প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ঢাকা, ৯ অক্টোবর, ২০২৬ : দক্ষিণ আফ্রিকার প্রখ্যাত মানবাধিকার কর্মী ও সাবেক আন্তর্জাতিক বিচারক নাভানেথেম "নাভি" পিল্লাই ২০২৬ সালের নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেছেন। আন্তর্জাতিক আইন এবং বিশ্বব্যাপী ন্যায়বিচার ব্যবস্থাকে শক্তিশালীকরণ এবং সংঘাত নিরসনে অসামান্য অবদানের জন্য এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
নরওয়ের ওসলোতে নরওয়েজিয়ান নোবেল ইনস্টিটিউটে আজ এক সংবাদ সম্মেলনে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়র্গেন ভাতনে ফ্রাইদনেস আনুষ্ঠানিকভাবে এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার বিজয়ীর নাম ঘোষণা করেন।
পুরস্কার ঘোষণার সময় নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির পক্ষ থেকে একটি বিস্তারিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। এতে বর্তমান উত্তাল বৈশি^ক পরিস্থিতিতে এই পুরস্কারের যৌক্তিকতা এবং প্রেক্ষাপট অত্যন্ত জোরালোভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নোবেল কমিটি সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বর্তমান বিশ্বের এক গভীর অস্তিত্ব সংকটের কথা উল্লেখ করে জানায়, বিশ্ব এখন দীর্ঘ সময়ের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যুদ্ধ ও সংঘাত প্রত্যক্ষ করছে। এমন একটি সন্ধিক্ষণে আন্তর্জাতিক আইন কেবল শান্তি ও নিরাপত্তার সহায়ক নয়, বরং এটি একটি পরম অপরিহার্য বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলা হয়, 'বর্তমানে আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা প্রচণ্ড চাপের মধ্যে রয়েছে এবং এর প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হচ্ছে। আমরা আইনি কাঠামো এবং আইন ও বিচারের প্রতি বৈশ্বিক সম্মান প্রদর্শনের চেয়ে 'ক্ষমতার রাজনীতি'র দিকে একটি বিপজ্জনক রূপান্তর লক্ষ্য করছি। যখনই ন্যায়ের ওপর পেশিশক্তির জয় হয়, তখনই তা বৈশ্বিক স্থিতিশীলতা, পারস্পরিক বিশ্বাস এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে ধ্বংস করে দেয়।'
বিজ্ঞপ্তিতে ৮৫ বছর বয়সী এই দক্ষিণ আফ্রিকান জুরিস্টের সুদীর্ঘ ক্যারিয়ারের প্রশংসা করে তাঁকে এই সময়ের আন্তর্জাতিক আইনি নীতির অন্যতম সেরা ও সাহসী রক্ষক হিসেবে অভিহিত করে বলা হয়, 'নাভি পিল্লাই এমন একজন মানুষ, যিনি অসাধারণ সাহসিকতা ও সততার সাথে একটি আরও ব্যাপক বৈশ্বিক আইনি ব্যবস্থার পথ দেখিয়েছেন। সর্বজনীন আইনি নীতির প্রতি তাঁর আজীবন প্রতিশ্রুতি এবং দৃঢ় নৈতিক কম্পাস তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রকাশ পেয়েছে।'
কমিটি আরও উল্লেখ করে, বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা নেলসন ম্যান্ডেলার পক্ষে কাজ করা থেকে শুরু করে আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক হিসেবে নাভি পিল্লাই দেখিয়েছেন কীভাবে আইনি পদক্ষেপের মাধ্যমে যুদ্ধ ও সহিংসতার রূপ প্রতিরোধ করা সম্ভব। তিনি যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যা প্রসেকিউশনের আওতায় আনতে অবিকল্প ভূমিকা রেখেছেন।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি বলেছে, ২০২৬ সালের এই নোবেল শান্তি পুরস্কারটি সরাসরি আলফ্রেড নোবেলের উইলের মূল ভাবনার সাথে মিলে যায়। আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল ও আইনি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালীকরণের মাধ্যমে নাভি পিল্লাই জাতিগুলোর মধ্যে সৌহার্দ্য জোরদার করেছেন এবং আধুনিক যুগের শান্তি প্রক্রিয়াকে একটি সুনির্দিষ্ট ও কার্যকর রূপ দিয়েছেন।
নোবেল শান্তি পুরস্কারের অর্থমূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১ কোটি ২০ লাখ (১২ মিলিয়ন) সুইডিশ ক্রোনা। বিজয়ী নাভি পিল্লাই পুরস্কার হিসেবে এই বিপুল অর্থের পাশাপাশি একটি অনন্য নকশার স্বর্ণপদক এবং প্রশংসাপত্র (ডিপ্লোমা) পাবেন।
১৯০১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত নোবেল শান্তি পুরস্কার মোট ১০৭ বার ঘোষণা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত মোট ১১৩ জন ব্যক্তি এবং ৩১টি সংস্থা বা সংস্থাগত অবদান এই মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কারে ভূষিত হয়েছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়সহ নোবেল শান্তি পুরস্কার ইতিহাসের মোট ১৯ বার কোনো ব্যক্তি বা সংস্থাকে দেওয়া সম্ভব হয়নি। রেড ক্রসের প্রতিষ্ঠাতা সুইজারল্যান্ডের জঁ অঁরি দ্যুনাঁ এবং ফ্রেঞ্চ পিস সোসাইটির প্রতিষ্ঠাতা ফ্রান্সের ফ্রেডেরিক পাসি যৌথভাবে ইতিহাসের প্রথম নোবেল শান্তি পুরস্কার লাভ করেন।
নোবেলের পুরো ইতিহাসেই সবচেয়ে কম বয়সে শান্তি পুরস্কার পাওয়ার বিশ্বরেকর্ড পাকিস্তানের শিক্ষা আন্দোলনকর্মী মালালা ইউসুফজাই-এর (১৪ সালে ১৭ বছর বয়সে)। আর প্রবীণতম বিজয়ী হলেন পোলিশ-ব্রিটিশ পদার্থবিদ জোসেফ রটব্লাট (৯৫ সালে ৮৬ বছর বয়সে)। নোবেল শান্তি পুরস্কারের ইতিহাসে এ পর্যন্ত মোট ২১ জন নারী এই পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন এবং ১৯০৫ সালে অস্ট্রিয়ান লেখিকা বার্থা ফন সাটনার প্রথম নারী হিসেবে এই পুরস্কার পান।
ইতিহাসের এক অনন্য ট্র্যাজেডি হলো অহিংস আন্দোলনের অবিসংবাদিত নেতা মহাত্মা গান্ধী ৫ বার মনোনীত হওয়া সত্ত্বেও নোবেল পাননি। ১৯৪৮ সালে তাঁকে চূড়ান্ত পুরস্কার দেওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে তিনি আততায়ীর গুলিতে নিহত হওয়ায় নোবেল কমিটি সে বছর কোনো শান্তি পুরস্কারই ঘোষণা করেনি।
রীতি অনুযায়ী, আগামী ১০ ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুবার্ষিকীতে নরওয়ের ওসলোতে জমকালো অনুষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২৬ সালের এই নতুন নোবেলজয়ীর হাতে শান্তি পুরস্কারের মেডেল ও অর্থ তুলে দেওয়া হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন