প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঝালকাঠি জেলার কাঁঠালিয়া উপজেলার ৬নং উত্তর-পূর্ব চেঁচরী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম প্রশাসনিক অব্যবস্থাপনা, শিক্ষকদের পাঠদানে অবহেলা এবং সরকারি স্কুল ফিডিং কর্মসূচির পুষ্টিকর খাবার বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়টির এই বেহাল দশার কারণে ক্ষুব্ধ স্থানীয় অভিভাবক ও এলাকাবাসী স্কুল প্রাঙ্গণে বিক্ষোভ করেছেন। শিক্ষার এই চরম অবক্ষয় রুখতে এবং দোষী শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
শ্রেণীকক্ষ ফাঁকা, অলস সময় পার শিক্ষকদের: বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে মোট ৬৩ জন শিক্ষার্থী নিবন্ধিত থাকলেও আজ ২১ সেপ্টেম্বর বিদ্যালয়ে উপস্থিত ছিল মাত্র ৭ জন শিশু। এর আগের দিনও উপস্থিতির সংখ্যা ছিল মাত্র ৩ জন। এলাকাবাসীর অভিযোগ, শিক্ষকদের দীর্ঘদিনের অনিয়মিত উপস্থিতি এবং ক্লাসে পাঠদানে চরম অবহেলার কারণে বিদ্যালয়টির সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থা সম্পূর্ণ ভেঙে পড়েছে। শিক্ষকরা নিয়মিত ক্লাস না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ ও হতাশ অভিভাবকরা তাদের সন্তানদের বিদ্যালয়ে পাঠানো প্রায় বন্ধ করে দিয়েছেন।
আজ সরেজমিনে বিদ্যালয়টিতে গিয়ে দেখা যায় এক নজিরবিহীন দৃশ্য। পুরো প্রাঙ্গণ ও শ্রেণীকক্ষ ফাঁকা পড়ে আছে। মাত্র ৭ জন শিশু বেঞ্চে বসে থাকলেও প্রধান শিক্ষক নিহার রঞ্জন হালদার, সহকারী শিক্ষিকা বিজলী রানী এবং সহকারী শিক্ষিকা মোসা. ইসরাত জাহান উপস্থিত থাকা সত্ত্বেও তাদের পড়ানোর কোনো উদ্যোগ নেননি। শিক্ষকরা ক্লাস না নিয়ে অলস সময় পার করছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান।
সংবাদকর্মীদের উপস্থিতি টের পেয়ে স্কুলের ছাত্র-ছাত্রী ও অভিভাবকরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, "স্কুলে আজ প্রধান শিক্ষকসহ তিনজন শিক্ষক উপস্থিত আছেন। অথচ ৬৩ জন ছাত্র-ছাত্রীর মধ্যে আজ আসছে মাত্র ৭ জন! শিক্ষকরা ঠিকমতো ক্লাস নেন না বলেই বাচ্চারা স্কুলে আসতে চায় না। আমরা এই অব্যবস্থাপনার দ্রুত প্রতিকার চাই।
"সরকারি পুষ্টিকর খাবারের ‘হরিলুট’: শিক্ষকদের এই দায়িত্বহীনতার পাশাপাশি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন স্কুল ফিডিং কর্মসূচির খাবার বিতরণ নিয়ে উঠেছে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, কোমলমতি শিশুদের পুষ্টির ঘাটতি পূরণ ও বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বাড়াতে সরকারের বরাদ্দকৃত উচ্চ প্রোটিনসমৃদ্ধ ফোর্টিফাইড বিস্কুট, সেদ্ধ ডিম, তরল ইউএইচটি দুধ, কলা ও পাউরুটি নিয়মিত শিক্ষার্থীদের দেওয়া হয় না। অনেক সময় এসব পুষ্টিকর খাবার বিদ্যালয়ে আসার পর তা কালোবাজারে বা বাইরে সরিয়ে ফেলা হয়। আবার কখনো কখনো অত্যন্ত নিম্নমানের, অস্বাস্থ্যকর ও মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার সরবরাহ করা হয় এবং বিতরণের ক্ষেত্রে চরম নয়ছয় করা হয়। ক্ষুব্ধ অভিভাবকেরা একে সরকারি বরাদ্দের "হরিলুট" বলে আখ্যা দিয়েছেন।
সহকারী শিক্ষকের বিরুদ্ধে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ: এদিকে, বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে এলাকায় প্রভাব বিস্তার এবং শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের অকথ্য ভাষায় গালাগাল ও অপমান-অপদস্থ করার অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের জমিদাতা পরিবারের সদস্য শুশান্ত কুমার মিস্ত্রি বলেন, "আমার বাবা এই বিদ্যালয়ের জন্য জমি দিয়েছেন। কিন্তু সহকারী শিক্ষক নাছির উদ্দিন আমাকে নানাভাবে অপমান-অপদস্থ করেছেন। বিদ্যালয়ের শিক্ষার মান বর্তমানে তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বাধ্য হয়ে আমি আমার ছেলেকে অন্য বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়েছি।" এই শিক্ষকের ভয়ে অনেক অভিভাবক তাদের সন্তানদের অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
অভিযুক্তদের বক্তব্য: অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক নাছির উদ্দিন তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে একে ‘ষড়যন্ত্র’ বলে দাবি করেন। অন্যদিকে, সার্বিক অনিয়ম ও পুষ্টিকর খাবার বিতরণের দুর্নীতি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে প্রধান শিক্ষক নিহার রঞ্জন হালদার বলেন, "যাতায়াতের রাস্তা খারাপ হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীরা সময়মতো আসতে পারে না। আর এত কম শিক্ষার্থী নিয়ে স্বাভাবিকভাবে ক্লাস পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে আমরা শিক্ষার্থীদের অবহেলা করছি না।" স্কুল ফিডিংয়ের পুষ্টিসমৃদ্ধ বিস্কুট ও অন্যান্য খাবার বিতরণের বিষয়ে তিনি দাবি করেন, রাস্তা খারাপ হওয়ায় খাবার স্টকে রেখে পরের দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতির ওপর ভিত্তি করে তা সমন্বয় করে বিতরণ করা হয়। তবে সহকারী শিক্ষক নাছির উদ্দিনের বিরুদ্ধে ওঠা ব্যক্তিগত অভিযোগের বিষয়ে তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
প্রশাসনের বক্তব্য: এ বিষয়ে কাঁঠালিয়া উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা কিং ফয়সাল জানান, বিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা কমিটি নিয়ে একটি পক্ষ-বিপক্ষের সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি সঠিকভাবে সমাধানের চেষ্টা চলছে। তবে অনিয়মের বিষয়ে এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাননি। লিখিত অভিযোগ পেলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা করা হবে।
স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, প্রত্যন্ত অঞ্চলের এই বিদ্যালয়টির শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং সরকারি বিস্কুট, ডিম ও দুধ চুরির সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে উপজেলা প্রশাসন ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষ থেকে দ্রুত একটি উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন এবং আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন