প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
ফুটবল খেলার ইতিহাস হচ্ছে নন্দন থেকে বন্ধনের এক বিষাদযাত্রা। খেলাটি যখন থেকেই পরিণত হলো ইন্ডাস্ট্রি তথা শ্রমশিল্পে, তখন থেকেই ফুটবল সৌন্দর্য হারাতে শুরু করে। কেউ কেউ আবার বলেন, ফুটবল আসলে ঘটনাবলীর সমষ্টি, এবং গোল হচ্ছে খেলাটির প্রাণবিন্দু।
কবির ভাষায় বলা হয়েছে, সবুজ মাঠই হচ্ছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মঞ্চ, যেখানে ২২ জন শিল্পী মাটিতে জীবনের সবচেয়ে সুন্দর চিত্রকলা আঁকেন। লাতিন ফুটবল এবং ইউরোপীয় ফুটবল এর লড়াইটা আদিকালের। বর্তমান সময়ে ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল খানিকটা এগিয়ে গেছে। তবে ইতিহাস বলে, ঔপনিবেশিক অঞ্চলগুলোর ছাপিয়ে লাতিন ফুটবলের শৈল্পিকতার সৌন্দর্য্য বিশ্বের বুকে রাজত্ব কায়েম করেছে।
শৈল্পিক কারিকুরির নান্দনিকতায় পূর্ণ লাতিন ট্যাকটিক্স নয়তো গতির ঝড় তোলা ইউরোপীয় পাওয়ার ফুটবল? ফুটবলে শ্রেষ্ঠত্বের এই বিতর্ক শতবর্ষ হয়ে চলমান। মহাদেশীয় ফুটবল ইতিহাসে লাতিন ফুটবলে আছে বনেদিয়ানা, যেখানে মাঠেও পায়ের কারুকার্যে শৈল্পিকতার সুর বেজে ওঠে। অন্যদিকে ইউরোপের পাওয়ার ফুটবলে আক্রমণ এবং গতির ঝড় আগে শুরু হয়, যা প্রতিপক্ষকে দুমড়ে-মুচড়ে শেষ করে দিতে পারে।
জীবন এবং ফুটবলের মধ্যে একটি দারুণ মিল লক্ষ্য করেছেন আর্জেন্টাইন গ্রেট ডিয়েগো ম্যারাডোনা। তার আত্মজীবনী ‘এল ডিয়েগো’তে তিনি উল্লেখ করেছেন—জীবনের ব্যাপারে যেভাবে আপনাকে সিদ্ধান্ত নিতে হয়, ফুটবল মাঠে খেলার সময়ও একইভাবে সিদ্ধান্ত নিতে হয়; এর মধ্যে একজনকে বাছাই করে নেওয়ার মতো একটি প্রক্রিয়া রয়েছে।
আর ব্রাজিলিয়ান গ্রেট পেলের মতে, ফুটবল হলো জাদুকরী এক বিষয়। তার আত্মজীবনী ‘পেলে’তে তিনি বলেন—‘ফুটবল সবসময়ই আলাদা। এটি দলীয় খেলা, এককভাবে কখনো খেলা যায় না। একটি দলীয় সমন্বয়ের মাঝে এই খেলার সৌন্দর্য নিহিত আছে।’
ফুটবলপ্রেমী সাহিত্যিকদের তালিকা দীর্ঘ। এ তালিকায় প্রথমেই রয়েছে আলজেরিয়ান বংশোদ্ভূত ফরাসি সাহিত্যিক আলবেয়ার কাম্যুর নাম। আলজেরিয়ার বস্তিতে কঠিন শৈশবেই তিনি ফুটবলে প্রেমে পড়েন। দাদির নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও তিনি ফুটবল খেলতেন। গোলকিপার হিসেবে তিনি সুনাম অর্জন করেন এবং ১৭ বছর বয়সে আলজিয়ার্স রেসিং বিশ্ববিদ্যালয় দলের হয়ে আলোচিত হন। কিন্তু যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে তাকে চিরতরে ফুটবল বিদায় বলতে হয়। ফুটবল নিয়ে তার একটি বিখ্যাত উক্তি আছে—‘নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধের বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদে আমার যা জ্ঞান, তার জন্য আমি ফুটবলের কাছে ঋণী।’
ফুটবলের প্রতি কাম্যুর অগাধ প্রেমের কারণে উনাকে ‘নোবেলজয়ী একমাত্র সাহিত্যিক ফুটবলার’ বলা হয়। মৃত্যুর আগে তিনি একটি আত্মজৈবনিক উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছিলেন, যেখানে একটি বালক চরিত্রের নাম ‘জ্যাক’। জ্যাকের জীবনে ফুটবল ছিল সবচেয়ে বড়। এর মাধ্যমে কাম্যুর শৈশবের প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠেছে।
নোবেলজয়ী জার্মান সাহিত্যিক গুন্টার গ্রাসও ফুটবল ভালোবাসতেন। তিনি আক্রমণ ভাগে খেলতে পছন্দ করতেন, কিন্তু খেলা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। ফুটবল নিয়ে তার আলোচনা সবসময় ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী জার্মানির মানুষের টিকে থাকার লড়াইকে ফুটবল খেলার সঙ্গে তুলনা করতে ভালবাসতেন।
শার্লক হোমসের স্রষ্টা ব্রিটিশ সাহিত্যিক আর্থার কোনান ডয়েল জীবনের একটি সময় ফুটবল খেলেছেন। তিনি পোর্টসমাউথ অ্যাসোসিয়েশন ফুটবল ক্লাব দলের একজন গোলকিপার ছিলেন। ফুটবলের পাশাপাশি ভালো ক্রিকেটারও ছিলেন। এসময়ের আরেক জনপ্রিয় সাহিত্যিক জে কে রাউলিং ফুটবল ভালোবাসতেন। ইংলিশ লিগের ওয়েস্টহ্যাম ইউনাইটেড তার প্রিয় দল, যা দেখতে তিনি নিয়মিত মাঠে যেতেন।
ব্রিটিশ সাহিত্যিক জর্জ অরওয়েলের ফুটবল নিয়ে বিরক্তি ছিল। তিনি খেলাধুলা ভালোবাসলেও ফুটবলের উগ্র জাতীয়তাবাদের সঙ্গে সম্পৃক্ততাকে ঘৃণা করতেন। তার মতে, যদি পৃথিবীকে অশান্তিতে ভরিয়ে দিতে চান, তাহলে কয়েকটি রাষ্ট্র ও জাতির মধ্যে এক লাখ মানুষের ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করলেই যথেষ্ট। ফুটবল প্রসঙ্গে আইরিশ নাট্যকার অস্কার ওয়াইল্ড বলেছেন, ‘ফুটবল হলো ভদ্রলোকের খেলা, কিন্তু এটি খেলে এক দল বর্বর অসভ্য মানুষ!’
ফুটবলপ্রেমী অন্যান্য সাহিত্যিকদের নাম আরও অনেক আছে। যেমন—জ্যঁ পল সার্ত্রে, জ্যাক কেরুয়াক, অ্যান্থনি বার্গেস, ওয়াল্টার স্কট, ভ্লাদিমির নবোকভ, মার্টিন এমিস, সালমান রুশদি, জুলিয়ান বার্নস এবং আরও অনেক। বিখ্যাত ফুটবলাররা তাদের অভিজ্ঞতার উপর ভিত্তি করে অসংখ্য আত্মজীবনী রচনা করেছেন। এসব গ্রন্থ পাঠকপ্রিয়তা পেয়েছে এবং আধুনিক সমাজের পরিবর্তনশীল অধ্যায়ের কিছু অজানা তথ্য প্রকাশ করেছে। এর মধ্যে কিছু উল্লেখযোগ্য হলো ইয়োহান ক্রুয়েফের ‘মাই টার্ন’, জর্জ বেস্টের ‘ব্লেসড’, রয় কেনের ‘দ্য সেকেন্ড হাফ’, পাওলো মালদিনির ‘মুন্দেয়াল’, অ্যালেক্স ফার্গুসনের ‘মাই অটোবায়োগ্রাফি’ এবং আর্সেন ওয়েঙ্গারের ‘মাই লাইফ ইন রেড অ্যান্ড হোয়াইট’।
কবি-সাহিত্যিকদের প্রশংসা পেতে হয়। স্প্যানিশ ভাষার অন্যতম সেরা কবি সিজার ভায়েয়ো ও ষোড়শ শতাব্দীর ইতিহাসবিদ গার্সিলাসো-এর নামে দুটি ফ্রন্ট ক্লাব পরিচিত আছে দেশটিতে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন