প্রধান কার্যালয়: ৫৮/১- পুরানা পল্টন (২য় তলা), ঢাকা-১০০০।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক অনুমোদিত। রেজি:- নং-সি-১৯৬৯৯৯/২০২৪
ফোন: ০২২২-৪৪৫৮৫৪৭
ই-মেইল- [email protected]
দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী সংগঠন এফবিসিসিআই মন্তব্য করেছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটের আকার বড় হলেও এটি বাস্তবায়ন অসম্ভব নয়। তবে বাজেটের লক্ষ্য অর্জনে প্রয়োজন দূরদর্শিতা, দক্ষতা, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
শনিবার, তারা প্রস্তাবিত বাজেটের ওপর নিজেদের পর্যবেক্ষণে এসব কথা জানায়। সংগঠনটি উল্লেখ করেছে, প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, বিনিয়োগ, উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামাজিক ন্যায়বিচারকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক সুরক্ষা, ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ, আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতকে সরকার বিশেষ গুরুত্ব দেয়ায় তাদের ধন্যবাদ জানিয়েছে।
এফবিসিসিআইয়ের মতে, অর্থনীতির পুনরুদ্ধারে সরকারের ঘোষিত ‘রিকভারি অ্যান্ড স্ট্যাবিলাইজেশন, রেস্টোরেশন অ্যান্ড রিকনস্ট্রাকশন (থ্রিআর)’ কৌশল অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করেছে।
সংগঠনটি আরও বলেন, আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট প্রস্তাব করা হয়েছে, যা চলতি অর্থবছরের বাজেটের তুলনায় প্রায় ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ বেশি। বর্তমান বৈশ্বিক ও অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে এত বড় বাজেট বাস্তবায়ন সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, তবে যথাযথ পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে তা সম্ভব হবে বলেও তাদের বিশ্বাস।
এফবিসিসিআইয়ের মতে, ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আহরণের লক্ষ্য অর্জনের জন্য রাজস্ব আদায়ে অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ব্যবসা ও বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের সংস্কার জরুরি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি ধরা হয়েছে, যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ দশমিক ৬ শতাংশ। এই ঘাটতি পূরণে দেশীয় ও বৈদেশিক উৎস থেকে বড় অঙ্কের ঋণ নিতে হবে।
বিশেষ করে ব্যাংকিং খাত থেকে অতিরিক্ত ঋণ গ্রহণ বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছে প্রতিষ্ঠানের নেতৃবৃন্দ। এ ক্ষেত্রে স্বল্পসুদে বৈদেশিক অর্থায়নের সুযোগ কাজে লাগানোর পাশাপাশি সতর্ক ঋণ ব্যবস্থাপনার পরামর্শ দিয়েছে এফবিসিসিআই।
এফবিসিসিআই আরও উল্লেখ করেছে, আগামী অর্থবছরে সরকারকে মোট ১ লাখ ২৭ হাজার ৫০০ কোটি টাকা সুদ পরিশোধ করতে হবে, যার মধ্যে ১ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা অভ্যন্তরীণ এবং ২২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণের সুদ। এ বিষয়টিকে তারা একটি বড় আর্থিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে অভিহিত করেছে।
বাজেট বাস্তবায়নের পথে উঁচু মূল্যস্ফীতি, নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত, খেলাপি ঋণ, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তাকে প্রধান ঝুঁকি হিসেবে চিহ্নিত করেছে এফবিসিসিআই।
অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করতে বিনিয়োগবান্ধব অর্থনৈতিক অঞ্চল কার্যকর করা, রপ্তানি বহুমুখীকরণ, নতুন বাজার অনুসন্ধান, তথ্যপ্রযুক্তি ও ইলেকট্রনিক্স খাতে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলা, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো, পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেট শক্তিশালী করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহের নিশ্চয়তা, লজিস্টিক ও সরবরাহ ব্যবস্থা উন্নয়ন এবং মুক্ত বাণিজ্য অঞ্চল প্রতিষ্ঠার আইনি কাঠামো তৈরি করতে প্রায়োগিক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করেছে সংগঠনটি।
এফবিসিসিআই সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় 'ফ্যামিলি কার্ড' ও 'কৃষক কার্ড' চালুর উদ্যোগ, ৬৫ বছর ও তার উপরে নাগরিকদের জন্য ট্রেনে বিনামূল্যে ভ্রমণ, মেট্রোরেলে ২৫ শতাংশ ভাড়া ছাড় এবং জুলাই আন্দোলনের যোদ্ধাদের ভাতা অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছে।
এছাড়া এলডিসি উত্তরণের পর বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় সক্ষমতা ধরে রাখতে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য চুক্তি (পিটিএ) এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) সম্পাদনের উদ্যোগের প্রশংসা করেছে ব্যবসায়ী সংগঠনটি।
এফবিসিসিআই নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে সরকারের উদ্যোগ, ২০৩০ সালের মধ্যে মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পূরণের লক্ষ্য এবং ২০৩৫ সাল পর্যন্ত সৌরবিদ্যুৎ খাতে শূন্য শতাংশ করহার বজায় রাখার প্রস্তাবকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসাবে চিহ্নিত করেছে।
সংগঠনটি বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্যে ঘোষিত ৬০ হাজার কোটি টাকার 'স্টিমুলাস প্যাকেজ-২০২৬', এসএমই উন্নয়নে ২ হাজার কোটি টাকা এবং নারী ও তরুণ উদ্যোক্তা উন্নয়নে ৫০০ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাবকে স্বাগত জানিয়েছে।
এফবিসিসিআই করভিত্তি সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি রোধ, কর প্রশাসনে পূর্ণাঙ্গ স্বয়ংক্রিয়তা, অনলাইন ভ্যাট ও আয়কর রিটার্ন দাখিল, ডিজিটাল সিঙ্গেল উইন্ডো এবং ঝুঁকিভিত্তিক স্বয়ংক্রিয় অডিট ব্যবস্থার মত উদ্যোগের প্রশংসা করেছে।
তবে সংগঠনটি করমুক্ত আয়সীমা সাড়ে ৩ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩ লাখ ৭৫ হাজার টাকা করার সিদ্ধান্তকে সন্তোষ প্রকাশ করেছে, কিন্তু ৫ শতাংশ স্ল্যাব বহাল রাখা এবং সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত আয়করের হার ৩৫ শতাংশ থেকে ২৫ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব দিয়েছে।
এছাড়াও তালিকাবহির্ভূত কোম্পানির কর হার এবং ন্যূনতম টার্নওভার কর আরও কমানোর সুপারিশ করেছে।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও উৎপাদন খরচ কমাতে শিল্পের কাঁচামাল আমদানিতে অগ্রিম কর হ্রাস, নিত্যপ্রয়োজনীয় কৃষিপণ্য ও ভোগ্যপণ্যে উৎসে কর কমানো, খেজুর ও রান্নার মসলায় নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক প্রত্যাহার এবং দেশীয় ভোজ্যতেল উৎপাদনে কর-প্রণোদনাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপকে স্বাগত জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
তারা স্টার্টআপ, প্রযুক্তিনির্ভর প্রতিষ্ঠান, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা, নারী উদ্যোক্তা এবং রপ্তানিকারকদের জন্য প্রদত্ত কর সুবিধারও প্রশংসা করেছে।
এছাড়া বৈদ্যুতিক যানবাহন, বৈদ্যুতিক বাস-ট্রাক ও চার্জিং স্টেশনের জন্য কর প্রণোদনাকে পরিবেশবান্ধব পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে উল্লেখ করেছে সংগঠনটি।
তবে এমএস রডের কিছু পণ্যে উৎপাদন পর্যায়ে নির্দিষ্ট ভ্যাট বৃদ্ধির প্রস্তাবে উদ্বেগ প্রকাশ করে এফবিসিসিআই বলেছেন, এর নেতিবাচক প্রভাব নির্মাণ খাতে পড়তে পারে।
সংগঠনটি ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের জন্য সহজীকৃত টার্নওভার কর ব্যবস্থা, ক্ষুদ্র আমানতে আবগারি শুল্ক অব্যাহতি, স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠানের ভ্যাট সুবিধা, ফ্রিল্যান্সার ও কনটেন্ট নির্মাতাদের জন্য ভ্যাট অব্যাহতি এবং কর-শুল্ক-ভ্যাট আপিল প্রক্রিয়া সহজীকরণের পদক্ষেপকে ইতিবাচক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এছাড়া বন্ডেড ওয়্যারহাউসের আওতায় স্বর্ণ আমদানি ও গহনা রপ্তানির নতুন বিধিমালা এবং স্বর্ণ ও স্বর্ণালঙ্কার লেনদেনে উৎসে কর উল্লেখযোগ্যভাবে কমানোর সিদ্ধান্তকেও স্বাগত জানিয়েছে এফবিসিসিআই।
সংগঠনটি মনে করে, বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক অনিশ্চয়তা ও অর্থনৈতিক মেরুকরণের মধ্যেও প্রস্তাবিত বাজেট একটি বাস্তবসম্মত, বাস্তবায়নযোগ্য ও বিনিয়োগবান্ধব আর্থিক কাঠামো উপস্থাপন করেছে, যা প্রবৃদ্ধি, কর্মসংস্থান এবং জবাবদিহিমূলক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় সহায়ক হবে।
এফবিসিসিআই জানিয়েছে, তাদের বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব বাজেটে প্রতিফলিত হয়েছে। এজন্য তারা সরকারকে ধন্যবাদ জানিয়েছে। সেইসঙ্গে অর্থবিল এবং কর, ভ্যাট ও শুল্কসংক্রান্ত প্রস্তাবসমূহ পর্যালোচনা করে সদস্য সংগঠনগুলোকে সাক্ষাৎকারে আলোচনা করে আরও সুপারিশ অল্প সময়ের মধ্যে সরকারকে প্রদান করার আগে বলা হবে।
নিউজের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য স্ক্যান করুন