প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরবের মধ্যে স্বাক্ষরিত বেসামরিক পারমাণবিক চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় গভীর আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটন এবং রিয়াদের এই সমঝোতা আপাতদৃষ্টিতে বেসামরিক ব্যবহারের জন্য হলেও এটি রিয়াদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে শেষ পর্যন্ত সামরিক মোড় দেবে কি না, এই প্রশ্নটি আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে তুমুল বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ইতিপূর্বে স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, রিয়াদ নিজের থেকে পারমাণবিক বোমা বানাতে চায় না, তবে যদি ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করে, তবে সৌদি আরবও দ্রুত সেই পথেই হাঁটবে। বর্তমানের চরম উত্তেজনাপূর্ণ নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই পারমাণবিক চুক্তির অনুমোদন যুবরাজের ওই পুরনো বক্তব্যকে বাস্তবায়নের কাছাকাছি নিয়ে যাচ্ছে।
বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি বেশ নাজুক অবস্থায় রয়েছে। ইরান এবং মার্কিন-ইসরায়েল শিবিরের মধ্যে চলমান সংঘাতের রেশ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো অঞ্চলে। কুয়েত, বাহরাইন, কাতার এবং ওমানের মতো উপসাগরীয় দেশগুলোতে ইরানি হামলা ও পাল্টা হামলার কারণে আঞ্চলিক সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়েছে, যা সৌদি আরবকে সরাসরি সংঘাতের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে ফেলেছে।
এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির মধ্যে ওয়াশিংটন এবং রিয়াদের মধ্যে ৩০ বছর মেয়াদি এই চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হলো। চুক্তির আওতায় সৌদি আরব ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্ল্যান্ট স্থাপন করতে পারছে এবং ব্যবহৃত পারমাণবিক বর্জ্য প্রক্রিয়াজাতকরণের ক্ষমতা পাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সুযোগটাই ভবিষ্যতে রিয়াদকে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির দিকে এক ধাপ এগিয়ে দেবে।
এই চুক্তিটি ২০০৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাতের 'গোল্ড স্ট্যান্ডার্ড' চুক্তির থেকে অনেকটাই ভিন্ন। আমিরাত স্বেচ্ছায় ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের সুবিধা ত্যাগ করে কেবল আমদানিকৃত ইউরেনিয়াম ব্যবহার করার শর্ত মেনে নিয়েছিল। অন্যদিকে, সৌদি আরব এমন কোনো কঠোর বিধিনিষেধ মেনে নিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে নিজেদের ভূখণ্ডেই সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ পর্যন্ত বেসামরিক ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের অধিকার জোরদার করেছে।
যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের পক্ষ থেকে রিয়াদের অভ্যন্তরীণ ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণে কিছু কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) কঠোর পরিদর্শন প্রটোকল বজায় রাখার তাগিদ দেওয়া হয়েছে, তবুও এতে রিয়াদকে থামানোর সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিকে সামরিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার ইতিহাস বিশ্বে বিরল নয়; ১৯৭১ সালে ভারতের স্মাইলিং বুদ্ধ পরীক্ষার কথা এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ হিসেবে দেখা যায়।
ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক গণনায় চীনের প্রভাব ঠেকানো একটি বড় অগ্রাধিকার। যুক্তরাষ্ট্র যদি পারমাণবিক প্রযুক্তির বিনিময়ে আব্রাহাম অ্যাকর্ড মেনে নেওয়ার মতো শর্ত জুড়ে দেয়, তবুও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে কোনো পক্ষই এই দীর্ঘমেয়াদী চুক্তি পুরোপুরি বাতিল করবে না। কারণ ওয়াশিংটন জানে, তারা পিছিয়ে গেলে রিয়াদ পারমাণবিক প্রযুক্তির জন্য চীন বা রাশিয়ার দ্বারস্থ হতে বাধ্য হবে।
রিয়াদের পারমাণবিক সোপানে পা রাখার এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যকে একটি মারাত্মক পারমাণবিক প্রতিযোগিতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একদিকে ইরানের নতুন শীর্ষ নেতৃত্ব এবং রেভল্যুশনারি গার্ডের শক্ত অবস্থান, অন্যদিকে তুরস্ক ও মিসরের মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নিজস্ব পারমাণবিক দূরদর্শিতা; সব মিলিয়ে পরমাণু অপ্রসার চুক্তি (এনপিটি) এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন