প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
জীবিকার জন্য কিংবা উচ্চশিক্ষার লক্ষ্যে প্রতিবছর দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি জমান হাজার হাজার মানুষ। উন্নত জীবন লাভের আশায় পরিবার-পরিজনদের ছেড়ে দূর দেশে গেলেও তাদের মধ্যে অনেকের আর জীবিত ফেরা ঘটে না। প্রবাসে স্বজন হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে দিন কাটাচ্ছেন পরিবারের সদস্যরা। উৎসব এলেও তাদের জীবনে আনন্দ ফিরে আসে না।
অর্থনৈতিক সচ্ছলতার জন্য ইরাকের কুর্দিস্তানে গিয়েছিলেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার বজলুর রশীদ ও মনোহার আলী। গত ২৫ মে কর্মস্থল থেকে বাসায় ফেরার পথে একটি সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান দুজন। তাদের মৃত্যুর খবর শোনার পর পরিবারের মধ্যে শোকের অন্ধকার নেমে আসে। প্রিয়জনের অপেক্ষায় থাকা স্বজনদের এখন একটাই দাবি রয়েছে; মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনা হোক।
স্বজনরা আবেগে বলেন, তারা কখনো ভাবেননি এভাবে দুর্ঘটনায় প্রাণ হারাতে হবে তাদের। ঋণের বোঝা মাথায় নিয়েই তারা বিদেশে গিয়েছিলেন। দেশের মাটিতে ফিরে এসে ব্যবসা-বাণিজ্য করার পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনায় সেই স্বপ্ন শেষ করে দিয়েছে। এখন তাদের একমাত্র চাওয়া, মরদেহ যেন দেশে এনে দাফনের ব্যবস্থা করা হয়।
সৌদি আরবের দাম্মাম শহরের একটি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত ছিলেন রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার মুরাদ শেখ। গত ২৩ এপ্রিল রাস্তা পার হওয়ার সময় একটি বাসের চাপায় প্রাণ হারান তিনি। ৯ মে তার মরদেহ দেশে আনা হলে তাকে নিজ এলাকায় দাফন করা হয়। তবে দাফনের মধ্য দিয়েও পরিবারে শোকের অবসান ঘটেনি। স্বজনহারা পরিবারে সমস্ত আনন্দ যেন ম্লান হয়ে গেছে।
স্বজনরা বলেন, ঈদের পর বাড়িতে ফেরার কথা ছিল মুরাদের। কিন্তু এবার আর তার ফেরা হলো না। তার অনুপস্থিতিতে পরিবারে এখন একমাত্র কষ্ট ও শূন্যতা বিরাজমান।
পরিবারের সঙ্গে ছুটি কাটিয়ে মাত্র তিন মাস আগে মালয়েশিয়ায় ফিরে যান কুমিল্লার বুড়িচংয়ের খোরশেদ আলম। কর্মস্থলে ফিরে স্বাভাবিক জীবন শুরু করলেও গত ১৭ মে সন্ধ্যায় হৃদ্রোগে আক্রান্ত হয়ে তিনি মারা যান। ২২ মে তার মরদেহ দেশে এসে পৌঁছায়। খোরশেদের বাবা বলেন, তিনি কখনো ভাবেননি ছেলের মৃত্যু দেখতে হবে। বর্তমানে তার জীবনে ঈদ বা আনন্দের কোনো মূল্য নেই।
পরিবারের সদস্যরা জানাচ্ছেন, খোরশেদের বিদেশি কোম্পানির কাছে কিছু পাওনা রয়েছে। সেই অর্থ দ্রুত আদায়ের জন্য সংশ্লিষ্টদের সহযোগিতা প্রয়োজন। খোরশেদের ছোট ছেলে ও মেয়েসহ তিন সন্তানের মধ্যে বড় হওয়া জরুরি হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সাহায্য পেলে পরিবার উপকৃত হবে।
উচ্চশিক্ষার জন্য দক্ষিণ কোরিয়ায় গিয়েছিলেন জয়পুরহাটের মেধাবী শিক্ষার্থী হাসিবুর রহমান। উন্নত ভবিষ্যৎ গড়ার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে গেলেও সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। গত ৩ মে সড়ক দুর্ঘটনায় তার মৃত্যু ঘটে। ২২ মে তার মরদেহ গ্রামের বাড়িতে আসে।
ছেলের স্মৃতির মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন বাবা-মা। ঘরের প্রতিটি কোণ, ব্যবহৃত জিনিসপত্র ও স্মৃতিগুলো বারবার মনে করিয়ে দেয় তার অনুপস্থিতির কথা। হাসিবুর রহমানের মা বলেন, ছেলে মাংস খেতে খুব ভালোবাসত। এখন সেই স্মৃতিই তাদের কাঁদায়।
হাসিবুরের বাবা বলেছেন, বিদেশে যাওয়ার পর প্রতিদিনই ছেলেকে ফোন করে জিজ্ঞাসা করতাম, কী খেয়েছে, কেমন আছে। এখন সেই কথাগুলোই তাদের কাছে শুধু স্মৃতি হয়ে রয়েছে।
আনন্দের উৎসবে যারা প্রিয়জনকে ফিরে পাননি, তাদের কাছে ঈদ এখন দীর্ঘশ্বাস ও চোখের জলের গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বজন হারানোর সেই বেদনা কোনো উৎসবই মুছে দিতে পারে না।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন