প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
বিদ্যুৎ অপচয় রোধ এবং বিল ব্যবস্থাপনা সহজ করার বড় প্রতিশ্রুতি সহকারে দেশে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার চালু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তবে, গ্রাহকের সুবিধা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এই আধুনিক উদ্যোগ বর্তমানে সাধারণ এবং আবাসিক গ্রাহকদের জন্য এক ভীষণ বিড়ম্বনা এবং দীর্ঘশ্বাসের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ বিলের নানা অব্যবস্থাপনা, অনিয়ম এবং গ্রাহক ভোগান্তি রোধ করার জন্য প্রিপেইড বা ডিজিটাল মিটার বসানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই উদ্যোগ এখন ‘ডিজিটাল বিড়ম্বনা’ হিসেবেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।
প্রথাগত পোস্টপেইড মিটার ব্যবহারকারীরা বিল পরিশোধ করতে দেরি করলেও বিদ্যুৎ সংযোগ সঙ্গে সঙ্গে বিচ্ছিন্ন করা হচ্ছে না। কিন্তু প্রিপেইড মিটারের ক্ষেত্রে চিত্রটি সম্পূর্ণ ভিন্ন। বর্তমানে বিপিডিবি, ডিপিডিসি, ডেসকো, নেসকোসহ বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানি প্রিপেইড মিটারের মাধ্যমে সেবা প্রদান করছে। তবে, এসব মিটার রিচার্জ করার প্রক্রিয়া দাম সমন্বয়ের জাঁতাকলে শত শত ডিজিটের টোকেন নাম্বার গ্রাহকদের জন্য মানসিক যন্ত্রণার কারণ হচ্ছে।
বাসাবো এলাকার বাসিন্দা আব্দুর রব শুক্রবার (৫ জুন) বিকেলে বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা রিচার্জ করার পর টোকেন নম্বর দেখে হতবাক হন। সাধারণত ১৬ থেকে ৪৮ ডিজিটের টোকেন নম্বর আসলেও, আজ তার মোবাইলে ১৮০ ডিজিটের টোকেন নম্বর এসেছে! সতর্কতার কারণে তিনি মিটারের কাছে যেতে ভয় পান এবং এই বিশাল নম্বরটি সঠিকভাবে প্রবেশ করাতে না পেরে অবশেষে হতাশ হয়ে পড়েন।
ডিপিডিসির কাস্টমার কেয়ারের (১৬১১৬) সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানায়, “সব সময় এমন দীর্ঘ টোকেন আসে না। মূলত বিদ্যুতের নতুন দাম বা ট্যারিফ সমন্বয় করতে গিয়েই সিস্টেমে সাময়িক সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। খুব দ্রুতই এর সমাধান হবে।”
মিরপুরের বাসিন্দা অ্যাডভোকেট নাহিদ শাহিন অভিযোগ করেছেন যে, তার বাসায় ডেসকোর প্রিপেইড মিটার বসানো হয়েছে, কিন্তু সেখানে বিভিন্ন অসন্তোষের পাশাপাশি সম্প্রতি ভৌতিকভাবে অতিরিক্ত টাকা কেটে নেওয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, “মাত্র এক-দুই দিনের জন্য মিটার রিচার্জ করতে ভুললে কোনও পূর্ব সতর্কবার্তা ছাড়াই ঘরের বাতি নিভে যায়।”
অনেকে অভিযোগ করেন যে, অনেক মিটারে ব্যালেন্স শেষ হওয়ার আগে লাল বাতি জ্বলা বা অ্যালার্ম দেওয়ার ব্যবস্থা থাকলেও, বহুতল ভবনের নিচে বা সুবিধাজনক স্থানে মিটার না থাকার কারণে তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হয় না।
প্রিপেইড মিটারের ভেতরে থাকা ছোট ব্যাটারির নিয়েও আবাসিক ব্যবহারকারীদের ভোগান্তির কমতি নেই। সাধারণত লোডশেডিং বা বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় এই ব্যাটারিটি মিটারে পাওয়ার সাপ্লাই দেয়, কিন্তু এর চার্জ কমে গেলে তা স্বয়ংক্রিয়ভাবে পুরো বাড়ির বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ করে দেয়।
অনেকে জানিয়েছেন যে, প্রযুক্তিতে অনভিজ্ঞ ও বয়স্ক মানুষের জন্য কখনো কখনো ২০০ থেকে ৩০০ সংখ্যার দীর্ঘ পিন কোড টাইপ করা ক্লান্তিকর হতাশার তৈরি করছে। টাইপ করার সময় একটি সংখ্যা ভুল হলে পুরো প্রক্রিয়াটি পুনরায় শুরু করতে হয়।
এই সংকট থেকে মুক্তি পেতে গ্রাহকদের স্থানীয় অফিসে যোগাযোগ করে টেকনিশিয়ানদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। তবে, যদি এই যান্ত্রিক গোলযোগ রাতের বেলা কিংবা ছুটির দিনে ঘটে, তাহলে গ্রাহকদের প্রচণ্ড গরম ও অন্ধকারের মধ্যে পুরো রাত কাটাতে হয়।
অন্যদিকে, যেসব মিটারে পাঞ্চ কার্ড ব্যবহার করা হয়, সেই কার্ডটি পুরোনো বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে নতুন কার্ড পাওয়ার আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় গ্রাহককে বিদ্যুৎহীন অবস্থায় কাটাতে হয়।
একটি সাধারণ রিচার্জের মতো ১৬ বা ২০ ডিজিটের কোড আসে, যা মিটারে প্রবেশ করালে টাকা যুক্ত হয়। কিন্তু যখনই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি অথবা ট্যারিফ পরিবর্তন হয়, তখন টোকেনের আকার বিশাল হয়ে যায়।
প্রিপেইড মিটারগুলো কোনো অনলাইন সার্ভারের সঙ্গে প্রতি সেকেন্ডে যুক্ত থাকে না (স্মার্ট মিটার বাদে)। তাই মিটারের ভেতরে থাকা চিপকে জানাতে হয় যে, প্রথম ইউনিট থেকে শুরু করে পরবর্তী ইউনিটগুলোর দাম কত টাকা করে কাটা হবে।
বিদ্যুৎ চুরি বা হ্যাকিং রোধ করতে আন্তর্জাতিক স্ট্যান্ডার্ড (STS - Standard Transfer Specification) অনুযায়ী এই তথ্যকে একটি অত্যন্ত জটিল ও সুরক্ষিত কোডে রূপান্তরিত করা হয়। তথ্যের পরিমাণ বেশি হওয়ার কারণে এনক্রিপশন শেষে কোডটি ১৮০, ৩০০ এমনকি সর্বোচ্চ ৩২০ ডিজিট পর্যন্ত লম্বা হয়ে যায়।
যখনই সরকার বিদ্যুতের দাম বাড়ায়, অথবা যেকোনো কমান্ড বা তথ্য আপডেট হয়, তখন গ্রাহক প্রথমবার বিকাশ, রকেট অথবা ভেন্ডিং স্টেশন থেকে টাকা রিচার্জ করলেই সার্ভার স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিটারের ‘ট্যারিফ আপডেট’ করার জন্য সংকেত পায়। সার্ভার তখন টাকার টোকেনের সঙ্গে দাম সমন্বয়ের টোকেনটি জোড়া লাগিয়ে বিশাল একটি কোড তৈরি করে গ্রাহকের মোবাইলে পাঠিয়ে দেয়।
অন্যদিকে, যেসব মিটার শতভাগ অনলাইন বা ইন্টারনেট প্রযুক্তিতে চলে, সেগুলোতে গ্রাহককে কোনও বাটন চাপতেই হয় না। বিদ্যুৎ অফিস তাদের কেন্দ্রীয় সার্ভার থেকে এক ক্লিকেই দেশের সব স্মার্ট মিটারের দাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপডেট করে দিতে পারে। গ্রাহকেরা অ্যাপে রিচার্জ করলেই ব্যাক-এন্ডে সব কাজ হয়ে যায়। সরকার বর্তমানে সব সাধারণ প্রিপেইড মিটারকে এই স্মার্ট মিটারে রূপান্তর করার জন্য চেষ্টা করছে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন