প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
রাজশাহীর গোদাগাড়ী উপজেলার দেওপাড়া ইউনিয়নের ঈশ্বরীপুর গ্রামে বর্তমানে এক নীরব জনস্বাস্থ্য সংকট বিরাজ করছে। প্রতিদিন জমে থাকা মুরগির বিষ্ঠার কারণে প্রবল দুর্গন্ধ ও অসহনীয় মাছির উপদ্রবে বাধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছে শতাধিক পরিবারের জীবন। ঘরে খাবার রাখতে পারা যাচ্ছে না, স্বাভাবিকভাবে খাওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়েছে, এমনকি নবজাতক শিশুকে মাছির হাত থেকে রক্ষা করার জন্য মাঝেমধ্যে মশারির ভিতরে রাখতে হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো প্রতিকার না পাওয়ার ফলশ্রুতিতে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও উদ্বেগ বৃদ্ধি পাচ্ছে।
ঈশ্বরীপুর গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ হলো, স্থানীয় খামারমালিক স্বপন পরিচালিত একটি লেয়ার মুরগির খামারে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে মুরগির বিষ্ঠা জমিয়ে রাখা হয়েছে। বর্জ্য অপসারণ কিংবা দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহারের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই, তাই পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে চরম দুর্গন্ধ। পাশাপাশি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে মাছির উপদ্রবও। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, এই এলাকায় বসবাসকারী প্রায় ১২০টি পরিবারের ৬৪২ জন সদস্য রয়েছেন। গত তিন মাসের মধ্যে খামার থেকে উৎপন্ন পরিবেশ দূষণ ও মাছির আক্রমণ এমন সীমায় পৌঁছেছে যে শিশু, বৃদ্ধ এবং অসুস্থ মানুষের জীবন সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, খামারের ভেতরে মুরগির বিষ্ঠা স্তূপ করা আছে। চারপাশে অসংখ্য মাছি উড়ছে। খামারের আশপাশে দাঁড়িয়ে থাকা কষ্টকর হয়ে পড়েছে দুর্গন্ধের কারণে। বাড়ির রান্নাঘর থেকে শুরু করে খাবার টেবিল পর্যন্ত সর্বত্র মাছির রাজত্ব। গ্রামের বাসিন্দা রোহেনা বেগমের মুখে ফুটে উঠেছে দীর্ঘদিনের ভোগান্তির চিত্র। তিনি বলেন, “তরকারি রান্না করে রাখতে পারি না। খাবার পরিবেশন করলে মাছি এসে ভাতের প্লেট ও তরকারিতে বসে যায়। পরিবারের সদস্যদের সঠিকভাবে খাবার দিতে পারছি না। মাছির কারণে আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে।”
রোহেনা জানান, আগে খামারটিতে সোনালি জাতের মুরগি পালন করা হতো। তখন কিছুটা দুর্গন্ধ থাকলেও বর্তমানে যে মাত্রার মাছির উপদ্রব দেখা দিয়েছে, তা আগে কখনো দেখা যায়নি। তিনি দ্রুত প্রতিকার না পেলে আদালতের আশ্রয় নেওয়ারও ইচ্ছা প্রকাশ করেন। একইভাবে কয়েক দিন আগে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে সন্তানের জন্ম দেওয়া গৃহিণী লিপি খাতুনও একই দুর্ভোগের কথা জানিয়েছেন। নবজাতক শিশুকে নিয়ে তিনি চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং বলেন, “শিশুর শরীর ও মুখে মাছি এসে বসে থাকে। সব সময় মশারি টাঙিয়ে রাখতে হচ্ছে। ঘরে খাবার রাখলেই মাছি এসে ভরে যায়। নবজাতককে নিয়ে আমি দুশ্চিন্তায় আছি।”
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, “মাছির অত্যাচারে আত্মীয়রা এখন বাড়িতে আসতে চান না। জামাইকে খেতে দিলে খাবারের ওপর মাছি বসে যায়। ঘেন্না আর অস্বস্তির জন্য এখন তিনিও বাড়িতে আসেন না।” তিনি অভিযোগ করেছেন, গ্রামের মানুষ স্বাভাবিক রান্নাবান্না ও খাওয়া-দাওয়া করতে পারছেন না। অনেক সময় দেখা যায় খাবারের সঙ্গে মাছি মুখে চলে যাচ্ছে। পরিস্থিতির প্রতিকার চেয়ে গ্রামবাসীরা জেলা প্রশাসক, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও), এবং পরিবেশ অধিদপ্তরে একাধিকবার লিখিত ও মৌখিক অভিযোগ দিয়েছেন। অভিযোগের পর পরিবেশ অধিদপ্তর, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর, ও ভূমি কার্যালয়ের প্রতিনিধিরা এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্তের ফলেও অভিযোগের সত্যতা মিলেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, খামারের বর্জ্য থেকে উৎপন্ন দুর্গন্ধ পুরো গ্রামে ছড়িয়ে দিয়েছে এবং জনসাধারণের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে। এমনকি গবাদিপশুকেও স্বাভাবিকভাবে খাবার খাওয়ানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খামারে দুর্গন্ধনাশক পদার্থ ব্যবহার না করার কারণে পরিবেশ দূষণ বেড়ে গিয়েছে বলেও প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। তদন্ত শেষে প্রতিবেদনটি প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের রাজশাহী কার্যালয়ের উপপরিচালক মোছা. তাছমিনা খাতুন জানান, “গোদাগাড়ী উপজেলা প্রশাসনের তদন্ত প্রতিবেদন পেয়েছি। খামারের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, দুর্গন্ধ নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশগত অনুমোদনের বিষয়গুলো যাচাই করেছি। সেখানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন ও বিধিমালা লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গেছে। চলতি সপ্তাহের মধ্যেই খামারমালিকের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” অন্যদিকে অভিযোগের বিষয়ে খামারমালিক স্বপনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তিনি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
স্থানীয় জনগণের আশঙ্কা, দ্রুত বর্জ্য অপসারণ, মাছি নিয়ন্ত্রণ এবং পরিবেশগত নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে এলাকায় ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েডসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়তে পারে। তাদের দাবি, জরিমানার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি ও পরিবেশবান্ধব বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে। ঈশ্বরীপুরের মানুষ এখন একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন-তদন্তে অভিযোগের সত্যতা প্রমাণ হওয়ার পরও তারা আর কতদিন দুর্গন্ধ ও মাছির সঙ্গে বসবাস করতে হবে?
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন