প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
২০২৪ সালের জুলাইয়ে, দীর্ঘকালীন রাজনৈতিক অস্থিরতার অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি নিয়ে ক্ষমতায় এসেছিলেন যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর, একের পর এক নীতিগত অবস্থান পরিবর্তন ও বিভিন্ন বিতর্কে জড়িয়ে, তিনি ভোটারদের ক্ষোভের মুখে পড়েছেন।
লন্ডন থেকে এএফপি জানাচ্ছে, স্টারমার বর্তমানে জনপ্রিয় দলীয় নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যামের সম্ভাব্য নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। গ্রেটার ম্যানচেস্টরের মেয়র বার্নহ্যাম এর আগে উত্তর-পশ্চিম ইংল্যান্ডের একটি উপনির্বাচনে নিরঙ্কুশ জয় পাওয়ার পর, তার নেতৃত্বে চ্যালেঞ্জ আসতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
২০২৪ সালের ৫ জুলাই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে প্রথম ভাষণে, স্টারমার ‘সেবামূলক’ সরকারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। তিনি বলেছিলেন যে, ১৪ বছরের রক্ষণশীল শাসন, ব্রেক্সিট এবং দলীয় কোন্দলে জর্জরিত রাজনীতির পর, তার সরকার মানুষের জীবনে ‘কম হস্তক্ষেপকারী’ হবে।
সাবেক রক্ষণশীল প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসন ও লিজ ট্রাসের আদর্শিক ও আক্রমণাত্মক রাজনীতির বিপরীতে, তিনি নিজেকে বাস্তববাদী ও প্রশাসনিক দক্ষতায় সমন্বিত নেতা হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছিলেন।
সাংবাদিক প্যাট্রিক ম্যাগুয়ের এবং গ্যাব্রিয়েল প্রোগরুন্ডের লেখা গেট ইন বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, স্টারমার একবার বলেছেন, 'স্টারমারবাদ বলে কিছু নেই, ভবিষ্যতেও থাকবে না।'
কিন্তু ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করার পর, তিনি যে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য নেতৃত্বের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, তা ধরে রাখতে তিনি হিমশিম খেতে শুরু করেন। পাশাপাশি, সুস্পষ্ট আদর্শিক অবস্থান ও ব্যক্তিগত আকর্ষণের অভাবের কারণে, জনগণকে তিনি জানাতে পারেননি, তিনি দেশকে কোথায় নিয়ে যেতে চান।
শুক্রবার তিনি বলেন, 'এখনো অনেক কাজ বাকি রয়েছে এবং আমি সেদিকেই মনোযোগ দিচ্ছি।' এদিকে লেবার পার্টির প্রায় ৪০০ এমপির একটি অংশ তাকে পদত্যাগের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে বার্নহ্যাম কিংবা অন্য কোনো প্রতিদ্বন্দ্বীর সঙ্গে একটি তিক্ত নেতৃত্ব প্রতিযোগিতা এড়ানো যায়।
রাজনীতিতে প্রবেশের আগে সফল পেশাজীবন কাটানো স্টারমার ১৯৬২ সালের ২ সেপ্টেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। তিনি লন্ডনের উপকণ্ঠের একটি ছোট সেমি-ডিট্যাচড বাড়িতে বেড়ে ওঠেন। তার মা দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থ ছিলেন এবং তার বাবা আবেগগতভাবে ছিলেন খুবই দূরে, তবুও তিনি ছিলেন প্রাণীপ্রেমী; গাধা উদ্ধার করতেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করার পর, তিনি মানবাধিকার আইনজীবী হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করেন, পরে প্রধান সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে সফলতা অর্জন করেন। তার এ অবদানের জন্য তৎকালীন রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ তাকে ‘নাইট’ উপাধিতে ভূষিত করেন।
বংশীবাদনপ্রেমী ও আর্সেনাল ফুটবল ক্লাবের সমর্থক স্টারমার ২০১৫ সালে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। ২০২০ সালে তিনি বামপন্থী নেতা জেরেমি করবিনের স্থলাভিষিক্ত হয়ে লেবার পার্টির নেতৃত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে দলটি ১৯৩৫ সালের পর সবচেয়ে খারাপ নির্বাচনী পরাজয়ের মুখে পড়েছিল।
দলের স্বার্থে তিনি ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেন, করবিনকে কার্যত দল থেকে সরিয়ে দেন এবং লেবারকে মধ্যপন্থায় ফিরিয়ে আনার মাধ্যমে, দুই দশক ধরে চলা দলের জন্য সবচেয়ে বড় নির্বাচনী জয় এনে দেন।
প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পর স্টারমার অর্থনৈতিক স্থবিরতা, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং রক্ষণশীল সরকারের কৃচ্ছ্রসাধন নীতির কারণে দুর্বল হয়ে পড়া জনসেবামূলক খাতগুলো সংস্কারের অঙ্গীকার করেছিলেন। তবে তিনি সতর্ক করে দিয়েছিলেন যে, পুনরুদ্ধারের পথ হবে ‘দীর্ঘ ও কঠিন’।
স্টারমারের শাসনের শুরু থেকেই তার সরকার লাখো প্রবীণ নাগরিকের শীতকালীন জ্বালানি ভাতা বন্ধের ঘোষণা দেয়, যা ছিল না লেবারের নির্বাচনী ইশতেহারে। ব্যাপক সমালোচনার মুখে পরে সরকার এ সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসে।
তাছাড়া কল্যাণ ভাতা সংস্কার, কৃষকদের উত্তরাধিকার কর, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ওপর বেতনভিত্তিক কর এবং ন্যূনতম মজুরি বৃদ্ধি নিয়েও তিনি পিছু হটতে বাধ্য হন।
ক্ষমতার প্রথম কয়েক মাসে 'বিনামূল্যে উপহার' গ্রহণসংক্রান্ত বিতর্কেও তিনি সমালোচিত হন। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে সম্পত্তি কর কম দেওয়ার অভিযোগে উপপ্রধানমন্ত্রী অ্যাঞ্জেলা রেইনার পদত্যাগ করেন।
একই মাসে মার্কিন যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের অভিযোগে ওয়াশিংটনের যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত পিটার ম্যান্ডেলসনকে বরখাস্ত করেন স্টারমার।
এ নিয়োগের জন্য পরে তাকে ক্ষমা চাইতে হয়। ঘটনাটি তার দুই ঘনিষ্ঠ সহযোগী এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চ পর্যায়ের এক কর্মকর্তার বিদায়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
স্টারমার নিজে পদত্যাগের আবেদন অস্বীকার করেছেন। তবে এ কেলেঙ্কারি এবং গত মে মাসের স্থানীয় নির্বাচনের হতাশাজনক ফলাফল তার ওপর চাপ আরও বাড়িয়েছে।
বার্নহ্যামের চ্যালেঞ্জের মধ্যে রয়েছে, ইরান যুদ্ধের বিষয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিরোধিতা ও ইউক্রেনের পক্ষে ইউরোপীয় সমর্থন ধরে রাখা সম্পর্কে প্রশংসিত হলেও, দেশে বামপন্থী গ্রিন পার্টি এবং কট্টর ডানপন্থী সংস্কারবাদী দল রিফর্ম ইউকের উত্থান ঠেকাতে স্টারমার ব্যর্থ হন।
নাইজেল ফারাজের নেতৃত্বাধীন রিফর্ম ইউকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে উত্তর ইংল্যান্ডে উপনির্বাচনে বড় জয় পাওয়ার পর, জনপ্রিয় লেবার নেতা অ্যান্ডি বার্নহ্যাম নেতৃত্ব চ্যালেঞ্জ জানাতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
জনমত জরিপ সংস্থা ইউগভের সাম্প্রতিক জরিপ অনুযায়ী, স্টারমারের জনপ্রিয়তার হার মাত্র ১৯ শতাংশ, যা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর ইতিহাসে সর্বনিম্ন হারগুলোর একটি।
শুক্রবার তিনি বলেন, নেতা হিসেবে তিনি 'পালিয়ে যাবেন না' এবং নেতৃত্বের লড়াই হলে তাতে অংশ নেবেন। তবে তিনি মনে করেন, এমন প্রতিযোগিতা দেশকে 'বিশৃঙ্খলার' দিকে ঠেলে দেবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন