মাধ্যমে তা ঘরে বসে দেখার সুযোগও তৈরি হবে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, অর্থের বিনিময়ে টিকিট বিক্রি করে পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাটি কীভাবে পরিচালিত হবে, বিজয়ী নির্ধারণের পদ্ধতি কী হবে এবং এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা ও সম্প্রচারের আইনগত অনুমোদন রয়েছে কি না। সরাসরি সম্প্রচারের সঙ্গে যুক্ত পুরস্কারভিত্তিক টিকিট বিক্রির প্রকৃতি ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থাকায় বিষয়টি জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
মেলার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে শুধু আয়োজনের নাম বা আয়োজকদের অঙ্গীকার বিবেচনা করলেই হবে না; প্রস্তাবিত কার্যক্রমের বাস্তব ধরন, টিকিট বিক্রির পরিধি এবং পুরস্কার বিতরণের নিয়মও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ ও হাইকোর্টের রায়: অনুমতির আগে আইনি যাচাই জরুরি
জুয়া প্রতিরোধ আইন, ২০২৬ (২০২৬ সনের ৯৮ নং আইন) ১ জুলাই ২০২৬ থেকে কার্যকর হয়েছে। আইনের প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী, জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ততা এবং জুয়া পরিচালনা বা এ ধরনের কার্যক্রমের জন্য স্থান ব্যবহারের অনুমতি দেওয়ার বিষয়গুলো আইনগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। প্রস্তাবিত মেলায় হাউজি, পুরস্কারভিত্তিক টিকিট বিক্রি এবং ড্র সম্প্রচারের পরিকল্পনা থাকায় এসব কার্যক্রমের প্রকৃতি ও বৈধতা সংশ্লিষ্ট আইনের আলোকে বিবেচ্য।
এর আগে, বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের রিট পিটিশন নং ১৫০৯০/২০১৬-এর ১০ ফেব্রুয়ারি ২০২০ তারিখের রায়ে হাউজিসহ ভাগ্যনির্ভর বিভিন্ন খেলাসংক্রান্ত বিষয়ে আইনগত নির্দেশনা দেওয়া হয়। অর্থ বা মূল্যমানের বিনিময়ে ভাগ্যনির্ভর খেলায় অংশ নিয়ে পুরস্কার জেতার ব্যবস্থা জুয়ার আওতায় পড়তে পারে। তবে র্যাফেল ড্রয়ের ক্ষেত্রে আয়োজনের প্রকৃতি ও উদ্দেশ্য বিবেচ্য। পিকনিকের প্রবেশ টিকিটের সঙ্গে আনুষঙ্গিকভাবে দেওয়া কুপন কিংবা পণ্য কেনার সঙ্গে যুক্ত কিছু প্রচারমূলক কুপনের বিষয়ে রায়ে পৃথক ব্যাখ্যা রয়েছে।
এ কারণে হাউজি, র্যাফেল ড্র কিংবা লটারির নাম ব্যবহার করলেই কোনো আয়োজন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বৈধ হয়ে যায় না। বরগুনার প্রস্তাবিত মেলায় প্রবেশ টিকিট বিক্রি, পুরস্কারের জন্য ড্র এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় টিকিট বিক্রির পরিকল্পনার আইনগত বৈধতা প্রযোজ্য আইন ও আদালতের নির্দেশনার আলোকে বিবেচনা করা জরুরি।
আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রলোভনে আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা:
মোটরসাইকেল, স্বর্ণালংকার কিংবা গাড়ির মতো আকর্ষণীয় পুরস্কারের ঘোষণা সাধারণ মানুষকে টিকিট কিনতে উৎসাহিত করতে পারে। বিশেষ করে গ্রামগঞ্জ ও হাটবাজারে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি ও বুথের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি করা হলে সীমিত আয়ের মানুষও পুরস্কার জেতার আশায় একাধিক টিকিট কিনতে পারেন। এতে তাঁদের প্রয়োজনীয় ব্যয়ের অর্থ এ ধরনের টিকিটে খরচ হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রচারের মাধ্যমে ব্যাপক পরিসরে টিকিট বিক্রি করা হলে সাধারণ মানুষের মধ্যে পুরস্কার জেতার প্রত্যাশা তৈরি হতে পারে। কিন্তু পুরস্কার পাওয়ার নিশ্চয়তা না থাকায় টিকিট কেনার পেছনে ব্যয় করা অর্থ হারানোর ঝুঁকিও থেকে যায়। ফলে এ ধরনের আয়োজনের সামাজিক ও আর্থিক প্রভাব নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
বরগুনায় হাউজি-লটারি চান না স্থানীয়রা
স্থানীয় সচেতন মহলের একাংশের মতে, শিল্প ও বাণিজ্য মেলার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত স্থানীয় উদ্যোক্তাদের পণ্য প্রদর্শন, কুটিরশিল্পের প্রসার এবং বৈধ ব্যবসা-বাণিজ্যের সুযোগ সৃষ্টি করা। সেই আয়োজনের সঙ্গে হাউজি বা পুরস্কারভিত্তিক লটারি যুক্ত হলে মেলার মূল উদ্দেশ্য আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয়দের দাবি, বরগুনায় এমন আয়োজনের অনুমতি দেওয়ার আগে সাধারণ মানুষের আর্থিক স্বার্থ, সামাজিক প্রভাব এবং প্রযোজ্য আইন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। তাঁদের মতে, আকর্ষণীয় পুরস্কারের প্রচারের আড়ালে টিকিট বিক্রির বিস্তৃত কার্যক্রম পরিচালিত হলে সাধারণ মানুষ আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন।
জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন
প্রস্তাবিত মেলার আবেদনপত্রে হাউজি, জেলার বিভিন্ন শহর ও গ্রামে ভ্রাম্যমাণ গাড়ি ও বুথের মাধ্যমে টিকিট বিক্রি, টিকিটের বিপরীতে আকর্ষণীয় পুরস্কার এবং স্থানীয় ডিসকেবলে প্রতিদিনের ড্র সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা উল্লেখ রয়েছে। এসব তথ্য সামনে আসার পর মেলার অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
শিল্প ও বাণিজ্য মেলার নামে আবেদন করা হলেও এর সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি কার্যক্রমের প্রকৃতি ও আইনগত ভিত্তি বিবেচনা করা জরুরি। বিশেষ করে মেলার প্রবেশ টিকিট জেলার বিভিন্ন এলাকায় বিক্রি এবং প্রতিদিনের ড্র সম্প্রচারের পরিকল্পনা থাকায় টিকিট বিক্রির উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জেলা প্রশাসককে অবহিত করেছে নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটি
প্রস্তাবিত মেলায় হাউজি ও লটারিসংক্রান্ত কার্যক্রমের বিষয়ে বাংলাদেশ নাগরিক আইনগত সহায়তা কল্যাণ সোসাইটি জেলা প্রশাসককে বার্তার মাধ্যমে অবহিত করেছে বলে সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। সংগঠনটির বক্তব্য অনুযায়ী, আইনবিরোধী কোনো কার্যক্রমের অনুমতি দেওয়া হলে বিষয়টি আইনগতভাবে পর্যালোচনা করা এবং প্রয়োজন হলে উচ্চ আদালতের শরণাপন্ন হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হতে পারে।
জেলা প্রশাসকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি:
প্রস্তাবিত মেলায় হাউজি, পুরস্কারভিত্তিক টিকিট বিক্রি, জেলার বিভিন্ন এলাকায় টিকিট বিক্রি এবং স্থানীয় ডিসকেবলে ড্র সম্প্রচারের পরিকল্পনা সম্পর্কে জানতে বরগুনার জেলা প্রশাসকের সঙ্গে হোয়াটসঅ্যাপে যোগাযোগ করা হয়েছে। প্রতিবেদন তৈরির সময় পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বক্তব্য পাওয়া গেলে তা যথাযথভাবে প্রতিবেদনে যুক্ত করা হবে।
বরগুনার প্রস্তাবিত শিল্প ও বাণিজ্য মেলা ঘিরে এখন মূল প্রশ্ন, শিল্প ও বাণিজ্যের প্রসারের নামে হাউজি, পুরস্কারভিত্তিক টিকিট বিক্রি এবং জেলার বিভিন্ন এলাকায় ড্র সম্প্রচারের পরিকল্পনার আইনগত ভিত্তি কী? জুয়া থেকে বিরত থাকার অঙ্গীকারের পাশাপাশি আবেদনে হাউজি ও পুরস্কারভিত্তিক টিকিটের পরিকল্পনা উল্লেখ থাকায় চেম্বার অব কমার্সের উদ্যোগ এবং জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন